June 3, 2017 | 12:00 PM

হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে মুর্শিদাবাদের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ

কর্ণসুবর্ণ
এই যুগের সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে কর্ণসুবর্ণ অঞ্চলে। প্রায় কুড়ি-বাইশ বর্গমাইল বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে প্রাচীন কর্ণসুবর্ণ নগরী ও তার সন্নিহিত অঞ্চলের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। চিনা পরিব্রাজক হিউ-এন-সাং বা য়য়ান চোয়াং (৬৩৭/৩৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কর্ণসুবর্ণে এসেছিলেন) বলেছেন, কর্ণসুবর্ণ নগরী ২০ লি অর্থাৎ ৭ মাইল বিস্তৃত ছিল। ভাগীরথী ঐ নগরীর বিস্তৃত অঞ্চলে গ্রাস করেছে; কেবল তার পশ্চিম অংশ ও তার উপকণ্ঠ বর্তমান কর্ণসুবর্ণ ও তার আশে পাশের কয়েকটি গ্রামে ছড়িয়ে আছে। ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে ‘রাক্ষসী ডাঙ্গায়’ পরীক্ষামূলক ভাবে খনন কার্য চালান হয়। এর ফলে তিনটি স্তরে ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত বৌদ্ধ-বিহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। তারপর বহুদিন পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে অধ্যাপক ড.সুধীররঞ্জন দাসের পরিচালনায় ‘রাজবাড়ি ডাঙ্গায়’ খননকার্য চালান হয়। খননকার্যের ফলে পাঁচটি স্তরে খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে অষ্টম-নবম শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘকালের নানা নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য তথ্য এই যে, এই রাজবাড়ি ডাঙ্গাতেই হিউ-এন-সাং কথিত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার অবস্থিত ছিল তা নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। হিউ-এন-সাং তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, রাজা অশোক কর্ণসুবর্ণে চারটি স্তূপ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এ কথা সত্যি হলে কর্ণসুবর্ণের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোন বলে ধরে নিতে হয়। সম্প্রতি কর্ণসুবর্ণের ‘ভীমকি তলায়’ একটি স্তূপ জাতীয় স্থাপত্যের ধ্বংশাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। এখানে প্রাপ্ত একটি প্রস্তরখণ্ডের খোদিত মূর্তিটির সঙ্গে অশোকের মূর্তির সাদৃশ্য আছে। এটি অশোক নির্মিত স্তূপগুলির অন্যতম বলে কোন কোন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।

শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬২৯ থেকে ৬৩৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে) সঙ্গে সঙ্গেই কর্ণসুবর্ণের ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি। আরও বহুদিন – অন্তত মুসলমান অধিকারের সময় পর্যন্ত এই স্থানের প্রসিদ্ধি ছিল তার প্রমাণ পীর তুরকানের কবর, মীরডাঙ্গা, বেণেদীঘি, আমলাবাড়ী প্রভৃতি স্থানগুলি। কর্ণসুবর্ণের অতি সামান্য অংশেই খননকার্য সম্পাদিত হয়েছে। ‘সন্ন্যাসী ডাঙ্গা’, যদুপুর’, ‘সংস্কার’, ‘রাঙামাটি চাঁদপাড়া’ প্রভৃতি স্থানে খনন করা হলে যে আরও বহু ঐতিহাসিক  নিদর্শন পাওয়া যাবে তাতে সন্দেহ নাই।

কর্ণসুবর্ণের নিকটবর্তী অঞ্চলসমুহ যথা বাজারসাহু, সালার, কাগ্রাম, পাঁচথুপী, বড়ঞা, গোকর্ণ, মহলন্দী, অমরকুণ্ড প্রভৃতি এই যুগেই গড়ে উঠেছিল। এই সকল অঞ্চলে অনেক ধ্বংসাবশেষ , জনশ্রুতি, কিংবদন্তী, বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি এই অনুমানকে সমর্থন করে। ভরতপুর থানার গীতগ্রাম বা গিদ্‌গ্রামে ১৯২৮ খৃষ্টাব্দে খননকার্য চালিয়ে গুপ্তযুগের মুদ্রা, নানা রঙের পাথরের পুঁতি, মাটির সীলমোহর প্রভৃতি পাওয়া গিয়েছে। পাঁচথুপী সংলগ্ন ‘বারকোণার দেউল’ একটি বিশাল বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ।

মহীপাল
মুর্শিদাবাদের আর একটি অতি উল্লেখযোগ্য অঞ্চল সাগরদীঘি থানার মহীপাল। আজিমগঞ্জ-নলহাটি রেলপথের বাড়ালা-সাহাপুর থেকে শুরু করে ব্যাণ্ডেল বারহারোয়া রেলপথে মহীপাল রোড ষ্টেশন হয়ে ভাগীরথী তীরবর্তী গিয়াসাবাদ বা বা গয়সাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে প্রাচীন মহীপাল নগরীর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। এই নগরীর পরিধি ছিল নাকি ৩০ মাইল। মহীপাল, চন্দ্রদীঘি, হুকারহাট, পাটকেলডাঙা, লক্ষ্মীহাট, গৌরীপুর, গোপালহাট, আমলাবাড়ি, গিয়াসাবাদ, সিংহেশ্বরী প্রভৃতি গ্রামগুলিতে ছড়ানো আছে অসংখ্য ঢিপি, ছোট-বড় প্রস্তরস্তম্ভ, স্তম্ভের ভগ্নাংশ, বিশাল বিশাল প্রাচীন দীঘি ও পুষ্করিণী। গ্রামগুলির ‘ষষ্ঠীতলা’য় জমা করা আছে বুদ্ধমূর্তি, শিবলিঙ্গ ও নানা দেবীর ভগ্নমূর্তি।

মহীপাল নগর যে পাল বংশের রাজধানীই ছিল, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, পরোক্ষ প্রমাণ অনুসারে বলা চলে যে, মহীপাল অঞ্চল প্রথম মহীপালের রাজত্বকাল থেকে রামপালের বরেন্দ্রভূমি উদ্ধারের পূর্ব পর্যন্ত (আনুমানিক ৯৮০ থেকে ১০৮০ খ্রিষ্টাব্দ) অন্ততঃ শতাব্দীকাল পাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।

পাল আমল বাংলার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এই স্বর্ণযুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের কিছু নিদর্শন কেবল এই অঞ্চলেই নয়, মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে।

সাগরদীঘি
মহীপালের প্রায় দশ কিলোমিটার পশ্চিমে সাগরদীঘি। এই দীঘিটি মহীপালের কীর্তি বলে প্রসিদ্ধ। দীঘির মধ্যস্থলে একটি বিশাল প্রস্তরস্তম্ভ দিঘিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। স্তম্ভের উপরের অংশটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, সেই জন্য দীঘির জল খুব কমে না গেলে দেখা যায় না।

সাগরদীঘির কাছেই চন্দনবাটী গ্রাম প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বেসরকারি উদ্যোগে খননকার্যের ফলে একটি অতি প্রাচীন শিবমন্দির ও অন্যান্য মন্দির অথবা সৌধের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। শিবমন্দিরটির গর্ভগৃহ থেকে একটি বিশাল কালো পাথরের গৌরীপট্ট ও শিবলিঙ্গ পাওয়া গিয়েছে। জায়গাটি বেশ উঁচু এবং মন্দিরটির প্রায় সবটাই মাটির নিচে ঢাকা পড়েছিল। মন্দির ও আশেপাশের গৃহগুলি প্রায় টালির আকারের বড় বড় ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এ থেকে মনে হয় স্থানটিকে সাধারণত সেন বা পাল আমলের মনে হলেও, এটি আরও প্রাচীন অর্থাৎ সপ্তম/অষ্টম শতাব্দীর হওয়াও অসম্ভব নয়। চন্দনবাটী ও পার্শ্ববর্তী সমসাবাদে প্রায় যে সকল দেব-দেবীর মূর্তি দেখা যায় তা সবই হিন্দু দেবদেবীর। তবে বৌদ্ধ দেব-দেবীর মূর্তি যে ছিল না তা জোর করে বলা চলে না। এই অঞ্চলটিতে সুষ্ঠভাবে খননকার্য হলে ইতিহাসের অনেক তথ্য অবশ্যই পাওয়া যাবে।

সমসাবাদের সন্নিকটে ‘গড়ের পাহাড়’ গ্রামে চারিদিকে পরিখাযুক্ত একটি গড়ের ধ্বংসাবশেষ কিছুদিন আগেও দেখা যেত। অনেকে এটিকে পাল রাজাদের অব্যবহিত পরবর্তী কালের কোনও সামন হিন্দুরাজার গড় বলে মনে করেন। তবে পরিখাটির অবস্থা দেখলে এবং ভিতরের ধ্বংসাবশেষের নকশা বা স্থাপত্য ভালো করে লক্ষ্য করলে এটি অনেক পরবর্তীকালের বলে মনে হয়। আজিমগঞ্জ থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে ‘কুসুমখোলা’তে এই রকম আর একটি স্থান আছে বলে মনে করা হয়। এখানেও পুরনো মন্দির ও ধংসাবশেষ আছে।;

(অরূপ চন্দ্র সম্পাদিত ‘মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বিজয় কুমার মুখোপাধ্যায় লিখিত ‘মুর্শিদাবাদ জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশবিশেষ)