No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পেলে-মারাদোনার পর কলকাতায় কি এবার মেসি? জানাচ্ছেন ক্রীড়া উদ্যোগী শতদ্রু দত্ত

    পেলে-মারাদোনার পর কলকাতায় কি এবার মেসি? জানাচ্ছেন ক্রীড়া উদ্যোগী শতদ্রু দত্ত

    Story image

    ভারতীয় ফুটবল-এর মক্কা হল কলকাতা। কলকাতা ময়দান, তিন বড়ো ক্লাব (ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান স্পোর্টিং), আবেগ, ভালোবাসা আর উন্মাদনায় জড়িয়ে থাকে শহর। আবার এই ফুটবলই বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা। পেলে, মারাদোনা, ক্রুয়েফ থেকে হাল আমলের মেসি, রোনাল্ডোর নাম ফেরে মুখে মুখে। ক্লাব ফুটবলের সময় বিভিন্ন দেশের লিগ বা খেলোয়াড়দের নিয়ে মাতামাতি, আর বিশ্বকাপের সময় শতধা বিভক্ত হয়ে যায় পৃথিবী। আমাদের দেশ যদিও এখনও ফুটবলের বিশ্বমানে পৌঁছায়নি, তবু উন্মাদনায় খামতি থাকে না কোনও। বিশ্বমানের ফুটবলারদের নিয়মিত বাংলায় নিয়ে আসার কাজ করে চলেছেন শতদ্রু দত্ত (Shatadru Dutta)। তিনি যেন সেই ভগীরথ, যাঁর হাত ধরে কলকাতা স্পর্শ করেছে পেলে, মারাদোনা, কাফু- এমন অগুনতি বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের। তাঁরাও কলকাতার আবেগ আর ভালোবাসার ওম মেখেছেন।

    এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সঙ্গে 

    বিভিন্ন স্পোর্টস ইভেন্ট-এর সংগঠক, একটি কনসালটেন্সি ফার্মের মালিক শতদ্রু, বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ছোটোবেলা থেকে খেলাধূলায় অনুরক্ত ছিলাম। নিজেও খেলেছি বিভিন্ন ক্লাবে। ক্রিকেট, ফুটবল ছিল প্রিয় খেলা। কিন্তু পেশাগত কারণে খেলা চালিয়ে যেতে পারিনি। আবার ছেড়েও দিতে পারিনি। তাই এখন এভাবেই জুড়ে থাকি।” সৌরভ গাঙ্গুলি আর মারাদোনার ভক্ত শতদ্রু আয়োজন করেন বিভিন্ন স্পোর্টস ইভেন্টের। তার মধ্যে রয়েছে কলকাতা পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে ফ্রেন্ডশিপ কাপ আয়োজন করা, বিভিন্ন খেলোয়াড়দের সম্বর্ধনা দেওয়া, বিভিন্ন কোচিং ক্লিনিকের আয়োজন করা ইত্যাদি। সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে অনেকগুলি ইভেন্ট করেছেন। সৌরভের ৫০তম জন্মদিন আয়োজন করা, তাঁর দুটি বই লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড আর অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশ করা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডিং-এর ইভেন্ট ইত্যাদি।

    সৌরভ গাঙ্গুলি এবং শতদ্রু দত্ত

    হোটেল থেকে বেরিয়েছি। মাঠে যাবো, ফুটবল ক্লিনিকে ট্রেনিং দেবেন মারাদোনা। বলা হয়েছে ২০ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে। রাস্তায় জ্যামের জন্য ৫-৭ মিনিট দেরি হয়েছে। হঠাৎ গাড়ির সিটে ঘুষি মারতে শুরু করলেন, সঙ্গে বলছেন, ‘আমি মাঠে যাবো না, হোটেলে ফিরে যাবো।’ আবার মাঠে গিয়ে কচিকাঁচাদের দেখেই মুড পাল্টে গেল।

    বহু বিখ্যাত ফুটবলাররা কলকাতায় এসেছেন তাঁর হাত ধরে। তালিকাটা দীর্ঘ। পেলে, মারাদোনা, হিগুয়েতা, ভালদেরামা, কাফু, জুনিনহো, বেবেতো, সদ্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এমি মার্টিনেজ…। কলকাতায় এনেছিলেন অলিম্পিকজয়ী জ্যাভলিন থ্রোয়ার নীরজ চোপড়া-কেও। এঁদের আনার কারণ কি শুধুই বিপণন? প্রশ্ন করায় শতদ্রুর জবাব, “বিপণন একটা কারণ তো বটেই। কিন্তু আসল কারণ হল আবেগ। যাঁরা আমাদের স্বপ্নের নায়ক, তাঁদেরকে শহরবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, বাংলার ফুটবল তথা ক্রীড়াপ্রীতির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করানো। আর একটা উদ্দেশ্য হল, তাঁদেরকে এনে বাংলার পরবর্তী প্রজন্মকে ফুটবলের প্রতি উৎসাহিত করা।” বাংলায় ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা রয়েছে। আইএসএল এবং ভারতীয় ফুটবল দলের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সের কারণে ধীরে ধীরে ভারতীয় ফুটবল নিয়ে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য প্রদেশেও। কিন্তু ভারত এখনও ফুটবলের জগৎসভায় আসন পায়নি। এখনও পেশা হিসাবে ফুটবলকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন অনেকেই। সেই দ্বিধা আর সংকোচ কাটাতেই শতদ্রু নিয়ে আসেন ফুটবলের মহারথীদের। তাঁদের সামনে থেকে দেখে, তাঁদের জীবনের গল্প শুনে, যাতে অনুপ্রাণিত হয় পরবর্তী প্রজন্ম, যাতে একবার বল পায়ে ঢুকে পড়ে ফুটবল মাঠে, আর ড্রিবল করতে করতে পেরিয়ে যায় সব বাধাবিপত্তি।

    দেশীয় ফুটবলারদের নিয়ে এমন ধরনের ইভেন্ট না করার কারণ? শতদ্রু জানান, “একেবারেই যে কোনও ইভেন্ট আয়োজন করি না, সেটা ঠিক নয়। কোভিডের সময় সুনীল ছেত্রীকে নিয়ে অনলাইন কোচিং ক্লিনিকের আয়োজন করেছিলাম। বিদেশি ফুটবলাররা এলে বিভিন্ন দেশীয় ফুটবলারদের আমন্ত্রণ করি সবসময়, তাঁদের সম্বর্ধনা দিই। আমি দেশীয় ফুটবলারদের অসম্ভব শ্রদ্ধা করি। কিন্তু অপ্রিয় হলেও এই কথা সত্যি যে, বিদেশি ফুটবলারদের যতটা আবেদন রয়েছে জনমানসে, দেশীয় ফুটবলারদের ক্ষেত্রে অতটা নেই।” এর কারণ বোধহয় এটাই যে, ভারত ফুটবলে এখনও বিশ্বমানে পৌঁছায়নি।

    সুনীল ছেত্রীর সঙ্গে

    শতদ্রুর গলাতেও যেন কিছুটা একই সুর। তাঁর মতে, ভারত যতক্ষণ না বিদেশি দলের বিরুদ্ধে না খেলবে, ততক্ষণ এই উন্নতি সম্ভব হবে না। সেইজন্য কাজ শুরু করতে হবে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে। পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের বেছে নিয়ে তাদের ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে, আর তাদের ট্রেনিং দেওয়াতে হবে বিদেশি কোচ আর সাপোর্ট স্টাফেদের দিয়ে। এমনটাই মত শতদ্রুর। জানালেন, এই কথা তাঁকে বলেছেন, কাফুদের মতন বিশ্বজয়ী ফুটবলাররাও। নিজের কথার সপক্ষে যুক্তিও দিলেন, “ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা নিজেদের দেশে কিছুদিন খেলার পরই ইউরোপে চলে আসে। হালে সৌদি আরবও বিশ্বকাপ খেলছে। তাদের ফুটবলাররাও ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলে। তবে সম্প্রতি ফেডারেশন ভালো কাজ করছে।”

    এই পথে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। সেবার এনেছিলেন ১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের একাংশকে। যেখানে ছিলেন- বেবেতো, জুনিনহো, এডমিলসন, দুঙ্গা, ক্যাম্পোস প্রমুখ। তাঁরা একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচও খেলেন আইএফএ একাদশ-এর সঙ্গে। এরপর ২০১৫ সালে আসেন পেলে। তারপর মারাদোনা। কার সঙ্গে তাল মেলানো সবথেকে মুশকিল? শতদ্রু নির্দ্বিধায় বলেন, “মারাদোনা। উনি কখন কী করবেন, কেউ জানত না।” শোনালেন একটি ঘটনাও, যাতে ছাপ লেগে রয়েছে আনপ্রেডিক্টেবল মারাদোনার। “হোটেল থেকে বেরিয়েছি। মাঠে যাবো, ফুটবল ক্লিনিকে ট্রেনিং দেবেন মারাদোনা। বলা হয়েছে ২০ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে। রাস্তায় জ্যামের জন্য ৫-৭ মিনিট দেরি হয়েছে। হঠাৎ গাড়ির সিটে ঘুষি মারতে শুরু করলেন, সঙ্গে বলছেন, ‘আমি মাঠে যাবো না, হোটেলে ফিরে যাবো।’ আবার মাঠে গিয়ে কচিকাঁচাদের দেখেই মুড পাল্টে গেল। আধঘণ্টার জায়গায় একঘণ্টা কোচিং করালেন, সৌরভ গাঙ্গুলি আসার পর তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। এইরকম মানুষ ছিলেন মারাদোনা।”

    কিন্তু এমন বিখ্যাত ফুটবলাররা এখানে আসতে রাজি হন কেন? শুধুই কি বিপণনের উদ্দেশ্যে? শতদ্রু জানান, “ওঁরা ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলে এত টাকা উপার্জন করেন, এই টাকায় তাঁদের কিছু যায় আসে না। তাঁরা জানেন, এই দেশে তাঁদের অনেক ভক্ত আছে, ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা আছে। তাঁরা সেই আবেগ থেকেই আসেন।” যেমন, মারাদোনাকে আনার সময় আর্জেন্টিনা গিয়ে মারাদোনার এক বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। “কিন্তু তিন-চারবার আসার তারিখ পাল্টাতে হয়েছে। একবার একটা সময় দিচ্ছেন, খানিক পরেই আবার সেটা পাল্টে দিচ্ছেন। এটা মারাদোনার খামখেয়ালিপনার আরেকটা নমুনা।” দিলেন ডি মারিয়ার কলকাতায় আসার খবর। জানালেন, “ডি মারিয়া আসবেনই। কবে আসবেন, এখনও ঠিক হয়নি।”

    শতদ্রুর স্বপ্ন মেসিকে কলকাতায় আনা। আর যদি সম্ভব হয়, ভবিষ্যতে মেসি আর রোনাল্ডোকে একসঙ্গে নিয়ে ইভেন্টের আয়োজন করা। “এছাড়াও ইচ্ছে আছে ডেভিড বেকহ্যাম আর টেনিস কিংবদন্তি স্টেফি গ্রাফকে কলকাতায় আনার”, জানান তিনি। ভবিষ্যতে ফুটবলের কোচিং সেন্টার খোলার ইচ্ছে রয়েছে? শতদ্রুর কথায়, “যদি তেমন কিছু করি, তাহলে বিদেশি কোচ, বিদেশের পরিকাঠামো সমেত কোচিং সেন্টার তৈরি করবো।” তবে তাঁর আসল স্বপ্ন নিজের ছেলেকে প্রফেশনাল ফুটবলার তৈরি করার এবং ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলানোর। এখন সেই স্বপ্নের পিছনে দৌড়চ্ছেন তিনি। আর ছেলে যদি ইউরোপে ক্লাব ফুটবল খেলতে খেলতে, ভারতের জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পায়? শতদ্রুর স্পষ্ট উত্তর, “সেটা হবে সবথেকে গর্বের মূহূর্ত। দেশের থেকে বড়ো আর কিছু হয় না কি?”

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @