এই বাংলায় রয়েছে আস্ত একটা ‘ফুচকা’ গ্রাম!

খাবারের সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্ক নিবিড় ভালবাসার। পেটপুজো করতে বাঙালিরা যে ঠিক কতখানি ভালোবাসে, আজ সে কথা সারা পৃথিবী জানে। অন্যান্য খাবারের মতই বাংলার স্ট্রিটফুডের (Street Food) ইতিহাসও স্মৃতি আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। সমগ্র ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানান রকমের স্ট্রিটফুডের মধ্যে বাংলার অনবদ্য স্ট্রিটফুড নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে। তবে বাংলার স্ট্রিটফুডের সম্রাট বোধহয় একটি মাত্র খাদ্যকেই বলা যায়, আর তা হল ‘ফুচকা’ (Phuchka)। বাঙালির পছন্দের মুখরোচক খাদ্যের তালিকায় ফুচকাকে টক্কর দেওয়ার মত ক্ষমতা হয়তো খুব কম খাবারেরই আছে। টক ঝাল মুচমুচে ফুচকা মুখের ভিতর গিয়ে যেভাবে বিস্ফোরণ ঘটায়, অন্য কোনো খাবারে তার জুড়ি মেলা ভার।
প্রতিটা পাড়ায় একজন না একজন ফুচকাওয়ালা থাকে, পাড়ার বেশিরভাগ বাসিন্দাই যার একনিষ্ঠ খরিদ্দার। প্রত্যেক ক্রেতার পছন্দমতো লেবুর রস, লঙ্কা কুঁচি, ধনেপাতা কুঁচি আর গুঁড়ো মশলার মাত্রা বদলে বদলে ফুচকা পরিবেশন করেন সেই ফুচকাওয়ালা। উত্তর ভারতের ‘গোলগাপ্পা’, মুম্বাইয়ের ‘পানিপুরি’ কিংবা উত্তর প্রদেশের ‘পানি বাতাসা’ প্রকারে ফুচকার সমগোত্রীয় হলেও, বাঙালির কাছে ফুচকার সমতুল্য কিছু নেই। ফুচকার এই অসামান্য স্বাদের পিছনে অবশ্য সিংহভাগ কৃতিত্বই টক জলের। এই জল নোনতা হবে নাকি টক, তাতে তেঁতুল থাকবে না পুদিনা, সমস্তটাই ঠিক করেন ফুচকাওয়ালা। সুজির তৈরি মুচমুচে খোলসের ভিতর সিদ্ধ আলুর পুর সমেত তা যখন টক জলের হাঁড়িতে ডুব দিয়ে উঠে আসে, তখন তার সামনে দাঁড়িয়ে যে কোনো বাঙালিই চোখ বুজে বলে দিতে পারে যে এর থেকে সুস্বাদু ভূভারতে আর কিছু নেই।
প্রখ্যাত জার্নালিস্ট এবং সংবাদপত্রের খাদ্য-বিভাগীয় লেখক বীর সাঙ্ঘভী একবার লিখেছিলেন, “সত্যি বলতে, দিল্লির গোলগাপ্পার সঙ্গে মুম্বাইয়ের পানিপুরির অনেক তফাত। ছোটো থেকে মুম্বাইয়ের পানিপুরি খেয়েই বড়ো হয়েছি। তবে এ কথা মানতেই হয় যে, সারা দেশের মধ্যে ‘সেরা’ হল কলকাতার ফুচকা। এর স্বাদ যেন ঠিক কলকাতার পথঘাটের মতোই – প্রাণোচ্ছল।”
কিন্তু এটা কী জানেন, পশ্চিমবঙ্গে ফুচকার নামে উৎসর্গীকৃত একটা আস্ত গ্রাম আছে! উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁচরাপাড়ায় রয়েছে শহিদ কলোনি নামের এক অনাড়ম্বর ছোট্ট গ্রাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যার নাম বদলে হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ফুচকা গ্রাম’। এ গ্রামের ১০০টিরও বেশি পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে ফুচকা তৈরি করে। ফুচকা তৈরির জন্য, গম ভাঙানো আটা দিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। তারপর সেই মণ্ড দিয়ে বানানো হয় ফাঁপা গোলাকার ‘বল’-এর মতো ফুচকা। এই ‘বল’-এর ভিতর দেওয়া হয় আলু সিদ্ধ, মটর সিদ্ধ, মশালা মাখা পুর। পাতে তুলে দেওয়ার আগে সেটিকে চোবানো হয় গন্ধরাজ লেবু দেওয়া টক তেঁতুল জলে।
ফুচকাকে যে কতভাবে খাওয়ার যোগ্য করে তোলা যায়, তার শেষ নেই। কখনো তার উপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় মিষ্টি চাটনি। কখনো বা ‘চাট’-এর মত তার উপর দই আর ঝুরিভাজা ঢেলে দেওয়া হয়। পেটে যাওয়ার পরেও এর স্বাদের তীক্ষ্ণতা মুখে লেগে থাকে বহুক্ষণ। শহীদ কলোনির কিছু নতুনত্বপ্রেমী ফুচকাওয়ালা আবার সময় বিশেষে আলু সিদ্ধর বদলে ফুচকার ভিতরে পুর হিসেবে ব্যবহার করে ঘুগনি, ভুট্টা দানা, খাসির মাংস কিংবা চকোলেট!
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কাজ শুরু হয়ে যায় ফুচকা গ্রামে। গমের আটার সঙ্গে মেশানো হয় সুজি আর চাল গুঁড়ি। অল্প অল্প জল দিয়ে ধীরে ধীরে মাখা হয় এই মন্ড। মন্ডটি আঠালো চটচটে হয়ে গেলে, একটা ভিজে কাপড় দিয়ে বেশ খানিকক্ষণ তা ঢেকে রাখা হয়। অতিরিক্ত নরম বা শক্ত হলে চলে না এই মন্ড। এরপর বেলনি দিয়ে সমান করে বেলে, ‘কুকি কাটার’-এর সাহায্যে গোল গোল টুকরোতে কাটা হয়। এই টুকরোগুলোকে কেউ রোদে শুকোতে দেন, কেউ বা কয়লার তাপে সেঁকে নেন। আর তারপর গরম তেলে সেগুলো ভাজা হয়, যতক্ষণ না তা লুচির মতো ফুলে ওঠে আর তাতে সোনালি রঙ ধরে। ততক্ষণে ফুচকাওয়ালারা অভ্যস্ত শেফের মতো হাত লাগায় টক জল তৈরিতে। পাকা তেঁতুলের নির্যাস জলে গুলে, তাতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানান রকম মশলা আর গন্ধরাজ লেবুর রস। এরপর অন্যত্র সিদ্ধ আলুর সঙ্গে মাথা হয় মটর সেদ্ধ, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা, জিরে, শুকনো লঙ্কা, ধনে গুঁড়ো, নুন, পাতি লেবুর রস আর তেঁতুলের নির্যাস।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মত, আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে এই গ্রামে জীবিকা নির্বাহের জন্য ফুচকা তৈরি সবার প্রথম শুরু করেছিলেন বলাই গায়েন। ধীরে ধীরে, গ্রামের অন্যান্যরাও তাঁকে অনুসরন করা শুরু করে। আর এভাবেই কাঁচড়াপাড়ার শহীদ কলোনি হয়ে ওঠে ‘ফুচকা গ্রাম’। এখানের কুটিরশিল্প হয়ে ওঠা ফুচকা, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হয়। ফুচকাপ্রেমীরা প্রায়ই এই গ্রামে দেখতে আসে, ফুচকা কীভাবে তৈরি হয়। এখানকার ফুচকা ব্যবসায়ীরা সারা বছর ধরে কখনো মেলায়, কখনো বা অনুষ্ঠান বাড়িতে হাজির হয়ে যায় ফুচকার পসরা নিয়ে।
তবে, ফুচকা গ্রামের বাসিন্দারা দুঃখ করে বলে, এতদিনেও কোনোরকম সরকারী সাহায্য মেলেনি তাদের। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নানান মাইক্রো-ফাইনান্স কোম্পানি থেকে লোন নিয়ে সংসার চালাচ্ছে। এমনকি বাংলার বহু মানুষ এখনও অবধি ফুচকা গ্রামের নামটুকুই শোনেনি। ফুচকা গ্রামের বাসিন্দারা অবশ্য আশা রাখছে, অন্তত নিজেদের প্রিয় খাবারকে কাছ থেকে দেখতে ছুটে আসা মানুষেরা যদি খানিকটা হলেও এই ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে!
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।