কলকাতায় প্রথমবার জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

এই পৃথিবী ক্রমেই তপ্ত হচ্ছে। যার পোশাকি নাম গ্লোবাল ওয়ার্মিং। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী এই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে না। বরং সারা বিশ্ব এর ফল ভুগছে। বিশেষত গত ২০ বছরে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গিয়েছে।
এবারের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানা কর্মসূচি দেখা গিয়েছে বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি স্তরে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ৩ থেকে ৫ জুন একগুচ্ছ তথ্যচিত্র দেখানো হল নজরুলতীর্থে। পোশাকি নাম – আরবান ক্লাইমেট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (Urban Climate Film Festival 2023)। প্রথম এ ধরনের চলচ্চিত্র উৎসবের আসর বসল কলকাতায়। উদ্যোগ ভারত সরকারের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ আরবান অ্যাফেয়ার্স (NIUA)-এর। সহযোগিতায় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রক, ফ্রেঞ্চ ডেভলপমেন্ট এজেন্সি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তিন দিনে ১২টি দেশের ১৬টি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, ইরান, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আইসল্যান্ড, পোল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিলের তথ্যচিত্র ঠাঁই পায় উৎসবে। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজি, পার্সি, ইতালীয়, ফরাসি, ডাচ, ড্যানিশ, সোয়াহিলি ভাষার সংলাপ ছুঁয়ে যায় কলকাতাকে।
আগেই রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে বিপদবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে ২০২৩ থেকে ২০২৭ সাল, এই পাঁচ বছর পৃথিবীর বুকে উষ্ণতম সময়কাল হতে চলেছে। আগামী দিনে তাপমাত্রার দাপট আরও বাড়বে। এরকম পরিস্থিতিতে নগর সভ্যতার আগ্রাসন কীভাবে চ্যালেঞ্জ করছে প্রকৃতি-পরিবেশকে, সেই বার্তা মাথায় রেখে উৎসবের জন্য ছবি নির্বাচন করেছে নয়াদিল্লির সিএমএস বাতাবরণ।
বাস্তবিকই জলবায়ু পরিবর্তন উপমহাদেশে অনেক সমস্যা তৈরি করেছে। তাই মৎস্যজীবীদের সমস্যা, সুন্দরবনের বিপদ, কাশ্মীরের সংকট নিয়ে ভারতীয় ছবি তৈরি হয়েছে। এই তথ্যচিত্রগুলি এ দেশের পরিবেশপ্রেমীরা আগেও দেখেছেন। উন্নত ইউরোপ ও আমেরিকার পরিবেশে বিপদঘণ্টি তারা শুনতে পেলেন শহরে বসে। ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকার ‘রেইন ফরেস্ট’ কীভাবে সংকটের মুখে পড়েছে, তার প্রত্যক্ষ ছবি ধরা পড়ল ‘আমাজনিয়া আন্ডারকভার’ তথ্যচিত্রে। কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ছাত্র অভিষেক মাহিলের ছবি ‘বড়শি- দি ফিশ হুক’ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কলকাতার জলাভূমি এবং মৎস্যজীবীদের সমস্যার সঙ্গে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি বিষয় নিয়ে এই তথ্যচিত্র তৈরি। মাছে ভাতে বাঙালির ঘরের বিষয় বলে এই তথ্যচিত্রটি দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র তথ্যচিত্র ‘এডুকেশন অন দ্য বোট’ কৌতুহলী করেছে দর্শকদের। চলনবিলের ভাসমান পাঠশালা বিষয়ে এই ছবির নির্মাতা কেএম তাজবি-উল হাসান।
‘আরবান ক্লাইমেট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর সূচনা চলতি বছর নয়াদিল্লিতে। এরপর উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মুম্বইয়ে। কলকাতায় উৎসবের আয়োজন করা হয় পরিবেশবান্ধব স্মার্ট সিটি নিউটাউনে। এই উৎসবে তরুণরাই বড়ো সংখ্যায় ছিলেন দর্শকাসনে। বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা আন্তর্জাতিক পরিবেশ ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হলেন এই তিন দিন। কী বললেন তাঁরা? নব নালন্দা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র শ্রীনিবাস সরকার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা, জীবিকার সুরক্ষা কোনোটাই নেই। তাই সচেতন নাগরিক গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেটা জানতেই এই উৎসবে এসেছি।”
কলকাতার জলাভূমি এবং মৎস্যজীবীদের সমস্যার সঙ্গে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি বিষয় নিয়ে এই তথ্যচিত্র তৈরি। মাছে ভাতে বাঙালির ঘরের বিষয় বলে এই তথ্যচিত্রটি দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র তথ্যচিত্র ‘এডুকেশন অন দ্য বোট’ কৌতুহলী করেছে দর্শকদের। চলনবিলের ভাসমান পাঠশালা বিষয়ে এই ছবির নির্মাতা কেএম তাজবি-উল হাসান।
বাস্তবিকই, ২০২১ সালে ইউনিসেফের দেওয়ার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জনিত কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বসবাসকারী শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে যা তাদের শিক্ষা স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাকে হুমকির মধ্যে ফেলছে। তবে বেশি বয়সীদের তুলনায় তরুণরা বিশ্বাস করেন যে প্রতিটি প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব আরও ভালো বসবাসের জায়গা হয়ে উঠছে। কিন্তু এই আশাবাদ সত্ত্বেও তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁরা বয়স্কদের থেকে নিজেদের অনেক বেশি মাত্রায় বিশ্ব নাগরিক ভাবেন।
প্রসঙ্গত, সকলের কথা মাথায় রেখেই উৎসবের তিন দিন ধরেই ছিল আলোচনাসভা। আলাপচারিতাতেও উঠে আসে ক্রমবর্ধমান ইস্যুগুলি। বৃক্ষচ্ছেদন, জলস্তর বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু আইন-সহ নানা সমস্যা মোকাবিলার পথ খোঁজা হয়। পরিবেশকর্মী থেকে তথ্যচিত্র নির্মাতা কিংবা চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক, সাংবাদিক সকলের মত বিনিময়ে সমৃদ্ধ হয় মঞ্চ। পরিবেশবিদ ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী আলোচনা করেন, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে নগরের পরিকাঠামোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে।
উৎসবে উঠে আসে তথ্যচিত্রের ইতিবাচক প্রভাবের কথা। চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক ফারহা খাতুন ‘কোরাল উওম্যান’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, “সমুদ্রের নিচে প্রবালদ্বীপের সংকট কতটা গভীর, সেটা এই ছবি না দেখলে জানা যেত না। এই তথ্যচিত্র মুক্তি পাওয়ার পর ডুবুরিদের মাধ্যমে প্রবাল প্রতিস্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। চলচ্চিত্রের ক্ষমতা এতটাই।”