ভাদু, ভদ্রাবতী, ভদ্রেশ্বরী এবং 'ভাদ্রজা'

ভাদু কে? তিনি কি মানভূমের রাজা সিংদেও পরিবারের রাজকন্যে? সেই রাজকন্যে লোকপূজ্য হয়ে উঠলেন কী করে? কীভাবেই বা জুড়ে গেলেন ফসল-উৎসবের লোকাচারের মিথে? নাকি ভাদু নিম্নবর্গসূতা? কিংবা আদতে লোককল্পিত দেবী! রাজপরিবারের অনুষঙ্গটিই প্রক্ষিপ্ত! ভাদু কজন? ভদ্রাবতী ও ভদ্রেশ্বরী কি একই নারী? ভাদুর আখ্যানে লেপ্টে থাকা ইতিহাস কতখানি ইতিহাস? সাময়িকতা সেখানে কতটা গ্রাহ্য?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। রহস্যের ঘাড়ে চেপে বসে রহস্যের বাঘ।
ভাদুকে ঘিরে থাকা কোনো প্রশ্নেরই সহজ উত্তর পাওয়া কঠিন। একে তো ঐতিহাসিক রাজপরিবারের অনুষঙ্গ। তার ওপর, আঠেরো শতকের (মতান্তরে উনিশ শতক) নির্দিষ্ট সময়কালের উল্লেখ। এবং, খোদ রাজপরিবারের পক্ষ থেকে শাস্ত্রীয় ভাদুগানের প্রচলন। এই গোটা ব্যাপারটা ভাদুকে এক ঐতিহাসিক চরিত্র দেয়। অথচ, ভাদুপুজো লোকউৎসব। ভাদুগান লোকগান। ভাদু লোকাচারের গপ্পগুলোও তাই এই রাজপরিবারে জড়ানো ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খায় না। ঠিক যেমন খাপ খায় না রাগরাগিণী নির্ধারিত রাজকীয় ভাদুগান। যে কোনো গবেষকের কাছেই ভাদু তাই বেজায় শক্ত ধাঁধাঁ।
অবশ্য নাটকের এই ধাঁধাঁ নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে। সে তো গপ্প বলবে। গপ্পের অধীশ্বর কল্পনা। ভাদুর গায়ে এমনিতেই সেই কল্পনা ভালোমতোই লেপ্টে। তাছাড়া, এমন বিষয় বাছলে উপরি পাওনা হল গান। মানভূমের ডায়লেক্ট, ভাদু গান, লোকাচার, কল্পনা, রাজপরিবারের আখ্যান—সবটা মিলিয়ে একটা হইচই বাঁধিয়েই দেওয়া যায় মঞ্চে। জটিল দ্বন্দ্বের জায়গাগুলির নরম ইঙ্গিতমাত্র থাকলেই হবে। জমজমাট সেই নাটকের সাফল্য ঠেকায় কে!
ইচ্ছাকৃতভাবে এই সুযোগকে পাশ কাটিয়ে গেছে ‘স্পেক্টঅ্যাক্টর্স’ প্রযোজিত ‘ভাদ্রজা’। ‘ইচ্ছাকৃত’ শব্দের ব্যবহারটিও ইচ্ছাকৃত। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় এবং নির্দেশনায় এই নাটক নিছক একটা নাচ-লোকগানে জমাটি ভাদুর কাল্পনিক আখ্যান বা লোকমিথের নাটকীয় উদযাপন হয়ে উঠতে চায়নি। গবেষণার সন্দর্ভ আর নিখাদ কল্পনার মাঝে যদি কোনো নাট্য-জমি থাকে, সেখানে দাঁড়িয়েই কথা বলেছে এই নাটক, অভিনয় করেছেন নাটকের চরিত্ররা।
এই কথাটা বুঝতে ভুল হলে মুস্কিল। গল্পের প্রয়োজনে কল্পনার সুতো এখানে ভালোই দীর্ঘ। গান—সে তো গোটা নাটকের শরীরেই বিছানো। কিন্তু, এখানে ‘ভাদু’কে ঘিরে নাচে-গানে-আলোয় জমাটি কোনো ‘শো’ নেই। বরং, ভাদ্রজায় প্রতি পরতে পরতে মিশে আছে গবেষকের জিজ্ঞাসা। ইতিহাস-মিথকে ছেনে ছেনে খুঁজতে চাওয়া নানা উত্তর, শ্রেণিদ্বন্দ্বের আবহমান ভাষ্য। এবং, সেটি করতে গিয়ে নাটকটি কিন্তু মঞ্চের সন্দর্ভ হয়ে ওঠেনি। নাটকীয়তা টাল খায়নি একচুলও।
স্পষ্ট করেই বলা যাক, ‘ভাদ্রজা’ বেশ উৎকৃষ্ট নাটক। নানা কারণেই উৎকৃষ্ট। যেমন ধরা যাক, নাটকের গড়নটি। নাটকে একাধিক সময়। আঠেরো শতক থেকে সাম্প্রতিক। ভাদুর গপ্পে লেপ্টে থাকা অতীত এবং সাম্প্রতিকের মাঝে লুকোনো সময়খণ্ডও আছে। এই জালের মতো সময়বুননে গাঁথা হয়েই কাহিনি এগিয়েছে। এক দৃশ্যখণ্ড থেকে আরেক দৃশ্যখণ্ডে বদলে গেছে সময়। এই সময়, সময়ের গল্পগুলি সমান্তরাল নয়। পরস্পরে অভিলিপ্ত। একটি সময়ের জিজ্ঞাসার উত্তর অন্য সময়ে। অতীতের উত্তর কখনো বাহিত সাম্প্রতিকের সন্দেহেও।
নাটকে একজন গবেষক আজকের মাটিতে দাঁড়িয়ে সিংদেও রাজপরিবারে এসে খুঁজছে ভাদুর ইতিহাস। সেই ইতিহাসটির শুরুটা দর্শক দেখেছে আগেই। সেই দেখার চোখকে পুনর্নির্মাণ করছে গবেষক, রাজত্বহীন রাজার বংশধর এবং তার রাজরানি ‘বৌদির’ কথোপকথন। একটা আবহমান ন্যারেটিভ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। শোষণের, অধিগ্রহণের, রাক্ষুসে যৌনক্ষুধার, আধিপত্যের এবং প্রেমের। যেখানে আজকের নায়েব-কন্যা সহেলিও সমাপতিত ভাদুতে। ভাদু আসলে অনেক, প্রেমিক মাতানরাও একাধিক। প্রতি প্রজন্মে কোনো না কোনো মাতান ভালোবাসে ভাদুকে। ভাদুগানের মতোই বয়ে চলে এই ইতিহাস। এভাবেই সময়গুলি নিজেরাই কখন যেন অতিক্রম করে যাচ্ছে নিজেদের। ইতিহাস নতজানু হচ্ছে নতুন ইতিহাসের পাঠে।
ভাদরিয়া জঙ্গলের কোনো এক বনগ্রামের প্রসাদ মাহাতো কুড়িয়ে পেয়েছিল সদ্যোজাত ভদ্রাবতীকে। ভাদ্রমাসের কন্যা বলে এই নাম। আদরের ডাকনাম ভাদু। মাতানের সঙ্গে তার মন জুড়েছে। এমন সময় সিংদেও রাজা আসেন শিকারে। মেয়ের বয়সী ভদ্রাবতীকে দেখে গান্ধর্ব মতে বিবাহের সাধ জন্মে তার। মাতানের থেকে ছিঁড়ে ভাদুকে নিয়ে যান রাজা। বড়োরানি অহল্যার আপত্তিতে রাজপ্রাসাদে ঠাঁই হয় না ভাদুর। সে গ্রামে ফেরে গর্ভে রাজার বীজ নিয়ে। রাজা গর্ভবতী ভাদুকে চিনতেই চান না। সন্তান বিয়োতে গিয়ে ফুরিয়ে যায় ভদ্রাবতীর গল্প। জন্মায় ভদ্রেশ্বরী। মাতান তার পালিত বাবা। এই ভদ্রাবতী ও ভদ্রেশ্বরী-- দুজনের কথাই মেলে ভাদুর মিথে। তারা এক না ভিন্ন, এই প্রশ্নের সমাধান এভাবেই খোঁজেন নাট্যকার। আর, এই গল্পে মিশে যায় রামায়ণের সীতা কিংবা শকুন্তলা-দুষ্মন্ত্যর আখ্যানও।
রাজা ফের ফিরে আসেন কন্যা ভদ্রেশ্বরীকে নিতে। ফের মাতানের থেকে ছিঁড়ে যায় ভাদু। ভদ্রাবতীর পর রাজশাসনের শিকার হয় ভদ্রেশ্বরীও। তারপর দেবত্ব অর্পিত হয় সেই 'শিকারের' ওপর। সেই কাহিনি নাটকে দেখাই ভালো। এরই মধ্যে দ্বিতীয় কাহিনিতে রাজবংশের সাম্প্রতিক প্রজন্মের রাজাবাবুর চোখ পড়ে নায়েব-কন্যা সহেলির ওপর। সেই ক্ষুধার ইতিহাস সমাপতিত হয়। এক গল্প জড়িয়ে যায় অন্য গল্পে। এই গল্প তাই ভদ্রাবতীর, ভদ্রেশ্বরীর এবং সহেলির। এই গল্প আসলে ভাদুর। চিরকালের ভাদুদের।
‘ভাদ্রজা’র এই আখ্যান সহজ নয়। অসংখ্য সূক্ষ্মতার মোচড় তাই নাটকের শরীর জুড়ে। আঠারো শতকের হাড়হিম সামন্ততান্ত্রিক কোনো এক দৃশ্যায়নের পরেই দুম করে শোনা যায় আবহে ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণা। দর্শক সমকালে আছড়ে পড়েন। অথচ, এই সংযুক্তিটি ঘটে শ্রুতিতে। কিংবা, ভাদুর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠায় রাজা বক্তৃতা দেন। তাঁর শ্রোতামণ্ডলী অদৃশ্য। অথচ, তাদের বাচিক উপস্থিতি ভীষণভাবে টের পান দর্শক। নাটকের ভিতরেই এভাবে বিমূর্ত অস্তিত্বর ইঙ্গিত জন্ম নেয়। আখ্যানের ভিতর চারিয়ে যায় নানা পাঠ, অন্য আখ্যানও।
এই নাটকের সম্পদ এর অভিনয়। কী অসামান্য অভিনয়ই না করেছেন সৌম্য সেনগুপ্ত, শ্রমণ চটোপাধ্যায়, বরুণ গঙ্গোপাধ্যায়, অরিজিতা মুখোপাধ্যায় এবং অ্যাঞ্জেলা মণ্ডল। মূল চরিত্র চোদ্দটি অথচ অভিনেতা এই পাঁচজন। অতএব, প্রত্যেককেই অভিনয় করতে হয়েছে একাধিক চরিত্রে। এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে প্রবেশের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কম। পোশাক বদলাতে হয়েছে বারবার। কিন্তু এহো বাহ্য। আসলে তো বারবার ঢুকতে বেরোতে হয়েছে একটি চরিত্রের শিকড় থেকে অন্য চরিত্রে। এক শ্রেণিভাষ্য থেকে বিপরীত শ্রেণিভাষ্যে। অরিজিতা মুখোপাধ্যায়ের কথাই ধরা যাক। ভদ্রাবতীর পালিতা মা পার্বতী, আবার রাজা মহতাব সিংদেওর বড়ো রানি অহল্যা। তারই পাশাপাশি, ধূমপানে স্বচ্ছন্দ, পালিশ করা, ঝকঝকে উচ্চারণে কথা বলতে পারা রাজপরিবারের শিক্ষিতা, আধুনিক বধূ। সংলাপের ধরণ, শরীরী ভাষ্যর পরিবর্তনে একবারও পিছলোয়নি তাঁর অভিনয়। তিনি যে কত বড়ো নাট্য-অভিনেত্রী, তা আরো একবার প্রমাণ করেছেন অরিজিতা। একইভাবে, দুটি ভিন্ন সময়ের রাজার চরিত্রে, একাধিক বডি ল্যাংগোয়েজ এবং ডায়ালেক্টের জটিল গলিপথে হাঁটতে হয়েছে সৌম্য সেনগুপ্তকেও। বড়ো সূক্ষ্ম তারে অভিনয় করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। কোনো কোনো দৃশ্যে তাঁকে শীতল হিংস্র মনে হয়। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন বরুণ গঙ্গোপাধ্যায়। কখনো ভাতরিয়া বনের প্রসাদ মাহাতো, কখনো নায়েব এবং শহুরে গবেষক। মাতানের সঙ্গে কথায় গবেষকের শ্রেণিচরিত্র ছলকে বেরিয়ে আসে হঠাৎ, এবং সঙ্গেসঙ্গেই সেই ক্ষণিকের স্খলনকে গিলে নেন তিনি। সামান্য কণ্ঠস্বরের অভিনয়। অসাধারণ। ভদ্রাবতী, ভদ্রেশ্বরী এবং সহেলির চরিত্রে বড়ো মানানসই অ্যাঞ্জেলো মণ্ডলও। চরিত্রে বাসা না বাঁধলে এমন অভিনয় সহজ না। সেটা অ্যাঞ্জেলো পেরেছেন।
তবে, এই নাটকের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি শ্রমণ চট্টোপাধ্যায়। ‘বুকঝিম এক ভালবাসা’ নাটকে একক অভিনয়ে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন শ্রমণ। এই নাটকে তিনটি মাতানের ভূমিকাতেই তিনি অনবদ্য। শারীরিক এবং বাচিক অভিনয়ের শীর্ষ ছুঁয়েছেন শ্রমণ। সঙ্গে রয়েছে গান। মাতানকে নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন শ্রমণ চট্টোপাধ্যায়।
অরুণ মণ্ডলের মঞ্চসজ্জা সামান্য আয়োজনেই পর্যাপ্ত অভিঘাতী। আবহদৃশ্যের নির্মাণে প্রোজেক্টরের ব্যবহার নাটকের বহুমাত্রিক আখ্যানকে সযত্নে লালন করেছে। আখ্যানের অন্তর্ঘাতকে আরো তীব্র করেছে বরুণ করের আলো। পোশাকে গিরি সরকার এবং রূপসজ্জায় মহম্মদ আলীর কথাও বিশেষভাবে বলা উচিত। নাটকের সংগীতের দায়িত্ব দারুণ সামলেছেন মৃগনাভি চট্টোপাধ্যায়। নাটকের অসংখ্য গানের কোনোটা সংগৃহীত, কোনোটা বা নতুন রচনা। মাতানের কণ্ঠেই রয়েছে প্রায় দশটি একক গান। গানেরা আখ্যানের স্মৃতিকে বুনেছে, প্রেমকে, বিরহকে বুনেছে, ভাদুর সমষ্টিগত উদযাপনকেও বুনেছে। এরই পাশাপাশি আবহের সংগীতও এসে মিশেছে নাটকের গল্পে। সাম্প্রতিকে বা স্মৃতিতে। গোটা সাউন্ডস্কেপটি চাদরের মতো ঘিরে রেখেছে নাটকের জায়মান আখ্যানটিকে। অথচ, কী পরিমিত, কী সহজ, আড়ম্বরহীন এই সংগীতের প্রয়োগ।
‘ভাদ্রজা’ নাটক জুড়েই যেন এক উন্মোচন চলতেই থাকে। রাজকীয় ষড়যন্ত্র, যৌনক্ষুধা, দখলের গপ্পেরা সময় পরিবর্তন করে। কেউ বলতেই পারেন, নাটকে মূলনিবাসী, নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতিবাদ কই? কেন তারা ভাদুর রাজপরিবারে আত্মসাৎ হওয়াকে স্বীকৃতি দিল? নাটকের দায় নয় সন্দর্ভের মতো সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। তবু, উত্তর আছে। ‘হেজিমনি’ জন্মের সংকেত আছে। মাতানের বিদ্রোহে প্রতিবাদ আছে, মাতানদের বয়ে চলা গল্পের ভিতরেও রয়েছে অন্তর্ঘাত। নাটক সেই অন্তর্ঘাতগুলোকেও উন্মোচন করতে করতে যায় নানা স্তরে।
তবে, ভালো লাগারও কিছু ভাগশেষ থাকে। এই নাটকের প্রায় শেষে ভাদুর মুখে কয়েকটি সংলাপ তাই বাহুল্য মনে হয়েছে। যাবতীয় অভিঘাতের পরেও শেষ দৃশ্যটি নিয়েও প্রশ্ন থাকতেই পারে। আগ্রাসনের ইতিহাসটি ততক্ষণে উন্মোচিত।
নাটক- ‘ভাদ্রজা’
প্রযোজনা- ‘স্পেক্টঅ্যাক্টর্স’
নাটক রচনা এবং নির্দেশনা- সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সংগীত- মৃগনাভি চট্টোপাধ্যায়
অভিনয়ে- সৌম্য সেনগুপ্ত, শ্রমণ চটোপাধ্যায়, বরুণ গঙ্গোপাধ্যায়, অরিজিতা মুখোপাধ্যায় এবং অ্যাঞ্জেলা মণ্ডল।