No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    এই সেই বাড়ি, যার সামনে গঙ্গায় বাঁধা থাকতো রবি ঠাকুরের বিখ্যাত পদ্মাবোট

    এই সেই বাড়ি, যার সামনে গঙ্গায় বাঁধা থাকতো রবি ঠাকুরের বিখ্যাত পদ্মাবোট

    Story image

    "স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে সোজা হেঁটে এসে যে বাড়িটায় ধাক্কা খাবে ওটাই,দেখবে দরজার বাইরে কলিং বেল আছে" ফোনে এমনটাই বলেছিলেন অসীম খান।

    সেইমতো স্ট্র্যাণ্ড রোড ধরে হেঁটে পৌঁছলাম সবুজ ফটকের সেই বাড়িতে। না কলিং বেল বাজাতে হল না, দরজার বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন অসীমবাবু। আমাকে দেখে, সাদরে ভিতরে নিয়ে গেলেন। কাঠের দরজা পেরিয়ে, ছোট লোহার গেট। তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা "কুকুর হইতে সাবধান"। যদিও কুকুরের শব্দ কানে এলো না কোনও। তাই নির্ভয়ে এগিয়ে গেলাম। এগিয়ে গেলাম রবিঠাকুরের স্মৃতির আস্তানায়। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) নয়, এ বাড়িতে এসেছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (Jyotirindranath), কাদম্বরী দেবী (Kadambari Devi), বিদ্যাসাগর (Bidyasagar) সহ আরও অনেকেই।

    রবিঠাকুরের স্মৃতির আস্তানা

    হাওড়া - বর্ধমান (Howrah-Bardhaman) মেন লাইনের পরিচিত স্টেশন চন্দননগর (Chandannagar)। অনেকেই বলেন, আলোর শহর। একসময় চন্দননগর ছিল ফরাসি (French) উপনিবেশ। ইংরেজশাসিত কলকাতার (Kolkata) সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে ফরাসিশাসিত চন্দননগর। কলকাতার মতো চন্দননগরেও আছে স্ট্র্যান্ড (Starnd), বড়বাজার (Barabazar), বাগবাজার (Bagbazar), বউবাজার (Boubazar) -এর মতো জায়গাগুলি।

    ছিল একটা দোতলা বাড়ি, দুম করে হয়ে গেল পাতালবাড়ি। বাগানের পিছনের দিকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেই একটা অন্য দুনিয়া। তালা খুলতেই চোখের সামনে ধরা দিল সেই আকাঙ্খিত পাতালঘর। 

    চন্দননগরের স্ট্র্যাণ্ড রোড

    চন্দননগরের স্ট্র্যাণ্ড রোড মানেই, গঙ্গার হাওয়া গায়ে মেখে হেঁটে যাওয়া। এ শহরের অলিতে গলিতে রয়েছে পুরোনো গন্ধ। নতুনত্বের ছোঁয়া যতোই লাগুক না কেন, পুরোনো স্মৃতিতে মরচে পড়েনি এক রত্তিও। সেকালের ফরাসডাঙার নাম বদলে গেলেও ঐতিহ্য একই রকম রঙিন।

    শ্বেত পাথরের স্মৃতিফলক

    গঙ্গার গা ঘেঁষে হলুদ বাড়ি। বাড়ির পাশে শ্বেত পাথরের স্মৃতিফলক, আর তাতেই লেখা "পাতাল বাড়ি"। না, এটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের (Shirshendu Mukhopadhyay) পাতালঘর নয়, এটা চন্দননগরের পাতালবাড়ি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মৃতি বিজড়িত পাতালবাড়ি (Patal Bari)। পিটুনিয়া, ছাতিম, টগর কিংবা পুরোনো বট, অশ্বত্থ এসব নিয়েই ভরাট বাগান ঘেরা বাড়ি। বাড়ির বাগানের গা দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। কোথাও চুন খসানো দেওয়াল কোথাও বা শ্যাওলা ধরা আস্তরণ, এ যেন ঝাঁ চকচকে শহরের বুকে এক চিলতে স্মৃতির অ্যালবাম।

    পুরোনো আলাপচারিতার সূত্রেই কথা হল চন্দননগরের বাসিন্দা চন্দ্রিমা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নিজের শহরের স্মৃতিচারণা করতে তিনিও বেশ আগ্রহী। জানালেন শহরের অজানা কথাও। "পাতাল বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম আসেন একটি সভায়। এই সভাতেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে গলায় মালা পরিয়ে দেন প্রভাত সঙ্গীতের গানগুলির জন্য", বললেন চন্দ্রিমা। ১৭২০ সালে সেন্ট জোসেফ কনভেন্টের উল্টোদিকে গঙ্গার পাড় বরাবর তৈরি হয় মোরান সাহেবের বাগান বাড়ি। রবীন্দ্রনাথের চন্দননগরের বেশিরভাগ সময়টা কেটেছিল সেই বাড়িতেই। আর পাতালবাড়িতে আসা শুরু হয় ওই সভার পর থেকেই।

    এই গঙ্গায় বাঁধা থাকতো রবি ঠাকুরের পদ্মাবোট

    "গঙ্গার ভাঙনে এই দিকটা ধসে গেছে পুরো", অসীমবাবুর কথায় ফিরে তাকালাম। বাড়ির চারিদিকে যেন জরাজীর্ণ ছবিটা স্পষ্ট। একটা সময় ফ্রেঞ্চ নেভি রেস্ট হাউস ছিল এই বাড়িটি, পরে যোগেন্দ্রনাথ খানের মালিকানায় যায় বাড়িটি। ঠাকুর পরিবার তাঁর কাছ থেকে বাড়ি ভাড়া নেন। সেই সূত্রেই রবি ঠাকুরের এ বাড়িতে থেকে যাওয়া। শুধু থেকে যাওয়া বললে ভুল হবে, এই সেই বাড়ি যার সামনে গঙ্গায় বাঁধা থাকতো রবি ঠাকুরের বিখ্যাত পদ্মাবোট (Padma Boat)। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন রবীন্দ্রনাথ। কতো কতো কবিতা, গান, প্রবন্ধ লিখেছেন এখানে বসেই।

    ছিমছাম, সাদামাটা পাতালবাড়ি

    শহুরে কোলাহল থেকে নিজেকে দিব্যি আড়াল করে রেখেছে এই বাড়িটি। ছিমছাম, সাদামাটা। চোখের সামনে দোতলা বাড়ি। তারই চারিদিকে ইতস্তত ঘুরছি। কিন্তু কিছুতেই খোঁজ পাচ্ছি না সেই পাতালঘরের। আমার মনের অবস্থাখানা বোধ হয় বুঝতে পারলেন অসীম খান মহাশয়, "কী ভাবছ? আসল আকর্ষণটা খুঁজে পাচ্ছ না, তাই না?" আমি যেন ঠিক এই অপেক্ষাতেই ছিলাম। তড়িঘড়ি বলে বসলাম, "হ্যাঁ আসলে পাতালঘরটাই খুঁজছি"। অসীমবাবু এবার একটু হেসেই বললেন, "আমিও অপেক্ষা করছিলাম তুমি কখন বলবে পাতালঘরের কথাটা"।

    পাতাল ঘরে যাওয়ার সিঁড়ি

    এ যেন সেই, "ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল"। ছিল একটা দোতলা বাড়ি, দুম করে হয়ে গেল পাতালবাড়ি। বাগানের পিছনের দিকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেই একটা অন্য দুনিয়া। তালা খুলতেই চোখের সামনে ধরা দিল সেই আকাঙ্খিত পাতালঘর। বাড়ির অদ্ভুত স্থাপত্য শৈলীর জন্যই এমন নাম। একটা পুরো তলা মাটির নিচে, গঙ্গার বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাটির তলায় পরপর ঘর, রান্নাঘর। কেমন যেন রহস্য মাখা। কতো না জানা ইতিহাসের সাক্ষী এই পতালঘর। কেউ কেউ বলেন এই পাতাল ঘর নাকি একসময় আত্মগোপনের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছিল বিপ্লবীদের।

    এই সেই পাতালঘর 

    ১৯২০ সাল থেকে খান সাহেবরাই দেখাশোনা করছেন এই বাড়িটি। প্রজন্মের হাত ঘুরে এখন তা অসীম খানের জিম্মায়। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি একাই সামলান বাড়িটির দায়িত্ব। সময়ের গ্রাসে সেই পাতাল বাড়ি আজ ধ্বংসপ্রায়। গঙ্গার ভাঙনে একাংশ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তবুও টিকে আছে এই পাতালঘর, কিন্তু আর কত দিন? অজানা সংশয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ভয় পায় পাতালবাড়ি। কিন্তু টিকে থাকার ইচ্ছেরা সাহস সঞ্চয় করে অসীমবাবুর কথাতেই,"পুরোনো স্মৃতির ভার অনেক, তাকে বয়ে নিয়ে যেতে তো একটু বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবেই, তাই বলে তাকে তলিয়ে যেতে তো দিতে পারি না!"

    ছবি সৌজন্যে – কঙ্কনা মুখার্জী

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @