৩৭৫ জন বেগম, ছ’হাজার প্রজা, ২৩টি বাঘ, সিংহ, চিতা— কলকাতার নবাবের ‘নকল’ রাজত্ব

১৮৫৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ন’বছরের নবাবি জীবন শেষ হল লখনৌর শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-র। জেমস উট্রামের হাতে সঁপে দিতে হয়েছে রাজ্যভার। মনটাও ভেঙে গেছে। অসহায় নবাব পাড়ি জমালেন গঙ্গাপারের কলকাতার উদ্দেশে। ‘যব ছোড় চলি লখনউ নগরী’-র সুরে ও ভাষায় তখন কান্না জমাট বাঁধছে। প্রাণাধিক প্রিয় লখনৌ ছেড়ে কলকাতাযাত্রায় নবাব অবশ্য একা নন। সঙ্গী অসংখ্য বেগম, বাঁদি, নওকর, বাজনাদার, রাঁধুনি ও আত্মীয়স্বজন। সব মিলিয়ে নেহাত কম লোক নয়। ১৩ মে ওয়াজিদ আলি শাহ পৌঁছোলেন কলকাতায়। তাজবিহীন নবাব, তবুও তাঁকে শহরে স্বাগত জানানো হয়েছিল একুশটি তোপধ্বনিতে। সেই শেষ। জীবনে আর তোপধ্বনির রাজকীয় অভ্যর্থনা পাননি ওয়াজিদ আলি শাহ।
কিন্তু ‘নবাব’ থাকবেন কোথায়? তারও একটা ব্যবস্থা হল। গার্ডেনরিচ তখন সাহেবদের সবচাইতে প্রিয় জায়গা। কলকাতায় ঢোকার মুখে গঙ্গাটা সরু হয়ে আসে। আর জাহাজ থেকে দেখা যায় সারি সারি রাজকীয় বাগানবাড়ি। তার মধ্যেই একটা কলকাতার প্রাক্তন চিফ জাস্টিস স্যার লরেন্স পিল-এর ১১ নং বাংলো। বাংলো না বলে প্রাসাদ বলাই ভালো। প্রাসাদের সঙ্গে জোড়া নিজস্ব ঘাট। ঠিক নবাবি ব্যবস্থা না হলেও তখন এর চাইতে ভালো ঠিকানা আর কীই বা পেতেন ওয়াজিদ আলি শাহ। অতএব, গার্ডেনরিচই তাঁর স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হল। বাংলোর নাম বদলে হল সুলতানখানা। পাশের দুটো জমি আর বাড়িও কিনে নিলেন ‘নবাব’। সঙ্গে আসা বেগম, নওকর, মানুষজনদেরও তো থাকার ব্যবস্থা করতে হবে নাকি! একটা ছোটোখাটো রাজত্বই তো বলা চলে।
কলকাতার বুকে সত্যি একটা ছদ্ম রাজপাটই গড়ে তুলবেন এরপর ওয়াজিদ আলি। প্রজাসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ছ’হাজার। বেগমের সংখ্যাও মোটামুটি ভালোই, সব মিলিয়ে মোট ৩৭৫ জন। সব বেগম অবশ্য লখনৌ থেকে কলকাতায় আসেননি। আবার মেটিয়াবুরুজের একত্রিশ বছরেও ‘নতুন’ বেগম কম হয়নি তাঁর। সে যাহোক, লখনৌ থেকে বেগমরা ছাড়াও এসেছিলেন অসংখ্য সভাসদ, কাজের লোক। ২৪৫ জন ‘বিশেষ রক্ষী’, ১২০ সশস্ত্র রক্ষী, ১৮ জন খোজা ছাড়াও ছিল ৫০ জন আফ্রিকান দাস। কসাই, রসুইকর, জমাদার, ধোপা, নাপিতদের কথা তো ছেড়েই দিলাম। বেগমদের সেবা করার জন্যেও হাজারো লোক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন প্রাক্তন ‘নবাব’-কে মাসোহারা দেয় এক লক্ষ টাকা। এইটুকু টাকায় কি এত লোকের খোরাকি হয়? অতএব, ধারের পরে ধার বাড়তেই থাকে। ওয়াজিদ আলির সঙ্গে লালমুখো সাহেবদের ঝামেলাও কিছুতে ফুরোয় না।
অথচ, নবাব মোটেও অশান্তি পছন্দ করেন না। তিনি বড়ো কোমল মানুষ। তিনি নিজে গান বাঁধেন, গান। সন্ধে হলেই তাঁর প্রাসাদ থেকে ভেসে আসা ঠুমরির সুর গঙ্গার ওপরে পাক খেতে থাকে। কিন্তু, শান্তি চাইলেও জীবন তাঁকে শান্তি আর দেয় কই! রাজত্ব গেছে, মেটিয়াবুরুজের নকল রাজত্বে নবাবি বিলাসে টান পড়ে রোজই। ঘরের অন্দরে বেগমদের মধ্যেও অশান্তি। কেউ কেউ রাগে-অভিমানে লখনৌ ফিরেও যেতে চাইছেন। কলকাতাবাস মোটেও সুখের হয়নি তাঁর। এর মধ্যেই মিথ্যে অভিযোগে সাহেবরা তাঁকে ফোর্ট ইউলিয়ামের বন্দি করল। মুক্তি পেলেন যখন, ততদিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকাল শেষ, শাসনভার ‘মহারানির’ জিম্মায়।
কলকাতা সত্যিই তাঁকে যন্ত্রণা নেহাত কম দেয়নি। সেই যন্ত্রণা থেকেই লিখেছেন ‘হুজনে আখতার’। অর্থাৎ আখতারের খেদ। বলাই বাহুল্য, ‘আখতার’ ওয়াজিদ আলিরই ছদ্মনাম। ১২৬৬ হিজরিতে, মেটিয়াবুরুজের নবাবি প্রেস ‘মতরা-ই-সুলতানি’ থেকে প্রকাশ পেয়েছিল এই ছোটো পদ্য-আখ্যান। শুধু নবাবি প্রেস কেন, মেটিয়াবুরুজে ততদিনে একটা গোটা রাজত্বই গড়ে ফেলেছেন ওয়াজিদ। সাহেবি কলকাতার বুকে একটুকরো নবাবি মুক্তাঞ্চল। স্থানীয়রা বললেন, ‘ছোটা লখনৌ’। যেখানে ব্রিটিশ পুলিশও নাক গলাতে পারে না। ইমামবারা, প্রাসাদ, আমির-ওমরাহ, খিদমদগার, গাইয়ে-বাজিয়ে-নর্তকীদের নিয়ে তৈরি সেই রাজত্বে আছে একটা পেল্লায় চিড়িয়াখানাও। সেই চিড়িয়াখানা নবাবের নিজস্ব। তেইশটি বাঘ, সিংহ, চিতা ছাড়াও সেখানে আছে হাজার হাজার পাখি। শুধু পায়রার সংখ্যাই হাজার চব্বিশ। নবাবের প্রাসাদের ছাদেও পায়রার ঝাঁক ওড়ে। গঙ্গার ওপারে দাঁড়ানো মানুষগুলোর তখন মনে হয়, আকাশে বদলে বদলে যাচ্ছে আলপনা...
এই চিড়িয়াখানা থেকেই একদিন পালিয়ে গেল একজোড়া বাঘ আর বাঘিনী। গঙ্গা পেরোনোর সময় বাঘটিকে গুলি করে মারা হল। কিন্তু বাঘিনী সাঁতরে পৌঁছে গেল ওইপারে। তারপর হানা দিল শিবপুরের বোটানিকাল গার্ডেনে। সে এক হইচই ফেলে দেওয়া ব্যাপার।
হলেনই বা তাজবিহীন নবাব, তা’বলে মিথ্যে নবাবির দুনিয়ায় এমন তোলপাড় ফেলে দেওয়া ঘটনা ঘটবে না! ওয়াজিদ আলি শাহ কলকাতাকে নবাবি মেজাজ শিখিয়েছেন, সুর শিখিয়েছেন, কত্থকের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচয় করিয়েছেন। রোজি লেওলিন জোন্স তাঁকে বলেছেন, ‘দ্য লাস্ট কিং ইন ইন্ডিয়া’। আর ভারতের শেষ বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ মসনদ খুইয়ে দিল্লি থেকে বিতাড়িত হয়ে রেঙ্গুন যাওয়ার পথে থামলেন মেটিয়াবুরুজের গঙ্গায়। সুলতানখানার বারান্দায় দাড়িয়ে তখন হাত নাড়ছেন ওয়াজিদ আলি শাহ। রাজত্ব হারানো দুই রাজার চোখেই কি জল ছিল সেদিন?
আরো পড়ুন
পাজি ‘সঙের দল’ আর সেকেলে কলকাতা
‘আখতারি খেদ’-এ ওয়াজিদ লিখেছিলেন, এখানে চাঁদ নেই, সূর্য নেই, আপনজনরাও কাছে নেই... সে অবশ্য বন্দিদশার কথা। কিন্তু মাঝেমাঝে মনে হয়, এই কথাগুলো তাঁর মেটিয়াবুরুজ-বাসের ক্ষেত্রেও সমান সত্যি। এত এত বেগম, পুত্র, সভাসদ থাকা সত্ত্বেও তিনি বড়ো একা। সাধের লখনৌ থেকে বিতাড়িত। মেটিয়াবুরুজের ‘রাজত্ব’ যেন তাঁর কাছে খেলনা শহর। সবই যে চলে যাচ্ছে, তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারতেন ‘নবাব’। সময়কে বদলানোর ক্ষমতা ছিল না তাঁর। তাই সন্ধে হলেই সুরে, নাচে, নেশায় বুঁদ হতেন। সেও এক আশ্রয়। কলকাতা যে আশ্রয় দিতে পারেনি, লখনৌ যে আশ্রয় কেড়ে নিয়েছিল—তাকে হয়তো নিজের সৃষ্টিতে, খেয়ালেই হাতড়ে বেরিয়েছেন ‘নবাব’। নকল রাজত্বের বন্দিত্ব থেকে হয়তো এভাবেই মুক্তি চেয়েছেন।
যেভাবে তাঁর সাধের চিড়িয়াখানা থেকেও মুক্তি চেয়েছিল সেই বাঘ আর বাঘিনী।
তথ্যসূত্র: মেটিয়াবুরুজের নবাব, শ্রীপান্থ; ‘রাজকাহিনি’, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫।