August 23, 2023 | 12:00 PM

দেশজুড়ে ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে বাংলা, প্রস্তাব কেন্দ্রের

ম্যানগ্রোভের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার জন্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে MISHTI স্কিম চালু হয়েছে

০২১ সালের ২৬ মে যখন ঘূর্ণিঝড় ইয়াস পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকা-তে আছড়ে পড়েছিল, তখন সুন্দরবনের বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। যদিও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছোট্ট গ্রাম ঝড়খালিতে ঝড়ের অতটাও প্রভাব পড়েনি। অন্য এলাকাগুলির মতন এখানে ঝড়ের প্রভাবে নদীবাঁধ ভেঙে দুইপাড় ছাপিয়ে যায়নি বা বাসিন্দাদেরও গৃহহীন হতে হয়নি। মাতলা, বিদ্যাধরী আর হেরোভাঙা নদী দিয়ে ঘেরা এই গ্রামটি ঘূর্ণিঝড় প্রবণ। ২০২১ সালের মে মাসে হওয়া ইয়াসের আগে আয়লা (মে ২০০৯), ফণী (মে ২০১৯), বুলবুল (নভেম্বর ২০১৯) এবং আমফান (মে ২০২০) ঘূর্ণিঝড়গুলির ভয়ংকর প্রভাব দেখেছেন এলাকার মানুষ।

ঝড়খালিতে ইয়াসের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল নদীর পাড়ে গ্রামবাসীদের ম্যানগ্রোভ (Mangrove) গাছের চারা রোপণ। এই পন্থাটি ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে বেশ কাজে এসেছিল। ২০১৭ সাল থেকে প্রায় ৩০০,০০০ ম্যানগ্রোভ গাছের চারা এখানে লাগানো হয়েছে। এর সিংহভাগ কৃতিত্বই ২০০৫ সালে ঝড়খালির মেয়েদের নিয়ে গঠিত হওয়া স্বেচ্ছাসেবী দল ঝড়খালি সবুজ বাহিনী-র।  

পশ্চিমবঙ্গ সরকার দেশজুড়ে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর প্রকল্পে মুখ্য ভূমিকা নেবে

২০২০ সালের আমফান ঘূর্ণিঝড়-এর পর রাজ্য সরকার, ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর যে প্রকল্পটি নিয়েছিল, তা সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে। সেই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানো হয়েছে উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে। এই গাছগুলি বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন কমাতেও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। রাজ্য বনদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরে রাজ্যে প্রায় ১৫ কোটি ম্যানগ্রোভের চারা লাগানো হয়েছে। সম্প্রতি, রাজ্যের এই প্রকল্পের সাফল্য  দেখে, তা বাকি দেশের জন্য মডেল হিসাবে গ্রহণ করে, কেন্দ্রীয় সরকার একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে যার নাম- ম্যানগ্রোভ ইনিসিয়েটিভ ফর শোরলাইন হ্যাবিট্যাটস অ্যান্ড ট্যাঞ্জিবেল ইনকামস স্কিম (Mangrove Initiative for Shoreline Habitats and Tangible Incomes- MISHTI Scheme)। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল, ভারতের উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে ম্যানগ্রোভ বনানীর পুনঃস্থাপন করা এবং ম্যানগ্রোভ-নির্ভর ইকোট্যুরিজম গড়ে তোলা ও জীবিকার পথ সৃষ্টি করা। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে, সারা দেশব্যাপী ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর প্রকল্পটি শুরু করতে।

২০১৪ সালে ওয়েটল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল (Wetlands International) এবং দ্য নেচার কনজারভেন্সি (The Nature Conservancy) দ্বারা নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, ম্যানগ্রোভ অরণ্য (Mangrove Forest) বাতাস ও জলস্রোতের প্রভাব কমিয়ে, ভূমিক্ষয় রোধ করতে পারে। কিন্তু এটাও বলা হয়েছে, “যেসব এলাকায় ভূমিক্ষয় হচ্ছে, সেখানে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর জন্য আরও বেশি সতর্কতা দরকার। যেমন- গাছের চারাগুলিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা, পলির ভারসাম্য রক্ষা করা এবং হাইড্রোলজির (জলবিদ্যা) খেয়াল রাখা।”

১৮-তম জি২০ সামিট (18th G20 Summit)-এর আগে (যা নিউ দিল্লিতে, সেপ্টেম্বরের ৯ এবং ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে), ইউনিয়ন আধিকারিকরা (Union government officials) রাজ্যে এসেছিলেন এবং রাজ্যে অনুষ্ঠিত, ম্যানগ্রোভ লাগানোর এই বিপুল কর্মযজ্ঞ চাক্ষুষ করে গেছেন। তাঁরা প্রকল্পটির ব্যাপারে বিশদে খোঁজখবর নিয়েছেন। রাজ্যের বর্তমান বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জানান, “জি২০ টিমের আধিকারিকরা আমাদের উদ্যোগ দেখে খুবই খুশি হয়েছেন এবং এই প্রকল্প সম্বন্ধে বিশদে জানতে চেয়েছেন। যখন তাঁদের জানানো হয় যে, পুরো প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, তখন তাঁরা রাজ্যের বনদপ্তরকে নোডাল সংস্থা রূপে কাজ করার প্রস্তাব দেন। তাঁদের প্রস্তাব হল এই যে, ভারতের উপকূলবর্তী যেসব এলাকা ভূমিক্ষয় প্রবণ, সেইসব এলাকায় ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ রোপণ করা হবে। রাজ্য বনদপ্তর এই প্রকল্পে নোডাল সংস্থা হিসাবে কাজ করবে।”

পুরো পরিকল্পনাটি যদিও এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যকে এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাবে। রাজ্য সরকার সেই প্রস্তাবে রাজি হলে তবেই রাজ্যের বনদপ্তর সরকারি নোডাল সংস্থারূপে প্রকল্পটিতে কাজ শুরু করতে পারবে। 

বনদপ্তর ভূমিক্ষয় খতিয়ে দেখার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে, যাঁরা ভূমিক্ষয়ের কারণ বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট দেবেন। ভারতের বিস্তীর্ন এলাকাজুড়ে ভূমিক্ষয় একটি বড়ো সমস্যা, যার ফলে উপকূলের পার্শ্ববর্তী বাড়িঘর, হোটেল, অন্যান্য বিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ভেঙে পড়ে। রাস্তা ভেঙে যায়, মূল্যবান জমিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে বাধা পায় জেলে, মৌলি, চাষিদের জীবিকা এবং অন্যান্য কাজ। উপকূলবর্তী জমিগুলি ক্রমশই সমুদ্রের গ্রাসে চলে যায়, এবং উপকূলবর্তী গ্রামের মানুষ নিজের ভিটে ছাড়তে বাধ্য হন। এরফলে গ্রামের বাসিন্দাদের থাকার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। সমুদ্রতটের জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ভূমিক্ষয় মানুষের জীবন এবং প্রকৃতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে দিনে দিনে ভূমিক্ষয়, একটি প্রাকৃতিক ঘটনা থেকে গুরুতর বিপদ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞ দলটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যাবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখবে এবং বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করবে। সেই রিপোর্ট পাঠানো হবে রাজ্য সরকারের কাছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তাহলে তা রাজ্য বনদপ্তরের মুকুটে নিঃসন্দেহে একটি নতুন পালক যোগ করবে।