পশ্চিমবঙ্গে জৈব কৃষকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে

প্রতীকী ছবি, ছবি সূত্র: worldvisionadvocacy.org
মানুষ এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। হাইব্রিড চাষ এবং এই ধরনের কৃত্রিম পদ্ধতিতে চাষের যে নেতিবাচক প্রভাব, তা অনেকেই জানেন। আর এই কারণেই বাংলায় ক্রমশ বাড়ছে ‘অর্গ্যানিক ফুড স্টার্টআপ’। অনেক উদ্যোক্তাই এখন জৈব চাষের সাহায্যে প্রাকৃতিক কৃষি বা Organic Farming-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এই প্রবণতা এতটাই বেড়েছে, যে উত্তরভারতের পরে জৈব খাদ্য ব্যবসায় দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারে পরিণত হতে পারে বাংলা। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জৈব খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ হল ভারত এবং এতে বাংলার অবদান অনেক বেশি।
মাটির স্বাস্থ্য বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের প্রচার এবং দূষণ কমানোর উপর ভিত্তি করে একটি টেকসই পরিবেশ-বান্ধব কৃষি ব্যবস্থা হল- জৈব চাষ। এই পদ্ধতিতে চাষের ক্ষেত্রে সিন্থেটিক সার, কীটনাশক, জেনেটিকালি পরিবর্তিত জীব এবং বৃদ্ধির নিয়ন্ত্রকের ব্যবহার হয় না। পরিবর্তে, জৈব চাষের ফলে যেমন মাটির উর্বরতা বজায় থাকে, তেমনই কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া অবলম্বনের জন্য জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাও হয়।
জৈব চাষের জন্য স্বাস্থ্যকর মাটি তৈরি করে, তার উর্বরতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রাকৃতিক ভাবে ভালো মানের মাটি তৈরির জন্য ক্রপ রোটেশন, কম্পোস্টিং এবং কভার ক্রপিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ভালো মাটিতে প্রচুর পরিমাণে অণুজীব থাকে যা উদ্ভিদ-বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং রকমারি ফসল চাষের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখে। জৈব কৃষি ব্যবস্থা পশুসম্পদকে একীভূত করে। গোবেরর মতো প্রাণীজাত বিভিন্ন উপাদান থেকে যে প্রাকৃতিক সার পাওয়া যায়, তা আগাছা ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
স্থানীয় জৈব কৃষকরা যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছেন, পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেও রক্ষা করছেন। মনোকালচার (Monoculture) এড়িয়ে বিভিন্ন ভাবে বাস্তুতন্ত্রের প্রচার করে, জৈব চাষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল ধান
জৈব ফার্মগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছোটো পরিসরে কাজ করে এবং বেশিরভাগই স্থানীয়। এতে স্থানীয় জৈব কৃষকরা যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছেন, পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেও রক্ষা করছেন। মনোকালচার (Monoculture) এড়িয়ে বিভিন্ন ভাবে বাস্তুতন্ত্রের প্রচার করে, জৈব চাষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করে চলেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে স্থিতিস্থাপক বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখার জন্য, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিশলয় ফাউন্ডেশন-এর তরফে বিপ্লব দাস বলেন, “সুফল বাংলা কর্মসূচির আওতায় বাংলায় জৈব চাষ আজ অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্ণেন্দু বসু এবং দোলা সেন সুঠাই কৃষি কর্মসূচির মাধ্যমে টেকসই কৃষিকে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কর্মসূচীর অধীনে, অনেক লোক টেকসই কৃষির জন্য কাজ করে। লালমাটিযুক্ত অঞ্চল, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দিনাজপুর, জঙ্গলমহল সহ অন্যান্য অঞ্চলে জৈব চাষ হয়।”
বিপ্লববাবুর কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গকে ৪ বা ৫টি ভাগে ভাগ করে এই উদ্যোগ চলছে এবং ধীরে ধীরে কর্মসূচির বৃহত্তর ছাতার আওতায় আনা হচ্ছে। অনেকেই এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। উত্তর ২৪ পরগনা-য়, বেশ কয়েকজন মহিলা এই প্রকল্পগুলির অধীনে কাজও শুরু করেছেন। সামগ্রিকভাবে, প্রায় ১০০০০ থেকে ১২০০০ কৃষক আছেন, যাঁরা কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করেই জৈব চাষের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। অন্যান্য কৃষকরা রাসায়নিক নয়, গোবর জাতীয় সার ব্যবহার করে হাইব্রিড চাষ করছেন।
যদিও, যথেষ্ট জ্ঞান এবং দক্ষতার অভাবের কারণে কখনও কখনও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাউকে কাউকে কীটনাশক ব্যবহার করতে দেখা যায়। এছাড়াও, অনেক ছোটো চাষিরই ধারণা রয়েছে যে জৈব চাষে ফলন কম হয়। তাঁরা বেশি মুনাফার জন্য ফসলে যথেচ্ছ পরিমাণ ইউরিয়া সহ অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে, কিছু কিছু জায়গায় জমির উর্বরতা কমে গেছে। মাটির পুষ্টিগুণ ফিরে পেতে ন্যূনতম ১ থেকে ২ বছর সময় লাগে, কিন্তু যাঁরা কৃষির উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল, তাঁরা এতদিন অপেক্ষা করতে পারেন না। অন্যদিকে, অনেক চাষিই জৈব চাষের উপর ভরসা রেখে মাটির উর্বরতা ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন, বদলে তহবিলের জন্য বিভিন্ন এনজিও থেকে সাহায্য পেয়েছেন। সময় লাগলেও, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে জৈব চাষও অধিক ফলনে সহায়ক।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল ধান। টেকসই কৃষির জন্য এখানে বীজ উৎপাদন করতে হবে, অন্যথায় প্রতিবার হাইব্রিড বীজ কিনতে হবে। হাইব্রিড বীজের পরিবর্তে প্রাকৃতিক বীজের ব্যবহার প্রচারের জন্য অনেক আন্দোলন চলছে। সুন্দরবনে সুঠাই কৃষির আওতায় অনেকগুলো বীজ-ব্যাংক গড়ে উঠছে। ড. অনুপম পাল, দেবল দেব দেশীয় বীজ নিয়ে কাজ করছেন, স্থানীয় প্রজাতীর ধান রক্ষা করছেন এবং কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ দিচ্ছেন। সুন্দরবনে সবুজ ছোলা এবং মুর্শিদাবাদে লাল মসুর ডাল, দুটোই জৈবভাবে জন্মে। শাকসবজি চাষ এখনও বেশিরভাগ হাইব্রিড পদ্ধতিতে করা হয়। নিউ টাউনে জৈব সবজি বিক্রির জন্য একটি সাততলা সুপারমার্কেট তৈরি করছে রাজ্য কৃষি বিপণন দপ্তর, যার নাম ‘জৈব হাট’। এখানে কৃষকদের সবজি বিক্রির জায়গা দেওয়া হবে। ফুড কোর্ট ও ল্যাবরেটরিও তৈরি হবে। গ্রাউন্ড, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় থাকবে অর্গানিক মার্কেট। তৃতীয় তলায় থাকবে অর্গানিক ফুড কোর্ট। পঞ্চম তলায় উন্নত গবেষণাগার এবং একটি অফিস থাকবে। ষষ্ঠ তলায় থাকবে একটি গেস্ট হাউস।
ভৈরব সাহানি, জৈব ধান চাষি
জৈব ধান চাষি ভৈরব সাহানি বলেন, “ধান প্রধানত বাংলায় জন্মায় এবং ধান থেকে পাওয়া মুড়ি, চিড়ে, খই ইত্যাদি জৈব বাজারে চালের সঙ্গে বিক্রি হয়। তেল ও মসুর ডালও উৎপাদিত হয় তবে তুলনামূলক কম হারে। এই পণ্যগুলি ১৫টি কাউন্টারে বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, কোয়েম্বাটোর, মুম্বাই, আহমেদাবাদ সহ ১১টি রাজ্যে সরবরাহ করা হয়। বাংলায় প্রায় ৩৫০ ধরনের ধান জন্মে এবং প্রায় ১০ থেকে ১২ ধরনের ধান বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়, যেমন- লাল বাসমতি চাল, কালো বাসমতি চাল, গোবিন্দভোগ, মোহনশাল, বহুরূপী ইত্যাদির চাষ হয়। আমি বেশিরভাগ কাজ করি সোনামুখী ব্লক, বাঁকুড়ায়।”
*ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে ক্লিক করে।