No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় : পশ্চিমবঙ্গের প্রথম স্কুল, যেখানে যুদ্ধবিরতি দিবস পালিত হয়

    উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় : পশ্চিমবঙ্গের প্রথম স্কুল, যেখানে যুদ্ধবিরতি দিবস পালিত হয়

    Story image

    “মন্দগতি ভগবতী চলে না চরণ।
    উত্তরপাড়ায় ধীরে দিল দরশন।
    সুস্থির হইল অঙ্গ, করিল বিশ্রাম,
    দেখিতে লাগিল চেয়ে জয়কৃষ্ণধাম।
    রমণীয় অট্টালিকা সরনী বাগান,
    মনোহর বিদ্যালয় ভিষজের স্থান।
    বীণাপানি মনোরম পুস্তক আলয়,
    শত শত শাস্ত্রমালা যথায় সঞ্চয়।” --- দীনবন্ধু মিত্র (দীনবন্ধু গ্রন্থাবলী)

    বাংলার নবজাগরণের ইন্ধনে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ বাংলায় হয়েছে। উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় (Uttarpara Government High School) তারই একটি ফসল। উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের লক্ষ্য, পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন এবং দেশকে ভাবী সু-নাগরিক উপহার দেওয়া।

    এই স্কুল সৃষ্টির পিছনে একটা ইতিহাস আছে-

    ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভগে করুণাসাগর পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ক্ষণজন্মা ডিরোজিও, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঐতিহাসিক প্রাবন্ধিক ভূদেব মুখোপাধ্যায়, শিক্ষাবিদ উইলিয়াম কেরী, সবধর্ম সমন্বয়ের প্রবর্তক শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব প্রমুখের শুভ প্রচেষ্টায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক পালাবদলের সূত্রপাত ঘটে। তারই একটি অপ্রতিরোধ্য ঢেউ পাক খেয়ে আছড়ে পড়েছিল দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে, যেখানে গড়ে উঠেছে জগত্তারিণী বা ভবতারিণী মন্দির। এই মন্দিরের অব্যবহিত বিপরীত দিকে আছড়ে পড়েছিল ঢেউ-এর আর একটি অংশ, যেখানে গড়ে উঠেছে হুগলি জেলা তথা তথা পশ্চিমবঙ্গের সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়।

    সংস্কারের আগে, পুরোনো স্কুলবাড়িটির পিছন দিক

    হুগলি জেলার মফসসল শহর উত্তরপাড়ার আধুনিক রূপকার, নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা দানবীর জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের আন্তরিক উদ্যোগে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে ১৮৪৬ খ্রীস্টাব্দের সম্ভবত ১৬ মে উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আদি নাম ছিল “উত্তরপাড়া ইংরাজী স্কুল।” প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মিঃ রবার্ট হ্যান্ড। তাঁর কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন বঙ্গসমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তী মনীষী রামতনু লাহিড়ী মহাশয়। সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত ৪০ জন বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী প্রধানশিক্ষক মহাশয়ের পদ অলংকৃত করেছেন। স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বনমালী মিত্র, যদুনাথ পাল, হরকান্ত বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ নিয়োগী, হরিপদ মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন বসু, বীরেন্দ্রনাথ সেন, উপেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখের নাম স্মরণীয়। ১৭৫ বছর পার করা এই প্রাচীন বিদ্যালয়ের অগণিত কৃতী ছাত্রের তালিকায় প্যারীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসন্নকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ভুবনমোহন মিত্র, দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক, কাননবিহারী মুখোপাধ্যায়, হাইকোর্টের নামজাদা আইনজীবী ডঃ ত্রৈলোক্যনাথ মিত্র, শক্তিনাথ মুখোপাধ্যায়, শল্য চিকিৎসক ডাঃ বিষ্ণুপদ চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ চিত্তশঙ্কর দাঁ, শিল্পী চৈতন্যদেব চট্টোপাধ্যায়, অনির্বান কুণ্ডু, উৎপল মণ্ডল, পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী, প্রমুখ উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

    বর্তমানে উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতঃ বিভাগ এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত দিবা বিভাগ। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে দু'টি করে বিভাগ। প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান (দুটি বিভাগ), বাণিজ্য এবং কলা বিভাগে পঠন পাঠনের ব্যবস্থা আছে। একাদশ শ্রেণীতে ছাত্র ভর্তি করা হয় মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে, সরকারি নিয়ম মেনে।

    স্কুলে ভালো গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি, স্মার্ট ক্লাস, বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ল্যাবরেটরি আছে। সোলার পাওয়ার প্লান্ট রয়েছে এই স্কুলে।

    স্কুলের শিক্ষক সৌগত বসুর এই তথ্য দিতে দিতে বলছিলেন, “বিগত কয়েক দশক ধরে আমাদের স্কুলের ছাত্রদের রান্না করা খাবার দেওয়া হয়ে আসছে টিফিনে। আমি এই স্কুলে ২৫ বছর চাকরি করছি, তারও আগে থেকে এই প্রথা চলে আসছে। এখন মিড ডে মিল চালু হয়েছে, তাও সেটা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্ররা পায়। আমরা নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব ছাত্রদের সেই বহু আগে থেকে দুপুরে টিফিনে রান্না করা খাবার দিয়ে আসছি। খাবার নষ্ট হওয়া ও অতিরিক্ত টিফিন নিয়ে আসা রোধ করতে টোকেন সিস্টেমে টিফিন দেওয়া শুরু হয়েছিল।”

    “স্কুলের ১৭৫ বছর শুরু হয় রক্তদান শিবির দিয়ে। ২০২০-২০২১ সালে ১৭৫ বছর অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল। করোনার জন্য সেই উদযাপন হতে পারেনি। এখনও তাই ১৭৫ বছর উদযাপন চলছে। বড়ো মিছিল হয়, ছৌ-নাচ থেকে শুরু করে রণপা সহ নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে চলেছে উদযাপন। তখনও বর্তমান ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ ছিল না, করোনা বিধি মেনে যেহেতু অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। ২০২২-এ ছোটো করে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ২০২৩-এর ২১ ফেব্রুয়ারি, আমরা একটা বড়ো আর্ট-ওয়ার্কশপ করি। তাতে আঁকা, ভাস্কর্য, মডেল তৈরি ইত্যাদির সেখানো  হয়। এর পর উত্তরপাড়া গণভবনে নাটক, গান, সেতার বাদন ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।  সেখানে শক্তিনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। আগামীদিনে ভারতীয় ডাক বিভাগের সহযোগিতায় বিশেষ কিছু করতে চলেছি আমরা। উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে স্ট্যাম্প প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে একটা স্মরণিকা প্রকাশ হবে। পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর একাডেমি সারা রাজ্যের ১২টা স্কুলকে বেছে একটা নাটকের প্রতিযোগিতা করছে মধুসূদন মঞ্চে, সেখানে আমাদের স্কুলও আমন্ত্রিত। ২৩ সেপ্টেম্বর এই নাটক আমরা মঞ্চস্থ করব।” বলেন সৌগতবাবু।

    স্কুলের বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ১২৫০ জন। সরকারি স্কুলে যেমন ভালো পরীক্ষার ফল হয় তেমনই হচ্ছে এই স্কুলে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ সালে রাজ্যের মধ্যে স্থান পেয়েছে। তার পরেও উচ্চমাধ্যমিকে  রাজ্যের মধ্যে আমাদের স্কুল ভালো ফল করেছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে যে ঘাটতি হয়েছে সেটা এখনও মেটাতে পারা যায়নি, সারা পৃথিবীর মতো এখানেও সেই একই অবস্থা। স্কুলে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৫১। কিন্তু প্রচুর পদ ফাঁকা। বর্তমানে ৩১ জন শিক্ষক রয়েছে স্কুলে। স্কুলে সিসি টিভি-র নজরদারি রয়েছে।

    এই স্কুলে ২৬ জানুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। সরস্বতী পুজো খুব জাকজমকপূর্ণ ভাবে হয়। ছাত্রী-শিক্ষকরা মিলে প্রতিমা তৈরি করে। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেটা তা হল, এটিই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম স্কুল, যেখানে প্রতি বছর ৬ বা ৯ অগাস্ট যুদ্ধবিরতি দিবস উদযাপিত হয়। এটা ২০০৪ সাল থেকে হয়ে আসছে, রাজ্যের কোনও স্কুলে এই দিনটি এতো গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয় কিনা জানা নেই, বলছিলেন সৌগত বসু।

    এখন মাতৃভাষা দিবস নিয়ে অনেক স্কুল অনুষ্ঠান করে। আমাদের স্কুলে ২০০৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই দিনটি আমরা আলাদা গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছি। এ ছাড়া বৃক্ষরোপন অনুষ্ঠান এই স্কুলের আর একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, যাতে স্কুলের সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে। স্কুলে এখন আর বড়ো গাছ লাগানোর কোনও জায়গা নেই। ফুটবল টুর্নামেন্ট ইন্টার ক্লাস, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ইন্টার ক্লাস হয়। স্থানীয় স্কুল-কলেজের সঙ্গে ফুটবল, ক্রিকেট ম্যাচে শিক্ষক ও ছাত্ররা অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষক দিবস খুব গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপন হয়। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ফেয়ারওয়েল দেওয়া, নতুন ছাত্রদের জন্য নবীনবরণ অনুষ্ঠান হয়। এসবই চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তা ছাড়া সব অনুষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকদের একত্রে খাওয়া দাওয়া স্কুলের একটা রীতি। প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এই ধারা বজায় রেখে স্কুলটি  এগিয়ে চলেছে।         

    তথ্য সূত্র : সৌগত বসু, শিক্ষক, উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়

    ছবি: সংগৃহীত

    *কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @