December 27, 2016 | 12:00 PM

মাঞ্জা কি ভোকাট্টা হয়ে যাবে

সুমন লিখেছিলেন, ‘আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক মাটিতে অবজ্ঞা।’ সেও তো কম দিন হল না। তখনও তিনি কবীর হননি। মাটিতে ধুত্তোর বলে মাটির অবজ্ঞাকে মাঞ্জা দেওয়া সুতোর সুতোকে তুচ্ছ করে রঙিন ঘুড়ির ঝাঁক নিমেষে উঠে যেত মাটিতে। আর উড়ে যেতাম আমরাও। স্কুলের নিলডাউন, পাড়ায় খেলার টিম থেকে বাদ পড়া, বাড়িতে মার খাওয়া, জগৎ সংসারের কোথাও তেমন কোন পাত্তা না পাওয়া আমাদের সে বড় সুখের সময়! হাতে বনবন করে ঘুরছে লাটাই। আমাদের ময়ূরপঙ্খী তাঁর শিরদাঁড়া আঁকড়ে রাখা মাঞ্জা সুতোয় ভর দিয়ে ছাদ-মাঠ-ঘাট, পাড়া-বেপাড়া টপকে চলে যাচ্ছে দূর থেকে আরও দূরে। তার রেলাই আলাদা, কেতাই অন্যরকম। দিনরাত আলো জ্বলা অন্ধকার ঘর আর শ্যাওলা মাখা স্যাঁতসেঁতে কলতলার চৌহদ্দির বাইরে তখনও আমরা পা না রাখলেও স্রেফ মাঞ্জা সুতোর ভরসাতেই এতটা পথ পাড়ি দেবার সাহস দেখাতাম। ন্যাশানাল গ্রিন প্যানেলের রায়ের সুবাদে সেই মুখপোড়া কিংবা পেটকাটি ঘুড়িটার গায়ে আর মাঞ্জা সুতো দেখা যাবে না। আদালতের রায়ে সারা দেশজুড়ে মাঞ্জার ব্যবহার সাময়িকভাবে বাতিল হয়েছে। তার অপরাধ নির্দোষ প্রমোদ উপকরণ হওয়ার বদলে মাঞ্জা নাকি এখন খুনি পাঞ্জা উঠেছে।

মাঞ্জার বিদায় মানে একটা উত্তেজনার অবসানও। একটা গোপনীয়তার সমাপ্তি। মাঞ্জার গুণে লাটাইয়ে মজুত হত আকাশ যুদ্ধে জেতার এক আশ্চর্য অস্ত্র। আমাদের বালকবেলায় শুনতাম, ‘লুদ্দির মাঞ্জা’। তা নাকি তৈরি হয় বেড়ালের বিষ্ঠা আর মোটা কাঁচের গুড়ো দিয়ে। ঘুড়ি ওড়ানোর আগের পর্ব ছিল মাঞ্জা দেওয়া। পাড়ার এক ল্যাম্পোষ্ট থেকে আরেক ল্যাম্পোষ্টে বাঁধা হত সুতো। তার আশেপাশে তার জন্য পাহারায় থাকতো দুদিকে দুজন। কারণ ভেজা অবস্থায় লোকজনের শরীর কিংবা হাত-পায়ে লাগলে মাঞ্জা নষ্ট হয়ে যাবে। হাত-পা কাটতে পারে। সাদা সুতো রঙিন হয়ে উঠতো লাল, হলুদ,নীল কালো মাঞ্জায়। ঠিক কায়দা না জানলে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় হাত কেটে যেতে পারে। পাড়ার ঘতুদা ছিল আমার আইডল। ও অনেক দূর অবধি ঘুড়ি বেড়ে টেনে প্যাচ খেলতে পারতো। ওকে একবার লুদ্দির মাঞ্জার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঘাড় বেকিয়ে তাচ্ছিল্য সহকারে আমায় বললো, ‘জীবনে সব জিনিস তাড়াতাড়ি বোঝা যায় না। একটু বড় হতে হয়।’

সব জিনিসই কি বড় হলে বোঝা যায়! মাঞ্জাও কি কোনদিন বুঝতে পেরেছিল, একদিন তার ব্যবহার বন্ধ করার দাবি উঠবে। আদালতে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তা দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো যাবে না। অভিযোগ ও আইনি লড়াইয়ের পরিণতিতেই এই সিদ্ধান্ত। অভিযোগ, মাঞ্জায় ক্ষতিগ্রস্ত আহত ও নিহত মানুষ ও পশুপাখির সংখ্যাও কম নয়। কালে কালে ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে মাঞ্জার মত একটা নির্দোষ ব্যাপার। ঘুড়ির লড়াইয়ে জেতার জন্য আগে তা ছিল কিঞ্চিৎ কাঁচগুড়ো মেলানো একটা আঠা। তাতে বড়জোর অপটু কিংবা নবীন ঘুড়ি উড়িয়েদের আঙুল কাটতো। এরপর সেই সুতো হয়ে উঠলো আরও মোটা। তাতে লাগানো হল আরও বেশি করে কাঁচ ও পাথর এবং অন্যান্য ধাতব পদার্থ। তা হয়ে উঠল দস্তুর মত লেথাল ওয়েপন। যা বিদ্যুৎবাহী তারের ওপর পড়লেই বিগড়োবে গ্রিড, বিপর্যস্ত হবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। তার কারণ ব্যবহৃত সামগ্রীগুলির কারণেই মাঞ্জা বিদ্যুৎ পরিবাহী।

ঘুড়ি দিয়ে শুরু হলেও মাঞ্জা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর নির্দোষ আমোদে আটকে থাকেনি। প্রতিদ্বন্দ্বী ঘুড়ি ছাড়িয়ে তার পাঞ্জা ধাক্কা মেরেছে আকাশে উড়ন্ত পাখির ঝাঁকের ওপর। তা হয়ে উঠেছে পক্ষী শিকারিদের অস্ত্র। শীত বাড়লেই পরিযায়ী পাখীদের আসা যাওয়ার পথে উড়তে থাকে ঘুড়ি। এই ঘুড়ির সুতোতেই ঘায়েল হয় পক্ষীকুল। নিপুণ হাতের খেলায় মাঞ্জা কেটে দেয় পাখির ডানা, আহত হয় মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী। বালকের ঘুড়ি নয় মাঞ্জা হয়ে উঠেছে পক্ষীশিকারীদের অস্ত্র। নির্দোষ প্রমোদের উপকরণের বদলে কিছু লোভী মানুষের হাতে পড়ে সে হয়ে উঠেছে পক্ষীশিকারীদের অস্ত্র। রহস্য উপন্যাসে পড়া খুনি পাঞ্জার মতই খুনি মাঞ্জা প্রাণ কাড়ে বহু পশুপাখি এমনকি মানুষেরও।

বিপুল জনপ্রিয়তার কারণেই দেশের নানা জায়গায় বিশেষত উত্তর ভারতে মাঞ্জা একটা কুটির শিল্প। বহু মানুষ বিশেষত শিশুরা সেখানে কাজ করে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু শিশু শ্বাসকষ্টের শিকার। এসব জায়গাতেই তৈরি হয় নাইলন, চাইনিজ এবং সুতোর মাঞ্জা। চিন সভ্যতাকে তত্ত্ব, দর্শন, প্রযুক্তি, বিপ্লব ইত্যাদি নানা উপাচার সমৃদ্ধ করেছে। অথচ কি আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন, ইদানীং ডিম, চাল, খেলনা, সবকিছুর দু-নম্বরি কারবারে চিনের নাম জুড়ে যাচ্ছে। শেষ অবধি চিনের নাম জুড়লো মাঞ্জাতেও। উত্তরপ্রদেশে খুব চালু একটা মাঞ্জার নাম ‘চাইনিজ মাঞ্জা’। এর আগেই এলাহাবাদ আদালত উত্তরপ্রদেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। গ্রিন ট্রাইব্যুনালও চাইনিজ মাঞ্জাকে তার আওতায় এনেছে।

মাঞ্জা ভোকাট্টা হবে কিনা তা জানতে আমাদের আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।