No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মির্জাগালিব স্ট্রিটে এখনও মেলে ‘পুরোনো’ গ্রামোফোনের ‘ভাইব্রেশন’ 

    মির্জাগালিব স্ট্রিটে এখনও মেলে ‘পুরোনো’ গ্রামোফোনের ‘ভাইব্রেশন’ 

    Story image

    ১৮৮৮ সালে জার্মান-বিজ্ঞানী এমিল বার্লিনার ‘সিলিন্ড্রিক্যাল ওয়াক্স রেকর্ড’-এর বদলে ‘ডিস্ক রেকর্ড’ তৈরি করেন। তাঁর সৌজন্যেই ‘ফোনোগ্রাফ’ যন্ত্রের নাম হয় ‘গ্রামোফোন’। অবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনাটি হল, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে খুব দ্রুত, মাত্র দু’বছরের মধ্যেই বাংলায় ‘কলের গান’-এর যন্ত্রটি পৌঁছে গেছিল। ১৮৭৯ সালে স্যামুয়েল হ্যারাডেন একটি নিম্নমানের ফোনোগ্রাম যন্ত্র কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। এই মার্কিন ভদ্রলোকই কলকাতার টাউন হলে মহমেডান লিটারেরি সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে ফোনোগ্রাম যন্ত্রটির দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। এই মহমেডান লিটারেরি সোসাইটি ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান সংগঠন এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন নবাব আবদুল লতিফ। ১৮৮৮ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার লাফোঁ একটি ফোনোগ্রাফ সংগ্রহ করেন। ফাদার লাফোঁর কিছুম পরেই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সেই সময়ের কর্মস্থল প্রেসিডেন্সি কলেজের গবেষণাগারে এই ধরনের একটি ফোনোগ্রাফ-যন্ত্র স্থাপন (১৮৯১) এবং সেই যন্ত্রে রবীন্দ্রনাথের গানও রেকর্ড করেন। স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা সফরকালে সেখান থেকে ১৮৯৪ সালের শেষ দিকে খেতরির মহারাজাকে একটি ফোনোগ্রাফ-যন্ত্র উপহার পাঠানোর কথা এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালের মধ্যেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও যে ফোনোগ্রাফ-যন্ত্র প্রবেশ করেছিল তার প্রমাণ মেলে ‘খামখেয়ালি সভা’র প্রথম অনু্ষ্ঠানপত্রে। এর পরের কাহিনি আরো এগিয়ে যাওয়ার—ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনার।

    কিরানা ঘরানার শিল্পী ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, পিয়ারা সাহেব, গওহরজান, ‘ছপ্পান ছুরি’ জানকি বাই হয়ে জল অনেকদূরই গড়িয়েছিল।  ১৮৯৯-এর মে মাসে ‘হিন্দুস্তানি রেকর্ডে’র একটি তালিকা-পুস্তিকা প্রকাশিত হয়; ফ্রেডরিক উইলিয়ম গেইসবার্গ-এর তত্ত্বাবধানে ৪৪টি রেকর্ডের মধ্যে হিন্দি, আরবি, ফারসি, উর্দু, গুরমুখি ভাষার গান ও আবৃত্তি থাকলেও বাংলা গান সেখানে ছিল অনুপস্থিত। গানগুলোর কয়েকটি ছিল রামায়ণ, হোলি, ও রাস-বিষয়ক – ছিল গুরু নানকের দোঁহা, হাফিজ ও মির্জা গালিবের কবিতা। মির্জা গালিব: উর্দু, পার্সি ভাষার কবি আসাদুল্লা বেগ খান। পীড়িত জীবন, মানবিক আবেগ আর চেতনার যে অক্ষর, তা দিয়েই তিনি বুনে গিয়েছেন তাঁর শায়েরমালা। ‘মির্জা গালিব’ এ নামেই পরিচিতি তাঁর, সফর এ কলকাত্তাহ-তে তিনি লিখেছিলেন, কলকাতার মতো এমন মন জয় করা জমি তামাম দুনিয়ায় নেই। এত কিছু বলার কারণ, ‘আধুনিক’ কলকাতায় মির্জা গালিবের নামাঙ্কিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ‘ভাইব্রেশন’-এর সামনে থমকে দাঁড়িয়ে এ কথাই মনে পড়ছিল।

    মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘ভাইব্রেশন’

    ‘ভাইব্রেশন’, নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই ছোট্ট দোকানটি একসময়ে সত্যিই শহরে কাঁপুনি ধরাতো। কারণ এই ভাইব্রেশনই এককালে ছিল সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় শিল্পীদের ‘কমন ট্রেজারি’। বাছাই করা কিছু গান-বাজনা-সিনেমার কালেকশন পাওয়া যেত শুধুমাত্র এই নির্ভরযোগ্য ঠিকানাতেই। এমনকি এখনও দোকানের বাইরে সাজানো থাকে ‘নস্ট্যালজিয়া’- গ্রামোফোন, পেল্লায় সব রেকর্ড। কলকাতায় বসে আন্তর্জাতিক কিছু ‘মাস্টারপিস’-এর হদিশ মিলত গুড্ডুভাইয়ের পূর্বপুরুষদের কাছেই. এইমুহূর্তে ভাইব্রেশন-এর দেখভাল করেন গুড্ডু ভাই। চৌরঙ্গি চত্বরে ভাইব্রেশন-এর থেকে ‘গুড্ডু ভাইয়ের দোকান’ নামটাই বেশি সড়গড় সকলের।

    ক্রেতা সামলাচ্ছেন গুড্ডু ভাই

    ‘পু্রোনো’ সে সব কথা উঠতেই চোখমুখ উজ্জ্বল করে সেই গুড্ডু ভাই-ই বলছিলেন ৭-৮ দশকের কথা, “আমি তখন খুব ছোট। আমার ঠাকুরদার পরে বাবা দায়িত্ব নিল, বাবার সঙ্গে আমি প্রায়ই দোকানে এসে বসতাম। দেখতাম অঞ্জন দত্ত, সুমন, নচিকেতা, এ শহরেরই আরও কত গুণী মানুষ এসে কিনে নিয়ে যেতেন রেকর্ড। তখন বাছাই করা কিছু রক কনসার্টের কালেকশন শুধুমাত্র আমাদের কাছেই পাওয়া যেত। শুধু কি গান? বার্গম্যান, ফেলিনি, ত্রুফো, গোদার, কিয়োরস্তামি, কুরোসওয়া, ইলমার্জ গুনে সব ‘এক সে বড় কর এক’ পরিচালকের সিনেমা আমরা রাখতাম। কারও কাছে পাওয়া যেত না। কে আগে পাবে, এই নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। তারপর আমি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবই বন্ধ হয়ে গেল। গ্রামোফোন রেকর্ড, ভিসিআর, ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি একে একে সবই হারিয়ে যেতে দেখলাম আমি। এখনও বাড়িতে এত কালেকশন, রাখার জায়গা নেই, ভাঙাড়িতে দিলেও নেয় না। গান দিয়েই আমাদের পারিবারিক ব্যবসা শুরু হয়েছিল তাই এখন ‘গান রিলেটেড’ জামাকাপড়, অ্যাকসেসরিজ এর বিজনেস করি, গানটা ছাড়তে পারিনি।”

    জনপ্রিয় 'রক' গানের দল বিটলস-এর নামাঙ্কিত মানিব্যাগ

    শুধু গান নয়, গুড্ডু ভাই ছাড়তে পারেননি অনেককিছুই। ছাড়তে পারেননি পারিবারিক মূল্যবোধ, পুরনো রুচি, ভালোলাগা, ভালোবাসা। দীর্ঘদিন খিদিরপুর নিবাসী হিন্দিভাষী খাঁটি বিহারী মুসলমান হয়েও, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি তিনি এত ভালো চেনেন বোঝেন, যা হার মানাবে অনেক বঙ্গবাসীদেরই। রাস্তার পাশে দোকানের অবস্থানে ধুলোবালির বেশ বেশি, তাই ক্ষণে ক্ষণে হাত বুলিয়ে নরম কাপড়ে মুছে নেন পুরনো সামগ্রী। এখনও নাকি বিক্রি হয় সেসব। কালেভদ্রে হলেও পুরনো জিনিসের অর্ডার পান গুড্ডু ভাই। তাতেই দিল খুশ তাঁর।

     

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @