খাদিজা বানুর দীর্ঘ দিনের সংগ্রাম সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছে

সুপ্রিম কোর্টের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কেন্দ্রও সহমত পোষণ করলো। স্পষ্ট জানালো এই পথের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। বাংলার বহরমপুরের খাদিজা বানুর দীর্ঘ দিনের লড়াই হয়তো বা সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছে।
খাদিজা বানু, বহরমপুরে তো বটেই, রাজ্যেও তিনি পরিচিত নাম। তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম মহিলাদের অধিকারের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে তিনি লড়াই করছেন। এবং এই কারণেই রাজ্যের মানুষের কাছে তিনি আজ শ্রদ্ধেয়। উত্তরপ্রদেশের তালাকপ্রাপ্ত মহিলা সায়রা বানু সুপ্রিম কোর্টের কাছে এক আবেদনে জানতে চেয়েছেন, এক জন ভারতীয় নারী হিসেবে তাঁর কী কী অধিকার প্রাপ্য! আসলে তিনি জানতে চেয়েছেন, মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে? এই নিয়ে আমরা টেলিফোনে কথা বলেছিলাম বহরমপুরের খাদিজা বানুর সঙ্গে।
কেন বৈষম্য, এ দেশের মুসলিম নারীরা কি ভারতীয় নন?
প্রশ্ন তুলে উত্তরপ্রদেশের সায়রার পাশে বহরমপুরের খাদিজা

শুভাশিস মৈত্র- সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের এক তালাকপ্রাপ্ত মহিলা, সায়রা বানু, সুপ্রিমকোর্টে মামলা করেছেন। তিনি দেশের শীর্ষ আদালতের কাছে জানতে চেয়েছেন, এক জন তালাক প্রাপ্ত মহিলার ভারতীয় নারী হিসাবে কী কী অধিকার তাঁর প্রাপ্য। সুপ্রিমকোর্ট এই বিষয়ে দায়িত্ব দিয়েছে ল- কমিশনকে।জানতে চেয়েছে সরকারের মতামত। আপনি যেহেতু দীর্ঘদিন তালাকপ্রাপ্ত নারীদের অধিকার নিয়ে, রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে লড়াই করছেন, তাই এই বিষয়ে আপনার মতটা জরুরি।
খাদিজা বানু- আচ্ছা আচ্ছা। আমি আগে বলি অন্য একটা কথা। সেটা হচ্ছে যে, যেহেতু সাহা বানু, ১৯৮৬ সালের ঘটনা, ভারতবর্ষের সবাই জানে যে তিনি তালাকের পর খোরপোষ চেয়েছিলেন। সুপ্রিমকোর্ট অর্ডার দেওয়ার পরও সেই খোরপোষ তিনি পেলেন না। তিনি পেলেন না কারণ তখন সেটা সংসদে বিল এনে আটকে দেওয়া হল।
শুভাশিস মৈত্র- আইন বদলানো হল...
খাদিজা বানু- হ্যাঁ, আইনটাই বদলে দেওয়া হল। এই যে একটা ভারতবর্ষের মত সেকুলার দেশ এটা করা হল, সেটা শিক্ষিত সম্প্রদায় কেউ মানতে পারেননি। এখন সায়রা বানু খুব সাহসের সঙ্গে ফের প্রশ্ন তুলেছে যে , ভারতীয় নারী হিসাবে তার কী কী অধিকার আছে। তালাক ভারতীয় সংবিধান অনুমোদন করে কি না? এখন এখানে আমারা যতটুকু কাগজ দেখে, আমরা তো ডাইরেক্ট মহিলার সাথে যোগাযোগ করিনি...
শুভাশিস মৈত্র - হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।
খাদিজা বানু- হ্যাঁ, সেখানে আমরা যেটা দেখলাম যে তাঁর এই মামলার পর সুপ্রিমকোর্ট খানিকটা নড়ে চড়ে বসলেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে বললেন ভাবার জন্য যে, ট্রিপল তালাক বিষয়ে তাদের মত কী? আদালত সেটা ভাবতে বললেন কেন্দ্রীয় সরকার কে। পরবর্তীতে সুপ্রিমকোর্ট আর একটা আপিল করলেন দেশের জনসাধারণের কাছে, যে এই ট্রিপল তালাক নিয়ে জনগণের মধ্যে তর্ক- বিতর্ক আলাপ আলোচনা হোক।
এখন এখানে আমার যদি বক্তব্য বলেন, সেখানে সায়রা বানু রাইট পয়েন্টে কোয়েশ্চেনটা করেছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখানেও কিন্তু খুব গাফিলতি হচ্ছে। এবং এই সমাধানটা করতে গেলে, সায়রা বানুর কেসটা নিয়ে সমাধান করতে গেলে, ভারতবর্ষে ট্রিপল তালাক কে কিন্তু বন্ধ করে দিয়ে আইনি সুরক্ষা মেয়েদের দিতে হবে। এবং গভর্নমেন্ট কে আইন করতে হবে এবং সেখানে শুধুমাত্র ট্রিপল তালাক নয়, এই যে আপনার – বহুবিবাহ, একাধিক স্ত্রীর অনুমোদন, পার্সোনাল ল মানে চারটে পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে। এটা মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড দ্বারা অনুমোদিত। সেটাও কিন্তু বন্ধ করতে হবে।
শুভাশিস মৈত্র- আচ্ছা
খাদিজা বানু- এবং শুধু তাই না, মুসলিম পার্সোনাল ল এর দ্বারা ভারতবর্ষের নাগরিক হিসাবে মুসলিম মহিলার বহু অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ‘স্বামী যদি মারা যায় শ্বশুর যদি জীবিত থাকেন, তাঁর সন্তান যদি থাকেও, তাকে তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়। তার আর কোন রাইট রইল না। সন্তানদেরও পিতামহের বাড়িতে আর কোন রাইট রইল না। এটা হচ্ছে মুসলিম পার্সোনাল ল। সেই মেয়েটি তালাক হওয়া মেয়ের মতনই উচ্ছেদ হয়ে যায়। ফলে এই যে ধরুন এই ‘ল’ গুলো কিন্তু আমাদের দেশে মানে মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানের আইনি সুরক্ষার কোন সুযোগ নেই।
এখানে সায়রা বানুর ক্ষেত্রে আমরা যেটা করছি, এখন করছি, আমরা চেষ্টা করছি গণ স্বাক্ষর করে সেই দরখাস্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাতে। আমরা সায়রা বানু কে শুধু সাপোর্ট করা নয়, ভারতবর্ষের কোটি কোটি মুসলিম নারীর জীবনে সত্যি সত্যি আইনি সুরক্ষা চাইছি। আমার ভোটের অধিকার আছে কিন্তু আমার জন্য আইন নেই। অথচ আমার হাত-পা কেউ কাটলে মানে অন্যরকম ক্রাইম যদি হয়, তাহলে কিন্তু সাধারণ আইন প্রয়োগ হচ্ছে আমাদের উপর। কিন্তু তালাকের ক্ষেত্রে, এবং আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে মুসলিম মহিলাদের জন্য আছে পারসোনাল ল বোর্ড। তখন আমরা যেন আর ভারতীয় নারী নয়। তখন আমরা মুসলিম নারী। এটা কেন হবে? তার পর আমার যে -Right to Property। এই যে একটা সাধারণ আইন, যেটা সব ভারতীয়ের জন্য, সেটা কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মুসলিম নারী হিসাবে কার্যকরী হচ্ছে না। তখন আবার মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। এটা কেমন করে হতে পারে?
তুরস্কতে এই আইন নেই। ইয়েমেনে নেই। এমনকী বাংলাদেশে পাকিস্তানে পর্যন্ত এই ভাবে আর ট্রিপল তালাক অনুমোদিত হচ্ছে না। তাহলে কেন আমাদের এই রকম একটা ধর্ম নিরপেক্ষ দেশে এই সব নিয়ম চালু থাকবে?পারসোনাল ল বোর্ড কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে?
ফলে আমরা কিন্তু নামছি প্রতিবাদ করতে। এবং আমরা খুব সম্প্রতি একটা ওয়ার্কশপ করেছি।
শুভাশিস মৈত্র- কোথায় হয়েছে ?
খাদিজা বানু- এটা বহরমপুরে, বহরমপুরে হয়েছে। এবং আপনাকে, দৈনিক স্টেটসম্যানে তাঁর নিউজটা করেছে বড়, আনন্দবাজারে হয়েছে বর্তমানে হয়েছে। এখানকার বহু, ছয়টা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে দিয়েছে। সেখানে মেয়েদের দিয়ে বলিয়েছি, তালাক হওয়া মেয়েদের দিয়ে, বলিয়েছি- তোমরা বলো এবং তাদের এই সমস্ত, তারা বোল্ডলি বলেছে আমরা যেখানে যেতে হয়ে যাবো। কিন্তু সুবিচার চাই। দরকার হলে আমরা দিল্লি যাবো, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাবো, আমরা এটা বন্ধ করতে চাই। তা না হলে কিন্তু যে সমস্যাটা আমদের জীবনে এসে গেল আগামী দিনে অন্যদের ক্ষেত্রে সমানে এসে যাচ্ছে। সেটা বন্ধ করতে চাই। এ আমরা মানতে চাই না। ভিকটিম মহিলারা অনেকেই লেখা পড়া জানেনা, কিন্তু ভেতর থেকে তাঁরা এই কথাটা বলেছে ওই ওয়ার্কশপে। বহু নারী, ২২ জন মেয়ে সেদিন অংশগ্রহণ করেছিল, আলোচনায় আমাদের এখানে। তার পর এখানের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ-অধ্যক্ষা হেডটিচার ডাক্তার, এনারা সমস্ত যারা শিক্ষিত সেকশন, আমাদের কমিটির অনেকেই, সদস্য তারা রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির, তারা সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
শুভাশিস মৈত্র- মুর্শিদাবাদের বাইরেও কী আপনারা যাচ্ছেন ?
খাদিজাবানু- হ্যাঁ হ্যাঁ আমর আমরা শুরু করেছি। রাজ্যে শুরু করেছি। অন্যান্য প্রদেশেও আমরা খানিকটা কাজ করছি। আর আমাদের লেখালেখি। বিভিন্ন ম্যাগাজিন যে গুলো আছে। সেখানেই লেখা হচ্ছে। আমি তো নিজে বহু লেখা লেখি করছি। আরও অন্যান্য যারা আমাদের সদস্য, তারাও আছে। আমরা আসলে সবার কাছে আবেদন করছি, যাতে সকলে একমত হয়ে আমরা সারা ভারতবর্ষে এটা একটা আওয়াজ তুলতে পারি যে, বর্বর প্রথাটা আমাদের সভ্য দেশে বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু যদিও দেখুন এটা তাড়াহুড়া করবার বিষয় তো নয়। এটাতো শত শত বছরের পুরোনো একটা সমস্যা। লেপ্টে আছে মানুষের মননে, সেই কারণে এটা খুব ধীরে ধীরে কাজটা আমাদের করতে হচ্ছে। তার পর আমাদের মৌলবাদের যা যখন একটা ভয়ঙ্কর রূপ, বীভৎস রূপ, সারা বিশ্ব জুড়ে, তবে আমরা সেটা ভয় পাই না। এটা করতে গেলে যারা হচ্ছে শিক্ষিত সম্প্রদায় তাদের সমর্থন দরকার। এটা আমাদের কাছে বড় সম, বিশেষ করে মুসলিম শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কিন্তু এগিয়ে তেমন করে আসতে পারছেন না। এটা কিন্তু আমাদের কাছে একটা বড় সমস্যা। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
শুভাশিস মৈত্র- কেন পাচ্ছেন না?
খাদিজাবানু – তাদের হচ্ছে অন্ধতা। এটা একটা সিরিয়াস প্রবলেম। উচ্চশিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যেও কিন্তু একটা বেড়াজাল। তারা সংস্কার বলুন ধর্মীয় অন্ধতা বলুন, তারা কিন্তু তেমন করে এগিয়ে আসতে পারছে না।আমরা কাজ করছি ঠিকই কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে।
শুভাশিস মৈত্র- এই বাধা কী করে কাটাবেন?
খাদিজাবানু- এই বাধা কাটানোর জন্য ধরুন এটা তো কোনও তাড়া হুড়ার ব্যপার না। এটা আমাদের একটা সমস্যা। আমাদের ইতিহাস টা তো এটাই, এটা আমাদের মেনে নিতে হবে।
শুভাশিস মৈত্র- বাঁধা তারা দেননি, একটু নির্লিপ্ত আছেন?
খাদিজা বানু- হ্যাঁ… এই ভিকটিম মহিলারা যারা, আপনি অবাক হয়ে যাবেন আপনি যদি কখনও আসেন মুর্শিদাবাদ জেলায় আসেন, দেখবেন এদের সংখ্যা লক্ষাধিক।
শুভাশিস মৈত্র- মানে আপনার জেলায় তালাকপ্রাপ্ত মহিলা লক্ষাধিক?
খাদিজাবানু- হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদ জেলাতেই, ওনলি মুর্শিদাবাদ জেলাতে। আমি এই সব মেয়েদের নিয়ে জেহাদ ঘোষণা করেছি। আমি মানে আমাদের সংগঠন। এই মেয়েদের সরকারকে পুনর্বাসন দিতে হবে। স্বনির্ভর করতে হবে তা না হলে পাচার রোখা যাবে না, মুর্শিদাবাদ জেলা পাচারের যে শীর্ষস্থানে, তার অন্যতম কারণ হল এটা একটা। ফলে পাচার আটকাতে গেলে মেয়েদের স্বনির্ভর করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। আমরা কিন্তু মেয়েদের নিজেদের উদ্যোগে স্বনির্ভর করবার চেষ্টা করছি, আমাদের নিজেদের উদ্যোগে। সেলাই, নার্সিং ট্রেনিং যার যেমন এডুকেশন আছে। সেটা নিয়ে তো ক্ষুদ্র, একটা প্রচার আমরা করছি। যে তোমরা স্বনির্ভর হও, যেটা রোকেয়া সাঁখওয়াত চেয়েছিলেন। ফলে এখানে কিন্তু কোন মৌলবাদীরা, ভিকটিম মহিলাদের মুখের আহার তুলে দিচ্ছি বলে, এই চেষ্টা করছি বলে, মানবিক কারণে তারা এই জায়গাটায় হামলা করতে পারছে না।
শুভাশিস মৈত্র- সরকারের থেকে কী রকম সহায়তা পাচ্ছেন?
খাদিজাবানু- সম্প্রতি আমরা একটু পেয়েছি। মানে মাইনোরিটির যেটা সেক্সন্সন, আমরা প্রথমে বলি ২০০৮ সালে ৫০০০ তালাক হওয়া মেয়ের একটা তালিকা জমা দিয়েছিলাম। ২০১০ সালে আমরা তৎকালীন রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে আমরা প্রায় ১০০০ মেয়ে মুর্শিদাবাদ থেকেই নিয়ে যাই। এবং সেখানে আমরা ডেপুটেশন দিই। তার পরে আমরা দেখলাম একটা আইন হল-‘মুসলিম উওম্যান এমপাওয়ামেন্ট স্কিম’ খুব কম সুদে লোন-টোন পাবে। কিন্তু আইনটা কার্যত কার্যকারী হয়নি।
শুভাশিস মৈত্র- এটা কী আইন হল। না একটা…
খাদিজাবানু- স্কিম হল। আইন না, স্কিম…
শুভাশিস মৈত্র- স্কিম……
খাদিজাবানু- এখন এই স্কিমটা যে হল সেটাও একটা সমস্যা হয়ে গেল। আপনারা তো সকলেই জানেন বলতে দ্বিধা নেই যে পঞ্চায়েত গুলি হচ্ছে দলবাজদের জায়গা। যদি বড় পাকা বাড়িও থাকে তারাই কিন্তু পাবে। যদি সে সেই দলের লোক হয়। এই সমস্যাটা টা সকলেই ফেস করছি গ্রামে গঞ্জে কাজ করতে গিয়ে। এই মেয়েরা কোন রাজনীতি বোঝে না, পার্টি বোঝে না। ফলে তারা সেই ভিকটিমই থেকে যাচ্ছে। ২০১৫, আমরা এইখানে একটা আওয়াজ তুলেছি, জেলা শাসক আমাদের হেল্প করেছেন। আমরা লিস্ট দিচ্ছি। সেখান থেকে তারা ঘরের অনুদান দিতে শুরু করেছে। যে মেয়েদের একেবারে থাকার কোন জায়গা নেই তারা পাচ্ছে।