ভেসে যায় আদরের ‘ট্রাম’, তোমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়…

ইন্টারভিউ-মৃণাল সেন
ভেসে যায় আদরের ‘ট্রাম’
তোমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়…
কাঞ্চন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (ঋত্বিক ঘটক) কলকাতায় আসে, ১৯৫৮-র কলকাতা। স্বাধীন ভারতে কলকাতার বুকে ট্রাম লাইনের উল্কি। তার কিছুটা এসপ্ল্যানেড কার্জন পার্কের মোড়ে পরশপাথরের আপিস কেরানি তুলসী চক্রবর্তী রাস্তা পেরোন; ট্রামের লাইন, চলমান যানবাহন পেরোন। বৃষ্টির মাঝে কার্জনপার্কে আশ্রয় নেন। সত্যজিৎ রায় কলকাতা চেনাতে ডালহৌসি স্কোয়ারের বিকেল পাঁচটার দফতর ফেরতা ক্লান্ত নানান ধরনের চাকুরেদের ঘরমুখি যাত্রায় উঁচু থেকে যে পথ দেখান, চলন্ত বাসের ফাঁকে চকিতে ট্রাম লাইন আর একটি ট্রামের চলে যাওয়া চিত্রিত করে রাখেন। এ কলকাতাও ১৯৫৮-র। ঘোড়ায় ট্রাম থেকে ডিসি কারেন্টে চালিত আকাশছোঁয়া বিদ্যুৎ সংযোগ তার। প্যান্টোগ্রাফের টিকি ধরে চাকা চলে লোহার পাতের ট্রাম লাইনের দাগ। ঔপনিবেশিক শহরের স্মৃতি? বাড়ি থেকে পালানো কাঞ্চনের কলকাতা দর্শন। পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুকীর্ণ কলকাতায় তাদের চিনতে থাকা কলকাতার সার লোকসংগীতে। “আমি অনেক ঘুরিয়া আসিলাম রে কইলকাতা, ইঁট কাঠ ভরা এই তো কইলকাতা, বাস চলে ট্রাম চলে…”। বিষাক্ত নগরের চারপাশ চিনছে কাঞ্চন। কাঞ্চনও তো উদ্বাস্তু, ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে নগরের আনাচে কানাচে। যেখানে চা কেবিনের আড্ডায় ঋত্বিকের চেনানো আড্ডাবাজরা বলেন আগের কলকাতা অনেক আকর্ষণীয় রোমাঞ্চকর ছিল। শেষ পর্যন্ত কাঞ্চন বাড়ি ফিরে যাবে ট্রামে চড়ে, ঐ একবারই তার ট্রামে চড়া জানালার পাশের সিটে। জানালার বাইরে ফিরে যাচ্ছে ছেড়ে যাওয়া কলকাতার দৃশ্য।
বাড়ি থেকে পালিয়ে-ঋত্বিক ঘটক
২০২১-এ ‘মানিকবাবুর মেঘ’ (অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়)-এর মানিকবাবু নৈশব্দের নীরবতার মানিকবাবু লম্বা পথ হেঁটে মানিকতলার কাছে ট্রামের শেষ সিটে বসে পড়েন। ফাঁকা ট্রাম। ব্যস্ত শহরে ধীর গতির ট্রাম। একার কলকাতায় গতিভরা জীবন দেখেন। আকাশে ট্যাঙ্গি লজেন্সের হোর্ডিংয়ে ‘ফ্লেভার এয়সা বচপন জ্যায়সা’ পড়তে পড়তে পকেট থেকে বের করে নেন চকোলেট, মোড়ক খুলে ঠোঁটের সীমা পার করিয়ে জিভ দিয়ে চাঁটেন। হেঁটে চলা পথিকের কিছুটা সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে মন্থর যন্ত্রচালিত টিকিওয়ালা ট্রাম। সেই খিদিরপুর থেকে বালিগঞ্জ, শ্যামবাজার থেকে বেনেপুকুর হয়ে পার্ক সার্কাস আঁকিবুঁকি ভরা পথচেরা পথ ধরে কলকাতা চেনা।
ট্রামের পেন্টোগ্রাফ বৈদ্যুতিক সংযোজক তারের মাকড়সার জালে ঘষা খেতে খেতে ‘মহানগর’ (১৯৬৩, সত্যজিৎ রায়)-এর টাইটেল কার্ড দু-মিনিট চব্বিশ সেকেন্ড। এক লপ্তে তিনশো প্রায় নগরে এশিয়ার প্রাচীনতম ট্রাম পরিবহন ব্যবস্থা চিত্রে মহানাগরিক জীবনের আভাস দিচ্ছেন।
মানিকবাবুর মেঘ-অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়
ট্রামের পেন্টোগ্রাফ বৈদ্যুতিক সংযোজক তারের মাকড়সার জালে ঘষা খেতে খেতে ‘মহানগর’ (১৯৬৩, সত্যজিৎ রায়)-এর টাইটেল কার্ড দু-মিনিট চব্বিশ সেকেন্ড। এক লপ্তে তিনশো প্রায় নগরে এশিয়ার প্রাচীনতম ট্রাম পরিবহন ব্যবস্থা চিত্রে মহানাগরিক জীবনের আভাস দিচ্ছেন। এখানেও কাহিনির মোচড়ে বেকার হয়ে পড়া অনিল চ্যাটার্জি ট্রামে চড়েন কর্মসংস্থান প্রত্যাশী নগর যাত্রায়।
ট্রামের পেছনের দুটো সিট বড়ো প্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। বা ধূসর আলোর পাঁশুটে পরিসর। ২০১৯-এ ‘আমি ও মনোহর’ (অমিতাভ চ্যাটার্জি) নামক সাররিয়ালিস্টিক ছবিতে কলকাতার পথে হাঁটতে থাকা দুজন অসমবয়সী পরিচিত – এক তরুণী আরেক প্রৌঢ়। শীতের সন্ধ্যায় অফিস ফেরত সম্ভাব্য বাস্তবের উপাখ্যানের কথোপকথন। হাঁটাপথ ছাড়িয়ে ট্রামে উঠে পড়েন একদিন। তাঁদের দুজনেই আবার শেষ দুটো সিট অধিকার করেন। নগরের বুক চিরে এই ট্রাম গন্তব্যে নিয়ে যায় তীব্র গতিতে। ট্রাম লাইন ধরে এগোনোর সময় লাইনের জোড়ে একটা ঝাঁকুনি হয়। যাত্রীরা খানিকটা নড়ে বসেন। ট্রাম যাত্রী দুই পরিচিতের সংলাপের ফাঁকে তা পরিচালক মোক্ষম ভাবে ব্যবহার করেছেন। পথের চারপাশের কলকাতা, দোকান পাট, ইস্কুলের পরিচিতি, দেওয়াল ভরা রাজনৈতিক গ্রাফিতির দৃশ্য চিনছি সেখান থেকে। ট্রাম যেন তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কলকাতার কলতান বাস্তব পরাবাস্তবের সমান্তরাল অভিব্যক্তি। তরুণী নির্ধারিত দৈনন্দিন সময়ে অপেক্ষা করে করে প্রৌঢ়র দেখা পান না। আবার হেঁটে ফিরে শিয়ালদা থেকে ফাঁকা ট্রেনে জানালার পাশের সিটে একক। শহরতলীতে ফিরছেন শহর ছেড়ে। একটা নিঃসঙ্গ সময়! আচমকা নিরুদ্দেশ পুরুষটির জন্য চিন্তা! ঐ ট্রামযাত্রার সুযোগে দুজনের কাল্পনিক জীবন যেন ট্রামেই পরিসর পেয়ে এসেছে। ‘মহানগর’ ছবিতে যেমন কলকাতা যেন পরিচিত হয় প্যান্টোগ্রাফ আর বিদ্যুৎ সংযোগের আকাশছোঁয়া তারে, মাকড়সার জালে।
কালপুরুষ-বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ‘কালপুরুষ’ (২০০৫) ছবির ক্রেডিট টাইটেলে কলকাতার আঁধারি আকাশে সেই ট্রাম-তারের আঁকিবুকি দিয়ে শুধুই সেই তারায় তারায় মানুষী কল্পনায় কালপুরুষ আভাস নির্মাণ করেছেন। সেইখানে ট্রামে বাবা ও তাঁর অফিস ফেরতা এক তরুণ। দূরের চেয়ার থেকে প্রায় শেষ রাতের ট্রামে সওয়ারি। কৈশোরে ছেড়ে যাওয়া এখন বিবাহিত প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে অনুসরণ করে। এখানেই আবার প্রমোশন বঞ্চিত নায়ক, বাড়ি ফেরেন ট্রামে। সেখানে তাঁর আশপাশে ফাঁকা ফাঁকা চেয়ারে দিনজীর্ণ, ক্লান্ত ঘর ফেরা প্যাসেঞ্জার পরিবৃত। ট্রামের কন্ডাক্টরের ট্রাম থামান টিংটিং শব্দে আর ড্রাইভার এগিয়ে চলেন টিপিক্যাল ট্যাং ট্যাং ট্যাং যাত্রাপথ খালি করানোর শব্দে।
আবার চারপাশে ভিড়ে ভরা অসংখ্য যাত্রীর মাঝে ‘ইন্টারভিউ’ (মৃণাল সেন)-এর রঞ্জিত মল্লিক পরিচালকের নির্দেশ মতো যা মুখে আসে তাই-ই তাঁর সংলাপ। ক্যামেরাম্যান কে কে মহাজন তাঁকে ফলো করেন। রঞ্জিত মল্লিক অভিনেতা নন, তিনি নিছক একজন সাধারণ যুবক, পরিচালকের নির্দেশ পালন করে চলেন। এই একই মৃণাল সেন ‘চালচিত্র’ ছবিতে কীভাবে বলেছিলেন ঐ একটা ট্রাম আসছে যাও উঠে পড়ো, যাও দেরি করো না! যাও! এই হতচকিত অভিনেতা অঞ্জন দত্ত ২০১৯-র ১৭ জানুয়ারি সদ্য প্রয়াত মৃণাল সেনের স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন ম্যাক্সমুলার ভবনে। অঞ্জন রঞ্জন হয়ে সে ট্রাম দৃশ্যের শ্যুটিং পর্ব তাঁর ‘চালচিত্র এখন’ ছবিতে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন। “যাও যাও উঠে পড়ো! বুঝেছো? ঢুকে ডান দিকের দ্বিতীয় সিটের ডান সিট। হ্যাঁ রাইট…। কন্ডাকটর এলে টিকিট কাটো। টিকিটটা মুখে দাও। গিলে ফ্যালো।” অভিনেতা রঞ্জন টিকিট গিলে ফেলে। পরিচালক কুনাল সেন বলেন, “কাট! এক্সসিলেন্ট! দারুণ হয়েছে!” সেখানেও মাধবন নামের কে কে মহাজন ট্রামের ভেতরে তাঁকে ক্যামেরা কাঁধে ফ্রেম বন্দি করে চলেছেন। ১৯৮১-র ‘চালচিত্র’ ২০২৩-এ যখন ‘চালচিত্র এখন’ হয়ে ওঠে, কলকাতার আধা মধ্যবিত্ত নাগরিক যাপন আর ট্রাম-জীবনের ছবি আমরা নতুন করে আবিষ্কার করতে পারি। ক্রেডিট টাইটেলে অপরিহার্য সেই ট্যাং ট্যাং ট্যাং ধ্বনি স্পষ্ট করে চিনিয়ে দেয় মহানগরকে।
মহানগর-সত্যজিৎ রায়
আবার সেই মহানগর ট্রাম! ‘অপুর সংসার’-এর অপু কর্মপ্রার্থী। শহর ঘুরছেন কাজের খোঁজে। ট্রামের পেছনের দিকে জানালার পাশে নিপাট হতাশার মাঝে ‘সাহিত্যিক’ পত্রিকায় তাঁর রচনা নির্বাচিত হয়েছে। সে খবরের চিঠি পড়ে যুবক জীবনের কিছুটা খুশিতে ফেরেন। উল্টো ধারের লাইন ধরে আরেকটি ট্রাম চলে যায়। নগরের চলাচল। ট্রাম আর কলকাতার সাহিত্য চর্চার ছবি এভাবেই জুড়ে যায়। কয়েক মাস বা বছর খানেক পরে গর্ভবতী স্ত্রীর বাপের বাড়ি বাসের বিরহ কাতর অপু ট্রামের যাত্রী ভিড়ের ফাঁকে পাছে সহযাত্রীর নজর পড়ে, সে সংকোচ নিয়েই স্ত্রী অপর্ণার চিঠি আরেকবার পড়ে নিতে নিতে খেয়াল করেন প্রবীন সহযাত্রী মানুষটি উঁকি মেরেছেন, ঠিক যেমনটি এখন যে কোনও বাস বা ট্রেন যাত্রায় আপনার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে টানটান চোখ রাখেন। ‘ইন্টারভিউ’-এর রঞ্জিত মল্লিককে তরুণী যাত্রীর হাতের চলচ্চিত্র বিনোদন পত্রিকায় পাতায় বেরোনো নবাগত অভিনেতার ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নেন জানালার দিকে পিঠ করে বসা মাঝবয়সী পুরুষ অতি সজাগ পর্যবেক্ষণে। ঠিক তখনই রঞ্জিত মল্লিক ক্যামেরার দিকে স্বীকারোক্তি উচ্চারণ করে ফেলেন। তাঁর চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ফেলার অকল্পনীয় পরিস্থিতি।
‘অ্যাবি সেন’ – ২০১৫ সালে নির্মিত অতনু ঘোষের ছবি। সায়েন্স ফিকশন। বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিকের এক্সপেরিমেন্ট। টাইম ট্র্যাভেলের ক্যাপসুল খেয়ে সদ্য বরখাস্ত হওয়া কলকাতার বাসিন্দা টিভি প্রোডিউসার অ্যাবি সেন ২০১৩ থেকে একলাফে চলে যাচ্ছেন ১৯৮০ সালে। সে কলকাতা চেনাতে আমরা পাই অপরিহার্য ট্রাম। প্রাইভেট বাসে ঝুলন্ত যাত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে অ্যাবি ছুটে গিয়ে ট্রামে চড়ে পড়ে। ধীর গতির ট্রাম। টিকি বেঁধে চলে। লাইনে বাঁধা তার জার্নি।
২০১৮-য় বিতর্কিত ভাওয়াল রাজার কেস নিয়ে ছবি করলেন সৃজিত মুখার্জি, ‘এক যে ছিল রাজা’। ১৯০৯-এ ‘মরে যাওয়া’ রাজা ১৯৩৩-এ ফিরে এলেন সন্ন্যাসী হয়ে। চিটিংবাজ জালিয়াত নাকি সত্যি সত্যি সেই হারিয়ে যাওয়া রাজা! এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ছবি ওই একই বিষয়ে, ‘সন্ন্যাসী রাজা’। বিচারকের দরবারে বাদী-বিবাদীর সওয়াল জবাব। এরই ফাঁকে একটি দৃশ্য আনেন সৃজিত। ফিরে আসা মানুষটি সত্যি সত্যি রাজা – এ যুক্তিতে অনড় অবিচল উকিল অঞ্জন দত্ত তাঁর বান্ধবী অপর্ণা সেনের মুখোমুখি হচ্ছেন হলদেটে সিপিয়া রঙের ট্রামেন অন্তঃপুরে। যুক্তির তীব্রতায় উত্তেজিত অঞ্জন দত্ত দাঁড়িয়ে আর অপর্ণা সেন বসে। ভারি সুন্দর এবং নাটকীয় ফ্রেম। ১৯৩৩-এর কলকাতা আঁকলেন, সহজে ওই এক দৃশ্যে। সিনেমায় সিনেমায় এমনি ভাবেই কলকাতা বাঁধা হয়ে আছে। বাংলায়।
অদ্য শেষ রজনী-ব্রাত্য বসু
‘নাটক সমাজের দর্পণ’ – এ চাওয়া ঐতিহাসিক। অথচ বাংলা নাট্যচর্চায় তেমন প্রকাশ পাওয়া যায় না। উৎপল দত্তের ‘দু:স্বপ্নের নগরী’ সম্ভাবনা থাকলেও তা হয়নি। তবে ব্রাত্য বসু তাঁর ‘অদ্য শেষ রজনী’ নাটকে মঞ্চে আস্ত একটা ট্রাম তুলে ফেলেছিলেন। সাবেক আপার সার্কুলার রোড এখন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডের রাজাবাজারের কিছুটা পরে প্রতাপ মঞ্চ। সামনে দিয়ে চলে গেছে কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ট্রাম লাইন। নিত্যযাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ যান সে সময়ে। সেখানে ৭০-এর দশকে রমরম করে চলা অসীম চক্রবর্তী লিখিত পরিচালিত অভিনীত বারবধূর নির্মাণ ইতিহাস বিবৃত করেছেন। ট্রামের কামরা, কন্ডাকটরের গেট, ড্রাইভারের কেবিন আলোক সম্পাত আর নিপুণ ধ্বনি সংযোজনায় দর্শকদের মোহিত করেছেন। ট্রাম যেন ঘরের ভেতর জানালা হয়ে উঠেছিল। অতুলনীয় ব্রাত্য বসুর গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা।
পাশাপাশি তরুণ থিয়েটার কর্মী জিতাদিত্য চক্রবর্তী কয়েকবছর ধরে চলন্ত ট্রামেই নাটক করতেন। ‘উড়ো চিঠি’। নাটক শুরু হত টালিগঞ্জের ট্রাম ডিপো থেকে। দর্শক আসতেন, ট্রামে বসতেন, চা খেতেন। ট্রাম চলতে শুরু করত। টালিগঞ্জ মেট্রোর সামনে একবার থামত। এভাবে নানান স্টপেজে উঠতেন চরিত্ররা। নাটক শেষে ট্রাম ফিরে যেত টালিগঞ্জে। ট্রামটাও যেন এই নাটকের একটা চরিত্র। ‘সার্কল অফ লাইফ’ বা জীবনচক্র বোঝানোর জন্যই ট্রাম বেছে নেওয়া।
কাঞ্চনের বয়সী একটি গরিব পরিবার থেকে কখনও অত্যন্ত ধনী মাসির বাড়ি বেড়াতে যেতো কালী টেম্পল রোডের বাড়িতে। ভোর হতো একটু দূরের কালীঘাট ট্রাম ডিপো থেকে ট্যাং ট্যাং শব্দে। জানালায় বসে ভিস্তিওয়ালার পথঘাট ধুয়ে ফেলা দেখতো। সদ্য তরুণ প্রেম করার জন্য বেছে নিয়েছিল বালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে ২৫ নম্বর ট্রাম। গোধূলির আলোয় প্রেমিকার মুখ, ময়দান, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, রেস কোর্স যে মোহময় মায়াঘোর লাগাতো সে বড়ো দুর্লভ! ২৭ নম্বর ট্রামে ফিরিঙ্গি পাড়া ছাড়িয়ে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড ধরে ধর্মতলায় যাতায়াত – একটা কলকাতার পেটে আরেকটা কলকাতা। ট্রাম টিকে থাকবেই। রাস্তায়। স্মৃতিতে। হেরিটেজ যাত্রায়। মন্থর গতির পরিবেশ বান্ধব ট্রাম। স্বল্প আলোয় ছাদের জাল ঘেরা পাখায় ভেতর বাহির অন্তরময়।
_______
বাংলা চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে ট্রামের ব্যবহার