আধুনিক ভারতে মহিলা ভাস্করদের স্বতন্ত্র ও সমবেত স্বর

শিল্পী শানু লাহিড়ীর কথা দিয়েই শুরু করা যাক। সম্পর্কে তিনি সাহিত্যিক-শিল্পী কমলকুমার মজুমদারের বোন। ১৯৫১ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে (তখন অতুল বসু অধ্যক্ষ ছিলেন) প্রথাগত শিক্ষা শেষে, ১৯৫৬ সালে ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান প্যারিস। বছর দুই ছিলেন। শোনা যায়, সেখানে পিকাসো, মাতিস, শাগাল, রুসোর মতো শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। শিক্ষার ষোলকলা পূর্ণ করে দেশে ফিরে খুব অল্প সময়েই চারুকলার জগতে নিজের এক বিশিষ্ট ভাষা, নিজস্বতা প্রতিষ্ঠা করেন। শানু লাহিড়ী এমন একজন শিল্পী, যাঁর শিল্পবোধ ফুরিয়ে যাওয়া বা পুরোনো হয়ে যাওয়ার নয়। তাঁর ল্যান্সডাউন কোর্টের বাড়িতেই, সম্ভবত দেশের প্রথম মহিলা শিল্পীগোষ্ঠী ‘দ্য গ্রুপ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন পঞ্চকন্যারা।
অলোকানন্দা সেনগুপ্তের দুটি টেরাকোটা-ভাস্কর্য ‘পাওয়ার’ ও ‘হাউ ডু ইউ ফাইন্ড মি…আ লোফ অফ মিট’
এখন ভাস্কর্য গড়ার নামে অনেক ক্ষেত্রেই টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়। বানানো ভাস্কর্য ভাঙা হয়। এই পরিস্থিতিতে এহেন প্রদর্শনী ভরসা দেয়। মনে করিয়ে দেয়, চারুকলায় ভাস্কর্যের অবস্থান, মহিলা ভাস্করদের উপস্থিতি।
কজন চেনেন এই শিল্পীকে, কজন জানেন এইসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে! চিত্রশিল্পী বা ভাস্করদের ‘সাবজেক্ট/অবজেক্ট’ হন মহিলারা, জনসাধারণ এটুকু জেনেই ধন্য। দু-একজন ভারতীয় মহিলা ভাস্করের নাম জানতে চাইলে, চট করে মনে পড়বে কি? অথচ, ভারত তথা বাংলায় কত-শত মহিলারা ভাস্কর্যশিল্পে নিদর্শন রেখেছেন, রেখে চলেছেন। যার উৎকৃষ্ট নমুনা কলকাতায় চলমান প্রদর্শনী— উইমেন স্কাল্পটরস ইন মডার্ন ইন্ডিয়া (Women Sculptors In Modern India)। যেখানে ষাটের দশকের শানু লাহিড়ী, রেবা হোর-সহ প্রদর্শিত হচ্ছে তাঁদের অনুজ শিল্পীদের কাজ। রয়েছে অলকানন্দা সেনগুপ্ত, বনশ্রী খান, সীমা কোহলি, চৈতালি চন্দ, চন্দনা হোর, জয়শ্রী চক্রবর্তী, লতিকা কাট, মৌসুমী রায়, নীলিমা গোয়েল, রত্নাবলী কান্ত, সীমা চক্রবর্তী, সুনন্দা দাস ও উমা সিদ্ধান্ত – এঁদের ভাস্কর্য।
সীমা কোহলি’র ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘যোগিনী’
শিল্পী রত্নাবলী কান্ত-র প্রকট সোনালি রঙের গ্লাসফাইবারের ভাস্কর্য ‘বিটুইন দ্য ওয়াল’ চোখ ও মনে ধাক্কা দেয়। শিল্পী রেবা হোর-এর ব্রোঞ্জ ও টেরাকোটার দুটি ভাস্কর্য এবং শিল্পী শানু লাহিড়ীর ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘ফিগার’, ‘ফেসেস’ এবং কাঠ দিয়ে গড়া ‘হেড’ এই প্রদর্শনীর সম্পদ। এঁদের কাজ চাক্ষুস করা বিরলতম অভিজ্ঞতা। শিল্পী অলকানন্দা সেনগুপ্তের কাজের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা দরকার। তাঁর ভাস্কর্য আঘাত করে। ধারাবাহিকভাবে অলকানন্দা সেনগুপ্তের কাজগুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠে যুদ্ধপীড়িত মহিলা ও শিশুদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ। সমাজজীবনে যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই-ই তাঁর ভাস্কর্যের প্রেরণা। এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে তাঁর দুটি টেরাকোটা-ভাস্কর্য।
রত্নাবলী কান্ত-র ‘বিটুইন দ্য ওয়াল’ (দ্য কনভারসেশন বিটুইন টু উইমেন ফ্রম টু এন্ডস)
নজর কেড়েছে শিল্পী সোমা চক্রবর্তীর দুটি সফট স্কাল্পচার। ‘সফট স্কাল্পচার’ বললেই শিল্পী মৃণালিনী মুখোপাধ্যায়ের কাজ মনে পড়ে। শিল্পী-দম্পতি বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও লীলা মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান মৃণালিনী। তিনি যে কত বড়ো মাপের ভাস্কর, তার মূল্যায়ন এখনও এ দেশে হয়নি। এছাড়া, বনশ্রী খানের ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘এরোটিক রক’, শিল্পী মৌসুমী রায়ের সেরামিকের কাজ ‘স্ক্যায়ারি ক্যাট’ ও ‘হাঙ্গার’, শিল্পী জয়শ্রী চক্রবর্তীর ব্রোঞ্জের মূর্তি, চন্দনা হোরের ব্রোঞ্জ-কৃতি, শিল্পী উমা সিদ্ধান্ত-র ব্রোঞ্জের কাজ ‘রিদম’, শিল্পী সীমা কোহলি’র ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘যোগিনী’, উমা সিদ্ধান্ত-র ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘মহাকাল’ (সত্তরের দশকের সমাজচিত্র) প্রতিটিই শক্তিশালী, গভীর ভাবে অনুভব করার। এক বাক্যে, এই প্রদর্শনী ভারতীয় মহিলা ভাস্করদের ভিন্ন ভিন্ন স্বর নিয়ে গড়ে ওঠা এক স্বতন্ত্র তথা সমবেত কণ্ঠ।
বনশ্রী খানের ব্রোঞ্জ-কৃতি ‘এরোটিক রক
পুরুষ/মহিলা বলে নয়, এমনিতেই পেইন্টিং-এর তুলনায় ভাস্কর্যশিল্পের প্রতি আগ্রহ বা আলোচনা সীমিত। আগে সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমনকি রাস্তা-ঘাটে, পার্কে-ময়দানে শোভা পেত বিশিষ্ট শিল্পীদের বানানো ভাস্কর্য। সে সবের কদর ছিল আলাদা। এখন ভাস্কর্য ভাঙা হয়। সংরক্ষণের বদলে অযত্নে পড়ে থাকে, হেলায় হারিয়ে যায় অমূল্য সব শিল্পকর্ম। এই পরিস্থিতিতে এহেন প্রদর্শনী ভরসা দেয়। মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের গুরুত্ব, চারুকলায় ভাস্কর্যের অবস্থান, মহিলা ভাস্করদের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
শানু লাহিড়ী নির্মিত ভাস্কর্য
উইমেন স্কাল্পটরস ইন মডার্ন ইন্ডিয়া | প্রদর্শনী কিউরেটর : চিত্র-সমালোচক মৃণাল ঘোষ | চলবে ৩০ নভেম্বর অবধি, ১১টা থেকে সন্ধে ৬টা | আকৃতি আর্ট গ্যালারি, হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট