No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দরজার সামনে দেখে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন আমার স্ত্রী 

    সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দরজার সামনে দেখে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন আমার স্ত্রী 

    Story image

    ২০০২ সালের এক গ্রীষ্মের সন্ধে। আমি থিয়েটারের মহড়ায় ছিলাম, এমন সময়ে ফোনে আমার স্ত্রী রুমার জরুরি তলব। কী বৃত্তান্ত, সে সব কিছু স্পষ্ট না করে শুধু বলল, “এক্ষুনি চলে এসো”। আমিও তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে এলাম, আমার চারতলার ফ্ল্যাটে পৌঁছনোর জন্য হন্তদন্ত করে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলাম। জোরে জোরে শ্বাস নিতে হচ্ছিল তখন। রুমার দরজা খুলল। তারপরেই ছিল বড়োসড়ো এক চমক। দেখলাম, আমাদের ড্রয়িং রুমে বসে খোদ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ও রয়েছেন সেখানে। আমি রুমাকে শুধোলাম, এরকম একটা ব্যাপার কেন লুকিয়ে রাখল আমার থেকে। রুমার হয়ে উত্তর দিলেন সৌমিত্রদাই, “ওঁকে দোষ দিও না। আমি বেল বাজালাম। উনি এসে দরজা খুললেন। দেখলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। সেই থেকেই উনি নার্ভাস”। 

    সৌমিত্রদা সেদিন তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমাদের বাড়ি ছিলেন। সমৃদ্ধ হওয়ার মতোই আড্ডা। কথোপকথন বেশ জমে উঠেছিল। সৌমিত্রদা বলছিলেন তাঁর মেন্টর শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে কাজ করার গল্প। সত্যজিৎ রায়ের সান্নিধ্যে থাকার অভিজ্ঞতাও শেয়ার করছিলেন। বলাই বাহুল্য, বাংলার থিয়েটার এবং বাংলা সিনেমার দুই কিংবদন্তির থেকে উনি কী কী শিখেছিলেন – তা শোনার জন্য তিন ঘণ্টা সময় মোটেও যথেষ্ট নয়।

    সৌমিত্রদার যে একজন বিরল প্রবাদপ্রতিম বহুমুখী জীবিত প্রতিভা, তা নিয়ে দ্বিমত কেউ পোষণ করবে না। তাঁর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা অতীব সম্মানের ব্যাপার। বলতে গর্ব হয় যে, এই সম্মান আমি বেশ কয়েকবার লাভ করেছি। মাত্র কয়েক মাস আগেই কাজ করেছি শৈবাল মিত্রের ছবি ‘দেবতার গ্রাস’ ছবিতে। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন বর্তমান সময়ের দুই মহীরূহ – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাসিরুদ্দিন শাহ। আমি ছিলাম সৌমিত্রদার জুনিয়ার উকিলের চরিত্রে। আদালতের ক্রশ একজামিনেশন, বাদানুবাদ, মক্কেলের পক্ষকে যুক্তি দেখানো, শানিত যুক্তিজালে বিপক্ষকে আক্রমণ, অভিযোগ করা – এরকম বয়সেও সবকিছুই তিনি কি সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুললেন! দশ-বারো লাইনের সংলাপ বলে দিলেন অনায়াসে! একবার নয়, বেশ কয়েকবার। এটা দৃষ্টান্তমূলক তো বটেই। রিটেকও নিতে হয়েছে খুবই অল্প। এরকমই প্রেরণা জাগিয়ে কাজ করেন সৌমিত্রদা। ৮৫ বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া আর কতজন অভিনেতা আছেন, যাঁরা এরকম সংবেদনশীল হয়ে চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলি ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তা আমার জানা নেই।

    সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে যে কোনো সম্ভাবনাময় অভিনেতারই অনেক কিছুই শেখার আছে। তিনি যতই প্রবীণতর হচ্ছেন, তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর জ্ঞানপিপাসা, যে কোনো রকম অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তিকে সাংস্কৃতিকভাবে আত্মস্থ করার ক্ষমতা ততই অনুসরণীয় হয়ে উঠছে। 

    আজ সৌমিত্রদা ৮৫ বছরে পা দিলেন, কিন্তু তাঁর প্রাণোচ্ছলতা ২৫ বছরের সদ্য যুবকের মতোই টগবগে। এখনও তিনি নিয়মিত থিয়েটার করেন, কবিতা আবৃত্তি করেন, শ্রুতিনাটকে অংশ নেন, সামাজিক কাজকর্মেও সক্রিয় থাকেন। অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার তিনি, তাঁর মতো সন্তান পেয়ে বাংলা গর্বিত। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কারেই ভূষিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিবারে তাঁর দেওয়া সবথেকে বড়ো পুরস্কার হল বহুমুখিতা – যা ‘অপুর সংসার’-এর অপু থেকে ‘ময়ূরাক্ষী’-র সুশোভন পর্যন্ত বিস্তৃত। 

    এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের জন্মদিনে ‘বঙ্গদর্শন’ তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য জানায় এবং কামনা করে যে, এভাবেই তাঁর শতবর্ষ পর্যন্ত তিনি দুর্দান্ত অবদান সৃষ্টি করতে থাকুন। 
     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @