No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    রাঢ়দেশ ও উদ্ধারণপুরের ঘাট

    রাঢ়দেশ ও উদ্ধারণপুরের ঘাট

    Story image

    রাঢ়বঙ্গের এই উত্তরপ্রান্তদেশীয় ঐতিহ্যময়ী স্নানের ঘাট বললেই একডাকে যে নাম আসবে, তা হল উদ্ধারণপুর ঘাট। সেই সুদূর বীরভূমের সিউড়িই হোক আর মুর্শিদাবাদের দক্ষিণাংশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষই হোক, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা উদ্ধারণপুর ঘাটই একমাত্র ভরসা। জানা গেছে, ফারাক্কা ব্যারেজ তৈরির আগে প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে গঙ্গা প্রায়শই শুকিয়ে যেত কিন্তু উদ্ধারণপুরের ঘাটের অংশে অল্প হলেও স্নানের জন্য জল থেকেই যেত। হয়তো উদ্ধারণপুর ঘাটের এই মাহাত্ম্যসংবলিত ধারায় অবগাহনের জন্যই কেঁদুলি থেকে প্রতিটি তিথির ভোরবেলাতে গীতগোবিন্দকখ্যাত কবি জয়দেব গোস্বামী পায়ে হেঁটে আসতেন। এই ঘাটের পাশের মহাশ্মশানে লেখক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের মায়ের মরদেহ দাহ করেছিলেন আর এই ঘাটে স্নান করাকে তিনি গর্বের চোখে দেখতেন। এই ঘাটে স্নানের জন্যই অতিদূর কাশীধাম থেকে পদব্রজে এসেছিলেন ত্রৈলঙ্গস্বামী মহারাজ। তাই শুধু বৈষ্ণব পীঠস্থান নয়, তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্র হিসাবেও উদ্ধারণপুর ঘাট আর মহাশ্মশান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

     

    বৈষ্ণব পীঠস্থান হিসাবে খ্যাতি পাওয়ায় মূল কারণ হল উদ্ধারণপুর নামের সাথে জড়িয়ে থাকা নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর দ্বাদশ গোপাল উদ্ধারণ দত্তের নাম। এই মতামত অনুসারে উদ্ধারণ দত্ত ছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর দ্বাদশ গোপালের অন্যতম গোপাল তথা একমাত্র শূদ্র গোপাল। এই তথ্য অনুযায়ী তিনি এসেছিলেন হুগলি জেলার সপ্তগ্রাম থেকে এবং উদ্ধারণপুরের উত্তরের গ্রাম নৈহাটির জমিদার নৈরাজার অধীনে দেওয়ানের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর পূর্বনাম ছিল দিবাকর দত্ত, দীক্ষার পর তাঁর নাম হয় উদ্ধারণ। এখানে একটি জনশ্রুতি প্রচারিত আছে যে তিনি সরাসরি চৈতন্যদেবের কাছে দীক্ষা নেন, তবে এই মতের ভিত্তি খুবই দুর্বল। চৈতন্যদেব রাঢ়দেশ ভ্রমণ করে কেতুগ্রাম থেকে ঈশানী নদী বেয়ে উদ্ধারণপুর এসেছিলেন শান্তিপুর যাত্রার উদ্দেশ্যে কিন্তু উদ্ধারণপুরে তখন উদ্ধারণ দত্তের সাথে দেখা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে জোরালো তথ্য নেই, কিন্তু নিত্যানন্দের সাথে উদ্ধারণ দত্তের সাক্ষাতের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় বৃন্দাবন দাস রচিত চৈতন্যভাগবতে - 'নিত্যানন্দ স্বরূপের সেবা অধিকার।/পাইলেন উদ্ধারণ কিবা ভাগ্য তার।।' অন্যদিকে তাঁর কথা পাওয়া যায় চৈতন্যচরিতামৃতের কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজের পদে - 'মহাভাগবতের শ্রেষ্ঠ দত্ত উদ্ধারণ।/সর্বভাবে সেবে নিত্যানন্দ চরণ।।' কিন্তু গোল বাঁধে বৈষ্ণব গবেষকদের তোলা প্রশ্ন নিয়ে, কেউ কেউ বলেন সপ্তগ্রামের উদ্ধারণ দত্ত আর উদ্ধারণপুরের উদ্ধারণ একই ব্যক্তি নন, দুজনে আলাদা ব্যক্তি, কারণ এই যুক্তির সপক্ষে তাঁরা বলেছেন যে বেশিরভাগ তথ্যই নেওয়া হয়ে জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে।

    এ তো গেল উদ্ধারণপুর নাম নিয়ে উদ্ধারণ দত্তের কথা, অন্য মতামত অনুসারে উদ্ধারণপুর নামটির পুরানো নাম ওধনপুর, যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় কবি কঙ্কণের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে - 'সম্মুখে উধনপুর, নৈহাটি কতদূর, শাঁখারি ঘাট দিল দরশন।' এই প্রসঙ্গে অনেকে বলছেন ওধন হল উদধান শব্দের ভগ্নরূপ, যার অর্থ হল চুল্লি, উদ্ধারণপুর ঘাট লাগোয়া প্রাচীন মহাশ্মশান তার প্রমাণ। তবে বনওয়াদিবাদ রাজ এস্টেট অনুযায়ী, এই উদ্ধারণপুরের নাম কখনও রাধাকৃষ্ণপুরও ছিল। তবে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো স্বনামধন্য ঐতিহাসিকরা উদ্ধারণপুরের নামের পেছনে উদ্ধারণ দত্তের নাম উৎসতথ্যটি মেনে নিয়েছেন, কারণ কাটোয়া মহকুমার তথা কেতুগ্রাম থানা হল বৈষ্ণবভাবে সিক্ত অঞ্চল, তাই উদ্ধারণপুর নামটি অমন হতেই পারে।

    তবে তথ্য যাই বলুক, তাতে উদ্ধারণপুরের ঘাটের মহিমা একটুও নষ্ট হয় না কারণ শাক্ত ও বৈষ্ণব বিভিন্ন সাধকের দ্বারা এই ঘাটের নাম সুদূর কাশী, বৃন্দাবনেও প্রচারিত। বছরের শুরুর বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে শুরু করে বছরের শেষে শিবের গাজন উৎসব পর্যন্ত গঙ্গাস্নানের ভিড় লেগেই থাকে, বিশেষত বীরভূমের মানুষের মধ্যে উদ্ধারণপুর ঘাট নিয়ে উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ১ মাঘের শাহী স্নানের দিন ভোর থেকেই আবালবৃদ্ধবনিতাগণ পায়ে হেঁটে উদ্ধারণপুরে যান স্নানের জন্য, তাদের সাথে আসে বিভিন্ন হরিনাম সংকীর্তনের দল, তাঁরা নাম গান করতে করতে গঙ্গাটিকুরি পার হয়ে উদ্ধারণপুর পৌঁছান। বিভিন্ন গ্রাম থেকে অসংখ্য দল পৌষসংক্রান্তির দিন থেকে আখড়া তৈরি করেন ১লা মাঘের দিন উদ্ধারণপুরে মোচ্ছবের মাধ্যমে নর-নারায়ণ সেবার জন্য এবং এই উপলক্ষে বিরাট মেলাও বসে উদ্ধারণপুরে। আগে যারা এই পদব্রজ যাত্রায় অংশ নিতে পারতেন না, তাঁরা বলদ বা মোষের গাড়িতে চেপে উদ্ধারণপুর যেতেন। সে রেওয়াজ আজও আছে, তবে তা কমে এসেছে, তার বদলে এসেছে টোটো, মারুতি ভ্যান। এর সাথেই শিবের গাজন উপলক্ষে জল-সন্ন্যাসের দিন বিরাট সমাগম হয় মানুষ ও শিবের গাজনে যুক্ত থাকা হাজার সন্ন্যাসীদের। সুদূর বীরভূম থেকে তাঁরা ভোরবেলা থেকেই সেদিন শিবের দোল কাঁধে করে শিবকে গঙ্গায় স্নান করতে নিয়ে আসেন।

    তবে সব তথ্যকেও ছাপিয়ে যায় গঙ্গাটিকুরি তথা কেতুগ্রাম অঞ্চলের মানুষের তৈরি উদ্ধারণপুরের স্নানবাড়ির ধারণা। বনয়ারিবাদ রাজবাড়ির স্নানবাড়ি ছিল উদ্ধারণপুরে, রাজা পরিবারের সদস্যদের স্নানের জন্য বানানো হয় এই বাড়িটি, পরে তা ভেঙে গেলেও আজও পয়লা মাঘের মেলা উপলক্ষে রাজবাড়ি থেকে বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় বেশ জাঁকজমকভাবে এবং তা এক সপ্তাহ থাকে এখানে। এই প্রসঙ্গে একটি তথ্য উল্লেখ্যযোগ্য যে ব্রাহ্মণ কায়স্থ সম্প্রদায় বাদ দিয়ে সদগোপদের একমাত্র স্নানবাড়ি ছিল গঙ্গাটিকুরির রাধাবল্লভ মন্ডলের, তিনি আমাদের পূর্বপপুরুষ, এই বাড়িতেই আমাদের পূর্বজরা গঙ্গাস্নান উপলক্ষে গিয়ে সারাদিন থাকতেন এবং চড়ুইভাতি করতেন বাড়ির সকল সদস্যদের নিয়ে কিন্তু মাত্র কুড়ি বছর আগেই এই বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং তার সাথে সাথেই আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্নানযাত্রার স্মৃতিফলকের শেষ চিহ্নটুকু হারিয়ে যায়, আজ সেখানে গড়ে উঠেছে নতুন বসতবাড়ি, ওষুধের দোকান। তবুও কল্লোলিনী গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন আর তার সাথে বয়ে উদ্ধারণপুর ঘাটের লুকিয়ে থাকা যাওয়া হাজার বছরের স্মৃতির টুকরোগুলো।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @