No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মধ্য কলকাতায় আজও গপ্পো বুনছে এই স্কোয়ার

    মধ্য কলকাতায় আজও গপ্পো বুনছে এই স্কোয়ার

    Story image

    কলকাতা বিষয়ক যেকোনও ক্যুইজের প্রশ্ন হতে পারে– শহরের কোন স্থান একইসঙ্গে বাচ্চাদের পার্ক, সাঁতারের ক্লাব, ঐতিহ্যশালি পুজোর ঠিকনা এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামের মাধ্যমে একটাই সূত্রে বাঁধা? উত্তর কিন্তু কঠিন নয়। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। আমরা মূলত এই স্কোয়ার বা পার্কের বিখ্যাত দুর্গাপুজোর সঙ্গেই পরিচিত। কিন্তু, এই পার্কের নামকরণ নিয়ে খুব বেশি মানুষ ওয়াকিবহাল নন। বিপ্লবী শহীদ সন্তোষ মিত্র ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আয়ুষ্কাল মাত্র একত্রিশ বছর। ব্রিটিশ-বিরোধী নানান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন এই মানুষটি। জড়িয়ে ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনেও। এই ঘটনাতেই গ্রেপ্তার হয়ে প্রেরিত হন হিজলী জেলে। জেলে বন্দি থাকাকালীনই ইংরেজদের গুলিতে প্রাণ দেন ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ সালে। তাঁরই স্মৃতিতে বৌবাজারে লেবুতলা অঞ্চলে নামকরণ হয়েছে এই উদ্যানের। তাঁর আবক্ষ প্রস্তরমূর্তি স্কোয়ারে ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬ সাল নাগাদ স্থাপিত হয়।

    বিপ্লবী শহীদ সন্তোষ মিত্রের আবক্ষ মূর্তি

    ইতিহাসের প্রবাহে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের অন্যতম, বা বলা যায় মুখ্যতম আকর্ষণ অবশ্য দুর্গাপুজোই। এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। চলতি বছরে ৮২-তে পা দিল পুজো। আগে এর নাম ছিল শিয়ালদা সর্বজনীন দুর্গোৎসব। সেই ১৯৩৬ সালে শিয়ালদা অঞ্চলের কয়েকজন সমমনস্ক মানুষ বারোয়ারি দুর্গাপুজো আয়োজন করার কথা ভাবেন। সার্পেন্টাইন লেনে চ্যাটার্জি পরিবারের একচিলতে জমিতে নতুন পুজো সমিতির উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয় পুজো। উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন শ্রী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, শ্রী দক্ষজা নন্দী আর শ্রী মণিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী কালে অনেক খ্যাতনামা মানুষ যেমন শ্রী কিরণ চন্দ্র ঘোষ, বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ তারক পোদ্দার প্রমুখরা এই সমিতির ভার নিয়েছেন।

    সেই প্রথম বছরেই, পুজোর বিজয়া সম্মিলনীর উপলক্ষে, ভারতবর্ষে প্রথম জলসা শুরু হয় উদ্যান চত্বরে। জলসায় অংশগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মন, পঙ্কজ মল্লিক, নির্মলা মিশ্র, পান্নালাল ভট্টাচার্য, কে.এল.সাইগল-এর মতো স্বনামধন্য শিল্পীরা। এই পুজোর যাত্রাপথ কিন্তু খুব একটা মসৃণ ছিল না। স্বাধীনতার সমসাময়িক কালে কূটনৈতিক কারণে, সার্পেন্টাইন লেনের জমিতে পুজো আয়োজন করা একটা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন সমিতির উদ্যমে এই পুজো অতীতের সেন্ট জেম্‌স স্কোয়ার, অধুনা সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে উঠে আসে।

    সার্পেন্টাইন লেনে অজিত দত্তের ইন্ডিয়া কাইট্‌স

    স্কোয়ার সংলগ্ন সার্পেন্টাইন লেনেও আছে ইতিহাসের হাতছানি। ভারতবর্ষের বিখ্যাত ঘুড়ির দোকান India Kites এখানেই অবস্থিত। দোকানের মালিক শ্রী অজিত দত্ত, যাঁকে অনেকেই ঘুড়িশিল্পের ক্ষেত্রে দিকপাল মনে করেন। বাংলায় তো বটেই, ভূ-ভারতের নানান জায়গাতেও তাঁর পরিচালনায় বানানো অসংখ্য ঘুড়ি সাপ্লাই করা হয়। নিজের নিরলস কাজের জন্যে পেয়েছেন বহু সরকারি, বেসরকারি পুরস্কার।

     

    সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে শিশু উদ্যান

    সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার ও তাকে ঘিরে বিভিন্ন আকর্ষণের মধ্যে অন্যতম হল একটি সুলালিত শিশু উদ্যান। ২০ জুলাই, ১৯৮৭ সালে কলকাতা পুরসভার মেয়র শ্রী কমল কুমার বোস কর্ত্তৃক উদ্যানটির উদ্বোধন হয়। স্কোয়ারের এক পাশে একটি সাঁতারের ক্লাবও আছে। উৎসাহীরা সেখানে নিত্য ভিড় জমান। উদ্যানের আর এক পাশে রয়েছে একটি কবাডি ক্লাবও।

    সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে সাঁতার ক্লাব

    এই বছরে সন্তোষ মিত্র সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি অন্য বারের মতোই দুর্গাপুজোয় কিছু অভিনবত্ব রাখার পরিকল্পনা করেছে। সমিতির ভাবনায় আছে, রুপোর তৈরি ৪০ কোটি টাকা মূল্যের রথ, যে দেবী দুর্গাকে বহন করবে। ১০ টন ওজনের রুপো দিয়ে শিল্পীরা রথটি তৈরি করবেন। প্যান্ডেলের উচ্চতা হবে ৬০ ফিট। উদ্যোক্তারা আশাবাদী যে গতবারের পুজোয় দুর্গা প্রতিমার ৬০ কেজি ওজনের স্বর্ণজরির শাড়ি যেমন লক্ষ-লক্ষ দর্শকদের প্যান্ডেলে টেনেছিল, এবারেও তাঁর পুনরাবৃত্তি হবে।

    তবে, এই বছর সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজো সাধারণ উৎসবের উর্ধ্বেও এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। পুজো সমিতির মহৎ উদ্যোগে অসহায় বয়স্ক মানুষদের জন্যে আশ্রয় তৈরি করা হবে শীঘ্রই। কয়েকদিন আগেই জন্মাষ্টমির তিথিতে শিল্যান্যাস হয় ‘আশা প্রদীপ’ বৃদ্ধাশ্রমের। মুচিপাড়া থানার পাশেই গড়ে তোলা হবে বৃদ্ধাশ্রমটি।

    লেবুতলার এই চত্বরে এমনিই কথা বলে সাবেক কলকাতার ইতিহাস। দু’পাশে গুচ্ছ গুচ্ছ পুরোনো বাড়ি। অলি-গলি বেয়ে হাঁটলেই মনে হয় সময়টা আপনাকে টেনে নিয়ে চলেছে অন্য কোথাও। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারেও কী সহজে মিশে যায় শহিদ সন্তোষ মিত্রর ইতিহাস, দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, বিখ্যাত ঘুড়ির দোকান ও আরও কত কিছু। একটু আলো ঝিমিয়ে আসা সন্ধেয় চলে আসুন এখানে। মন্দ অনুভূতি হবে না, নিশ্চিত।

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @