December 31, 2016 | 12:00 PM

সুখী গৃহকোণ ভোগায় বিনোদন

লম্বা চওড়া কথা দিয়েই শুরু করা যাক। মিডিয়া মুঘল রূপার্ট মার্ডক ঘোষণা করেছেন যে তিনি ইউরোপিয়ান পে-টিভি স্কাই কিনে নেবেন ১৫ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয় ডলারে। তাতে দেশে দেশে ছড়িয়ে থাকা ওই চ্যানেলের আড়াই কোটি দর্শক তাঁর বিনোদন বাণিজ্যের প্রজা হয়ে যাবে।

টেলিভিশনের দুনিয়ায় এমন বেচা-কেনা এখন রোজকার ঘটনা। আমাদের দেশেও জি-টিভির মালিক সুভাষচন্দ্র কিনে নিয়েছেন অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ব্রডকাস্টের যাবতীয় টিভি চ্যানেল এবং রেডিও মালিকানার ৪৯ শতাংশ। এই কেনাকাটাও আসলে দর্শক ধরার বাহানা ছাড়া আর কিছু নয়। তাতে সুভাষচন্দ্রের গাঁট থেকে গেছে ১,৯০০ কোটি টাকা।

এঁরা সকলেই বিনোদনের ফেরিওয়ালা। অনেক বড় টাকার অঙ্কে তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের খদ্দের হল শ্রোতা এবং দর্শক। কারণ এই দর্শকদের আনুক্যূলেই তাঁদের ভাগ্যলক্ষ্মী প্রসন্ন হয়। কিন্তু কথা হল   দুনিয়া জুড়ে এই উদ্যোগ আয়োজনের পরে দর্শকরা শেষ পর্যন্ত কী পেয়ে থাকে? বিনোদনের আনন্দে যাঁরা নিজেদের গৃহকোণ সুখী করতে চান তাঁদের ভালো লাগা বা মন্দ লাগার কোন মূল্য কী আদৌ আছে?

খাতায় কলমে অবশ্যই আছে। সেই জন্যই নানা রকম বাজার সমীক্ষার বন্দোবস্তও আছে। দর্শকদের মন বোঝার মনটানার নানা সূত্র আছে। সেই সব সূত্র মেনেই না-কি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আদল তৈরি হয়। এই আঁকি-বুকির পর প্রথম যে কথাটা স্থির হয় তা হল কোন দর্শকের জন্য চ্যানেল চলবে? তখনই প্রশ্ন আসে সেই দর্শকমণ্ডলী বিজ্ঞাপন আকৃষ্ট করতে পারবে তো? এই বিবেচনা বোধ থেকেই দর্শকের শ্রেণিবিন্যাসও পাকা হয়ে যায়। যাদের বাজার থেকে জিনিস কেনার ক্ষমতা আছে তারাই দর্শক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই মানদণ্ডে ভারতের মত দেশে ৬০ শতাংশ মানুষ চলে যায় বাদের খাতায়। কিন্তু বাকী ৪০ শতাংশের ভিন্ন কদর। কারণ তাদের যা ক্রয় ক্ষমতা গোটা ইউরোপের স্বচ্ছল সমাজের তা নেই। কিন্তু এই ৪০ শতাংশের মধ্যেও বিভাজন আছে। ভারতের মত দেশে যারা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় সরগর তারা হচ্ছে চ্যানেলগুলির কাছে আদরের দুলাল।

তাহলে আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেলগুলির কী হবে? তাদের কপাল তখনই খুলবে যখন বাণিজ্যের বড় খেলোয়াড়েরা তাদের দিকে নজর দেবে। ইংরেজি বা হিন্দি সহ নানা রকম আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেল যার হাতে থাকবে বিজ্ঞাপন আদায়ে তার দর কষাকষির ক্ষমতা তত বাড়বে।

এখন ভাবতে হচ্ছে বিজ্ঞাপন ব্যাকরণ মানার পর আমাদের বাংলা চ্যানেলগুলির অবস্থা তাহলে কেমন?  কোন বড় খেলা বাংলা চ্যানেলে আমরা দেখতে পাবনা। কারণ স্বত্ত্ব আদায়ের জন্য যে টাকা দরকার তা এই সব চ্যানেলের নেই। সারা দুনিয়ার ক্রিকেট বেঁচে আছে ভারতীয় দর্শকদের দাক্ষিণ্যে। কিন্তু কোন ভারতীয় চ্যানেল তার সম্প্রচারের অধিকার পাবেনা। জি-টিভির সুভাষচন্দ্র একবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রূপার্ট মার্ডকের হাত যশে তিনি ছিটকে যান।

সংবাদে কী পাব? সারা দুনিয়ায় সংবাদ প্রতিনিধি রাখা তো দূর অস্ত, গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় শহরে লোক রাখার ক্ষমতাও আঞ্চলিক চ্যানেলগুলির নেই। ফলে পাড়ায় পাড়ায় রামা-শ্যামার গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, দু-চারটি ধর্ষণ, আর বহু ব্যবহারে মলিন কিছু রাজনৈতিক মুখ হল সংবাদের সম্বল।

শোনা যায় টিভি বাণিজ্যের লক্ষ্মী না-কি সিরিয়াল বা সোপ অপেরা। আমাদের দেশে সিরিয়াল প্রথমে এসেছিল দূরর্দশনে ‘হাম লোগ’-র মাধ্যমে। দেশভাগের পটভূমিতে রমেশ সিপ্পির ‘বুনিয়াদ’ সম্ভবত এখনও অনেকের মনে আছে। ‘দিল দরিয়া’ সিরিয়ালে শাহরুখ খান প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সূচনা পর্বেই বাংলা সিরিয়ালেও দাগ কেটেছিল জোছন দস্তিদারের ‘তেরো পার্বণ’ বা রাজা সেনের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’। আজ বাংলা চ্যানেলের সিরিয়াল দেখলে প্রথমেই মনে হয় বাংলা সাহিত্য বলে বোধহয় আর কিছুই নেই। অবৈধ যৌন সম্পর্ক আর কুচক্রি গৃহবধূকে নিয়ে মহাভারত লিখিয়েরাই এখন গোটা ছোট পর্দার দখলদার।

এই পরিবেশন প্রক্রিয়া যত চলতে থাকবে ততই দর্শক ভিন্ন ভাষার চ্যানেলে মুখ ঘোরাবে। কিন্তু সেখানেই বা কী আছে? ক্রিকেট খেলা? গোটা খেলাটাই এখন ৪২০ বাজারি ব্যবসায়ীদের হাতে। বিচারপতি লোধা ঝাড়ু হাতে নামলেও বেশি দূর এগোতে পারবেন বলে মনে হয় না।

সংবাদ প্রায় সর্বত্রই কোন না কোন দিকে হেলে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানো কঠিন। মাত্র কয়েকদিন আগেই কেন্দ্রীয় সরকার হুকুম দিয়েছে প্রণয় রায়ের এন.ডি.টিভি একদিনের জন্য পুরো বন্ধ রাখতে হবে। তাহলে বিনোদনের জন্য হাতে আর অবশিষ্ট কী রইলো?

এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারতো আকাশবাণী এবং দূরদর্শন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল ভারত ব্রিটিশ গণতন্ত্রের আদল গ্রহণ করলেও বি.বি.সি –র মডেল থেকে শত হস্ত দূরে থেকেছে। ফলে আমাদের সুখী গৃহকোণে বিনোদনের নামে কেবল অসুখের চাষবাসই চলবে। নতুন বছরে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করে হতাশ হবার কি দরকার?