No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    টাইমস অফ থিয়েটার (ToT) : কালজয়ী থিয়েটারের অনলাইন রেডিও আর্কাইভ

    টাইমস অফ থিয়েটার (ToT) : কালজয়ী থিয়েটারের অনলাইন রেডিও আর্কাইভ

    Story image

    যেন এক আশ্চর্য সহজতা ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত ঘরটা জুড়ে। রয়েছে শুধু কয়েকটা চেয়ার, ক্যাবিনেট আর একটা টেবিল। যতীন দাশ রোডের এই ছিমছাম ফ্ল্যাটের ভিতরেই যে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বাংলা থিয়েটার-এর নবজাগরণ, তা সত্যিই বিশ্বাস হয় না প্রথম দর্শনে।

    কমিউনিকেশন্স প্রফেশনাল শুভময় বসুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘টাইমস অফ থিয়েটার’ (ToT)-এর সদর দফতর বলা যায় এই ফ্ল্যাটটিকে। টাইমস অফ থিয়েটারের পথচলা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের জুন মাসে। লক্ষ্য ছিল, আগ্রহী দর্শকদের কাছে সাহিত্য থেকে শুরু করে মঞ্চশিল্প অবধি থিয়েটারের নানান আঙ্গিক তুলে ধরা। এছাড়াও, কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী বাংলা থিয়েটারের একটি আর্কাইভ বা সংরক্ষণাগার তৈরি করবার প্রচেষ্টা করে চলেছে টাইমস অফ থিয়েটার। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ২০০০ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা।

    শুভময় বসু বলেন, “এর সূচনা খুঁজতে গেলে পৌঁছে যেতে হয় ‘শুক্রবারের নাটক’ প্রসঙ্গিত আমার শৈশবের স্মৃতিতে।” ১৯৭০-৮০ নাগাদ আকাশবাণী কলকাতার প্রযোজনায় ‘শুক্রবারের নাটক’ নামের রেডিও পডকাস্টটি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার সন্ধে নাগাদ এটি শুনতে পাওয়া যেত বেতারে। তিনি জানান, “আমাদের কাজে সেই ফরম্যাটটিকেই তুলে ধরতে চেয়েছি আমরা। তাই আমাদের ওয়েবসাইট থেকে বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন নাট্যকারের লেখা কন্টেম্পোরারি নাটকগুলির পডকাস্ট শুরু করেছি”। ২০২২ সালের জুন মাসে এই পডকাস্টের নামকরণ করা হয় ‘টিওটি রেডিও’, যা উভয় iOS ও Android ডিভাইসে খুব সহজেই গুগল প্লে স্টোরে ‘টিওটি রেডিও অ্যাপ’ লিখে ডাউনলোড করা যাবে।

    থিয়েটারশিল্প সমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পরামর্শে আর্কাইভটি তৈরি করবার সিদ্ধান্ত নেন শুভময় বসু। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও হয়ে উঠেছেন পডকাস্টটির অংশ; তাঁর বাংলা থিয়েটার সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ৩০ মিনিটব্যাপী ১৫টি অডিও এপিসোডে রাখা হবে আর্কাইভটিতে। শুভময় বলেন, “শমীকদা আমায় পরামর্শ দেন, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বদের অভিজ্ঞতাগুলি রেকর্ড করবার।”

    টিওটি-র যাত্রা শুরু হয় চপল ভাদুড়ির সঙ্গে, যাঁর বক্তব্য ইতিমধ্যেই ধরা দিয়েছে ১৫টি পর্বে। এছাড়াও অরুণ মুখোপাধ্যায়, বিভাস চক্রবর্তী, মনোজ মিত্র, অশোক মুখোপাধ্যায়রা সাগ্রহে অংশ হয়ে উঠেছেন এই উদ্যোগটির। শুভময় বলেন, “শমীকদাই বলেন, আমরা যেন এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের অনুরোধ করি, তাঁরা যেন নিজেদের সবথেকে জনপ্রিয় নাটকগুলি নিজেদের কণ্ঠে পাঠ করেন আমাদের রেকর্ড করবার সুবিধার্থে।”

    ফলস্বরূপ বর্তমানে টিওটি-র সংগ্রহে রয়েছে অরুণ মুখোপাধ্যায়-এর কণ্ঠে ‘মারীচ সংবাদ’-এর একটি রেকর্ডিং। ‘জগন্নাথ’-এর রেকর্ডিংও আসতে চলেছে খুব শিগগিরি। মনোজ মিত্রের কণ্ঠে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ কিংবা বিভাস চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’ পাঠও শোনা যাবে। শুভময় বসু জানান, “সমগ্র পরিকল্পনাটিতে বিভাসদা অত্যন্ত উৎসাহী। তিনি চেয়েছেন, ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’র জন্য একটি ছোটো সেট তৈরি করতে, যেখানে তিনি মঞ্চসজ্জার চিন্তাধারা ব্যাখ্যা করতে পারবেন। এতে আমরা একটা ভিডিও রেকর্ডিংও পেয়ে যাব সমস্ত বিষয়টির।” নাটকগুলির রেকর্ডিং হবে টিওটি-র নতুন স্টুডিও ‘কানে কানে’-তে, যার উদ্বোধন হয়েছে দেওদার স্ট্রিটে, গত ১৮ মার্চ।

    আর্কাইভগুলি যে শুধুমাত্র অতীতের মহিমা সংরক্ষণ করবার ভাণ্ডারমাত্র, তা কিন্তু নয়। শুভময় বলেন, “দেবেশ চট্টোপাধ্যায়-এর মতো সুবিখ্যাত কন্টেম্পোরারি নাট্যব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যেই মঞ্চশিল্প বিষয়ক আটটি ভাগের একটি সিরিজ রেকর্ড করেছেন আমাদের সঙ্গে।” এছাড়াও, এগিয়ে এসেছেন সৌমিত্র বসু, যিনি তাঁর ‘অন্তর্মুখ’ নামের নাট্যদলটির সঙ্গে মিলে প্রতি সপ্তাহে একটি মাস্টারক্লাস নেন টিওটি রেডিওতে।

    টিওটি-র সঙ্গে যুক্ত থিয়েটার ব্যক্তিত্বদের নামের তালিকা ক্রমশ বেড়েই চলেছে; যোগ দিয়েছেন সোহাগ সেন, গৌতম হালদার, দেবশঙ্কর হালদার, চন্দন সেন, সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং বিপ্লব দাশগুপ্ত। আর এ সমস্ত কিছুই হয়েছে মাত্র দুই বছরে। এত কিছুর খরচ কীভাবে চালান ওঁরা? আর কান পাতলেই শোনা যায় যে বিলাপ, বাংলা থিয়েটার ধীরে ধীরে দর্শক হারিয়ে ফেলছে – এ বিষয়ে কী বলবেন তাঁরা? “আমাদের একটি পডকাস্ট একসঙ্গে ১,৭০০ শ্রোতা শুনছেন, এমনও হয়েছে। তাই বাংলা থিয়েটারে মানুষের আগ্রহ নেই, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। তবে বিভিন্ন কারণেই পডকাস্ট শুনবার এই অভিজ্ঞতাটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নিতে চাই না আমি। এমনকি অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা যারা থিয়েটার ভালোবেসে এগিয়ে এসেছে, তাদেরকেও কোনো রকম খরচ করতে বারণ করি আমি।” এ প্রসঙ্গে বলেন শুভময় বসু।

    সম্প্রতি বেতনভুক্ত নাটকের ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে টিওটি, যেখানে ২৫০ জন ছাত্রছাত্রীর ক্লাস নেবেন বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্বরা। শুভময় বলেন, “আমি কখনওই এমন প্রতিশ্রুতি দিই না যে এখানে নাটক শিখলেই বাইরের নাটকে অভিনয় করবার সুযোগ পেয়ে যাবেন কেউ। অথবা চান্স পেয়ে যাবেন সিরিয়ালে। অথচ তা সত্ত্বেও দেখুন, কতজন শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছে আমাদের সঙ্গে। এরপরেও কি বলবেন, মানুষ বাংলা থিয়েটারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে?”

    টিওটি-র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট দেখুনঃ https://timesoftheatre.com/

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @