কনকদুর্গা মন্দিরের পুজোয় প্রায় ৪৫০ বছরের মিথ আর রাজার নীতি

রহস্যময়ী ঘন জঙ্গল। পাশে কুলুকুলু শব্দে বয়ে চলেছে ডুলুং নদী। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের মিথ। রাজকাহিনির আড়ালে রাজনীতি। এই সবকিছু নিয়েই এখনও অনেক কথা বলে দেয় ঝাড়গ্রাম লাগোয়া কনকদুর্গা মন্দির। কথিত আছে এই মন্দিরের দেবী উমা নাকি আজও রাতে অষ্টমীর ভোগ রাঁধেন নিজেই। এলাকাবাসীদের বিশ্বাস এটাই। তাই আজও বেশ স্বমহিমায় পালিত হয় এখানকার দুর্গোৎসব।
নিয়ম করে আজও পরিবারের মঙ্গল কামনায় গাছের ডালে সুতো বাঁধেন মহিলারা। দূর দূরান্ত থেকে আসেন ভক্তরা। ঝাড়গ্রাম জেলা থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার এগোলেই পড়বে চিলকিগড় রাজবাড়ির পাশে এই কনকদুর্গা মন্দির। পাশেই ডুলুং নদী। ঠিক যেন ছবির মতো। চারদিকে গা ছমছমে ঘন জঙ্গল। অষ্টধাতুর দুর্গা এখানে অশ্বারোহিনী চতুর্ভূজা।
মন্দির এবং দুর্গাপুজো জুড়ে রয়েছে নানান মিথ। নানান রাজনীতি। ওড়িশার এক ব্রাহ্মণ রাজার রাজত্ব ছিল এই এলাকা। সামন্তরা ছিল সেনাপতি। রাজার কোনো সন্তান ছিল না। তাই মৃত্যুর পর রাজার সমস্ত রাজত্ব যায় সামন্তদের দখলে। তখনই নাকি স্বপ্নাদেশে সোনার মূর্তি তৈরির নির্দেশ পান জামবনির রাজা জগদীশ চন্দ্র দেওধল। ব্রাহ্মণ রাজার আধিপত্য কমাতেই হয়তো সামন্ত রাজার এই রাজনীতি/কূটনীতি।
দুর্গাপুজোর শুরুর গল্প এটাই। এখনও রীতি একই রয়ে গেছে। ষষ্ঠীতে ডুলুং নদী থেকে ঘট ভরতি জল আসে। সারারাত মন্দিরের বাইরে বেলগাছের নিচে থাকে সেই ঘট। সপ্তমীর সকালে কলসির জল দিয়ে ঘট শুদ্ধ করে হোম আরতির পর গৃহপ্রবেশ করানো হয়। আগে নাকি নরবলিও হত জঙ্গলে। অষ্টমীর রাতে মন্দির সংলগ্ন গভীর জঙ্গলে নিশাপুজো। থাকেন শুধুমাত্র রাজপরিবারের বর্তমান সদস্যরাই। এলাকাবাসীদের বিশ্বাস, ঘন জঙ্গলে অষ্টমীর ভোগ রান্না করেন স্বয়ং দুর্গা।
দশমীতে হয় রাবণ-পুজো। মশাল জ্বালিয়ে রাবণরুপী কলাগাছকে তীর মারার প্রতিযোগিতা হয়। পুরোনো মন্দিরে নয়, এখন পুজো হয় নতুন মন্দিরে৷ তবে এখনও পুরোনো মন্দির রয়েছে পাশেই। দেওয়ালে ফাটল আর গাছের শিকড়কে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী কনকদুর্গা মন্দির। এখনও প্রতি বছর দুর্গাপুজোয় মানুষ ভিড় জমান এই মন্দিরে। তবে করোনার জন্য এবছর সব বন্ধ। দুর্গাপুজো হবে খানিক নিঃশব্দে। অষ্টধাতুর মূর্তিতেই পুজো হয় চিলকিগড়ের কনক দুর্গা মন্দিরে।