“আমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে আমার রোম্যান্টিসিজম”

‘ঝিন্দের বন্দি’-র জন্য উত্তমকুমারকে ঘোড়ায় চড়া শিখতে বলেছিলেন তপন সিংহ। উত্তম শুনেই বললেন, ‘জানতাম, জানো। অনেক দিন চড়ি না, এই যা। প্র্যাকটিস করতে হবে।’’ সেই প্র্যাকটিস শুরু হল। নিয়ম করে ভোর পাঁচটায় উঠে ময়দানে ঘোড়া চড়তেন উত্তমকুমার। শ্যুটিং-এর সময় তাঁকে দেখে তপন সিংহ-র মনে হয়েছিল, সামনের ঘোড়ায় চড়া মানুষটি নায়ক উত্তমকুমার নয়, নিশ্চয়ই পোড়খাওয়া কোনো এক ঘোড়-সওয়ার।
উত্তমকুমার এমনই। নিষ্ঠা, প্র্যাকটিসে তিনি প্রয়োজনে আপাদমস্তক বদলে নিতে পারেন নিজেকে। মহানায়কের পরিচিত খোলস ছেড়ে ঢুকে পড়তে পারেন যে-কোনো চরিত্রের ভিতর। সেই বদলে যাওয়া উত্তমকুমারকে দেখে বিস্ময় ছাড়া আর কিছুই পড়ে থাকে না তখন।
এই ‘ঝিন্দের বন্দি’ সিনেমার কথাই ধরুন। ছবির জন্য তরোয়াল খেলা শিখতে হবে। অলিম্পিক বিজয়ী ম্যাসি টেলর এলেন প্রশিক্ষণ দিতে। চেয়ারে বসে-বসেই তাঁর অসিচালনা দেখে হুবহু নকল করে ফেললেন উত্তমকুমার। চমকে গেলেন প্রশিক্ষক এবং পরিচালক দুজনেই। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, এই সিনেমার সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিলেন উস্তাদ আলী আকবর খান। একটি সুর তৈরি হল। রাগের সমাহার, মদ্যপানের ঘোরে এক রাগ থেকে অন্য রাগে চলে যাচ্ছেন গায়ক। গান রেকর্ড হল। গাইলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তমকুমার রেওয়াজের জন্য সেই রেকর্ডিং নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে। এরপর, শ্যুটিঙের দিন উত্তমকুমারের লিপ দেওয়া দেখে সবাই অবাক। রীতিমতো হোমওয়র্ক করে যে মানুষটি এসেছেন, তাঁকে পাকা ধ্রুপদী গায়ক বলবে না, কার সাধ্যি!
উত্তমকুমার বলতেই তৈরি হয় একটা ঘোর। একজন স্বপ্নের নায়ক। অতল দৃষ্টি, পুরু ঠোঁটে খেলে যাওয়া হাসি। রোমান্টিসিজম যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে চাহনি থেকে কণ্ঠ-- সবটা থেকে। তাঁকে একবার দেখতে চেয়ে আবেগে নিজের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলেন উন্মাদ ভক্ত, মহিলারা আকুল হন সামান্য স্পর্শের জন্য। আর এহেন মহানায়ক খ্যাতির চুড়োয় থেকেও নিজেকে প্রস্তুত করে যান আড়ালে। লিপ দেওয়ার সময় তাঁর সামান্য ফাঁকি বা ত্রুটিটুকু হয়তো খেয়ালই করবেন না ভক্তকুল। তবু, তিনি প্রস্তুতিতে খামতি দেন না। সেখানে যেন নিজের কাছেই তাঁর নিজের পরীক্ষা।
আসলে উত্তম খুব ভালোভাবে জানতেন ছবি বিশ্বাসের মতো সহজাত আভিজাত্য তাঁর নেই, নেই সৌমিত্রর মতো শিক্ষার অতীত। যে ‘নায়ক’ সিনেমার চিত্রনাট্য তাঁকে ভেবেই লিখেছিলেন সত্যজিৎ, যে সিনেমা দেখতে দেখতে আমরা অনেকেই আজো অজান্তে উত্তমের কাল্পনিক জীবনী এঁকে নিই মনে মনে, সেই ‘নায়ক’-এর অতীতও উত্তমের ছিল না। অভিনয়ের গুরুও নেই সেই অর্থে। বাবা মেট্রো সিনেমার চিফ অপারেটর। অভিনয় উত্তমের নেশা। গানের গলা ভালো। কিন্তু এর বাইরে আর কিছুই তো নেই।
উত্তম জানতেন, তৈরি হতে হবে নিজে থেকেই, প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় বসতে হবে, ধারালো হতে হবে। একদিকে পাগল করে দেওয়া জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে নিজেকে নিয়ে রোজ এই ভাঙচুর—উত্তম এই ব্যালেন্সের খেলা খেলেছেন আজীবন। কখনো নিজের এই সীমাবদ্ধতা, অতীত তাঁকে আহত করেছে। আহত বাঘের মতো গর্জেও উঠেছেন ভিতরে ভিতরে। নিজেকে তাঁর মতো কেউ চিনত না। অধীর বাগচীকে বলেছিলেন, “আমি জানি কী করে মহানায়ক হয়েছি। ক্যামেরাটাকে গুলে খেয়েছি। অভিনয়টা করি আমার অভিজ্ঞতা থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, আর আমার উচ্চারণটা স্পষ্ট।” বলেছিলেন, “আমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে আমার এক্সপ্রেশন, আমার রোম্যান্টিসিজম।”
নিজেকে এই সম্পূর্ণ জানাটাই তাঁর সম্পদ। পর্দায় প্রেমের জন্ম দিতে হয় কীভাবে, তা গোটা বিশ্বকে শেখাতে পারেন উত্তম। আর দ্বিতীয় সম্পদ তাঁর প্রস্তুতি। ‘দুই পুরুষ’ ছবির মৃত্যুদৃশ্যর শ্যুটিং। অধীর বাগচীকেই ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর বাবা, প্রখ্যাত সুরকার অনিল বাগচী কীভাবে মারা গেছিলেন? বড়ো নিষ্ঠুর সেই প্রশ্ন। আলসার বার্স্ট করে অনিল বাগচীর চলে যাওয়ার শেষ মুহূর্তগুলির বর্ণনা দিলেন অধীর। তারপর, শ্যুটিঙে অবিকল সেই মৃত্যুদৃশ্যকেই যেন ফুটিয়ে তুললেন উত্তমকুমার।
আজ, এতদিন পরেও টিভিতে মানুষটাকে দেখলে মুগ্ধতা চুপিচুপি জড়িয়ে নেয় অজান্তেই। সবটাই কি বাজারের তৈরি করে দেওয়া নিয়ম মেনে মুগ্ধতা? চলচ্চিত্র গবেষকদের অনেকেই বলেন, ‘উত্তমের মৃত্যুতে বাংলা সিনেমার সব শেষ হয়ে গেল’—এই ধারণা আসলে খুব ভেবেচিন্তে বুনে দেওয়া হয়েছিল একটা জাতির মনে। এর ফলে একটা শূন্যতার জন্ম হল। ‘উত্তম নেই, বাংলা সিনেমার আর কী থাকল’ গোছের। সেই শূন্যতার জমিতে চাষ করে দেওয়া সহজ হয়েছিল বলিউডি সিনেমার ফসল। একটা মানুষ মৃত্যুর পর যেন আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। অনেকটা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো। গ্রেগ চ্যাপেল জমানায় বাদ পড়ার পর সৌরভকে নিয়ে বাঙালির যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার কতখানি সৌরভ ক্যাপ্টেন থাকাকালীন ছিল, তা গবেষণা-সাপেক্ষ। এইসব কথা হয়তো অসত্য নয়। তবু উত্তম জীবৎকালেই কিংবদন্তি, মহানায়ক, তাই বা অস্বীকার করবে কে? মহানায়ক বলেই তো তাঁকে ঘিরে এমন উন্মাদনা তৈরি করা যায়।
উত্তমকুমারকে দেখলে এখন মনে হয়, বাঙালিয়ানা কী তা তাঁর থেকে শেখা উচিত আমাদের। শেখা উচিত, কীভাবে মহানায়কের স্পর্শাতীত রহস্য নিয়েও পাশের বাড়ির মানুষটি হয়ে ওঠা যায় অনায়াসে। শেখা উচিত, প্রেমের শরীরী ভাষা। শেখা উচিত, আবেদনকে আকাশচুম্বী করে তোলার রহস্য। বড়ো আটপৌরেভাবে, বড়ো সহজেই যা করতে পারতেন উত্তমকুমার।
‘বসন্ত বিলাপ’-এ চিন্ময়-শিবানীর সেই প্রেমের দৃশ্যটা মনে পড়ে? চিন্ময় বলছেন, “আমাকে একবার বলো উত্তমকুমার।” ঘটনাচক্রে এই সিনেমার নায়ক উত্তমের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই সংলাপটিকে তাই বড়ো প্রতীকী মনে হয়। উত্তমকুমার হয়ে উঠতে চাওয়া যেন সেই সময়ের সমস্ত প্রেমিকেরই চরম কল্পনা।
আর মনে পড়ে, শিবানী নাকি কিছুতেই শ্যুটিঙের সময়ে এই সংলাপের প্রত্যুত্তরে সামান্য ‘উত্তমকুমার’ শব্দটি বলতে পারছিলেন না। চিন্ময়কে নাকি পরে বলেছিলেন, তাঁকে উত্তমকুমার কল্পনা করতে গিয়েই কেমন যেন ঘেঁটে যাচ্ছিল সবটা। অভিনয় আর বাস্তব গুলিয়ে যাচ্ছিল কেবল ‘উত্তমকুমার’ শব্দটার উপস্থিতির কারণে।
এও একটা সত্যি। সবাই যে উত্তমকুমার হতে পারে না। কিছুতেই নয়।