No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বিধান রায়ের স্বপ্নের ‘পাতালরেল’ ছোটা শুরু করেছিল ঠিক ৩৫ বছর আগে

    বিধান রায়ের স্বপ্নের ‘পাতালরেল’ ছোটা শুরু করেছিল ঠিক ৩৫ বছর আগে

    Story image

    ব্রিটিশ আমলেই শুরু হয়েছিল কথা। তিলোত্তমা তখন রোজ বহরে বাড়ছে। গাড়ি-ঘোড়াও বাড়ছে। এদিকে ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় কলকাতায় বড়ো রাস্তার আয়তন কম। সব দিক ভেবে-চিন্তে সেই ১৯২১ সালেই বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার হার্লি ডারলিম্পল হে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কলকাতায় পাতালরেল চালু করার। কিন্তু, সে-সময় এত খরচের বহর মাথায় নিতে চায়নি ব্রিটিশরা। এরপর দেশ স্বাধীন হল। সদ্য জন্ম নেওয়া গরিব দেশেও গাড়ির সংখ্যা কমার বদলে বাড়তেই লাগল। কলকাতার অবস্থা তখন সবচাইতে জটিল। শহরের মোট স্থলজমির মাত্র ৪.২ শতাংশ জুড়ে তখন রাস্তা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় ফের উজিয়ে তুললেন পাতালরেল চালুর পরিকল্পনা। সেটা ১৯৫০ সাল।

    রেলগাড়ি ছুটবে মাটির তলা দিয়ে—এ এক বিরাট আশ্চর্যের ব্যাপার তখন কলকাতাবাসীর কাছে। নেহাত সম্ভাবনার কথা উঠতেই তাই শোরগোল পড়ে গেল। ফরাসি বিশেষজ্ঞ এলেন। নানা আলোচনা, সমীক্ষা হল। কিন্তু, কাজ শুরু হল না। পাতাল রেলের সম্ভাবনায় ফের পলি জমতে শুরু করল।

    কিন্তু, আসল সমস্যা প্রতি বছরই বাড়ছিল। আদতে শহরটাই বহরে বাড়ছিল রোজ। যানবাহন বাড়ছিল। যানজটে নাকাল হওয়াও বাড়ছিল। ফলে, ফের পাতালরেল চালু করার উদ্যোগ শুরু হল। ১৯৬৯ সালে তৈরি হল রেলওয়েজের ‘মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট প্রোজেক্ট’ (এমটিপি)। ভারতের সঙ্গে তখন সোভিয়েত রাশিয়ার সম্পর্ক মধুর। সেই সোভিয়েত থেকে বিশেষজ্ঞরা এলেন। আরেক কমিউনিস্ট দেশ পূর্ব জার্মানি থেকে এলেন ইঞ্জিনিয়াররা। শুরু হল কলকাতার বুকে পাতালরেল স্থাপনের মাস্টার প্ল্যানিং। শহর ও শহরতলি জুড়ে নানা জায়গায় সমীক্ষা করে মোট পাঁচটা মেট্রো-রুটের কথা উঠে এল। তার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হল তিনটি রুটকে। প্রথম রুট দমদম থেকে টালিগঞ্জ। দ্বিতীয়টা সল্টলেক থেকে রামরাজাতলা এবং তৃতীয় রুট দক্ষিণেশ্বর থেকে ঠাকুরপুকুর।

    এরমধ্যে, সবচাইতে প্রাধান্য পেল কলকাতার বুক চিড়ে দমদম থেকে টালিগঞ্জ, ১৬.৪৫ কিমি বিস্তৃত প্রথমটা রুটটাই। ঠিক হল, এই রুটের কাজই আগে হবে। পরিকল্পনায় শিলমোহর পড়ল ১৯৭২-এর ১ জুন। সেই বছরেরই ২৯ ডিসেম্বর, প্রকল্পের শিলান্যাস করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই প্রকল্প ঘিরে তৎকালীন রেলমন্ত্রী আবু বরকত আতাউর গনিখান চৌধুরির উৎসাহ ছিল দেখার মতো। টুকটুক করে কাজ শুরু হল ১৯৭৩ নাগাদ। কলকাতাবাসী তখনো বুঝতে পারেনি এই কাজ আদতে কতখানি বড়ো ব্যাপার।

    তিলোত্তমা শ্রী হারাতে শুরু করল দ্রুতই। দিকে দিকে সুড়ঙ্গ খোঁড়া চলছে। সে এক বিপর্যস্ত অবস্থা কলকাতার। এসপ্ল্যানেড চত্বর থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, শ্যামবাজার থেকে ভবানীপুর। ডাঁই হয়ে রয়েছে মাটি, বিরাট গর্তের মুখ, নানা যন্ত্রপাতি। উৎসুক মানুষজন ভিড় জমান প্রথম প্রথম, ক্রমে বিরক্তি বাড়ে। যানজট কমানোর প্রক্রিয়া যানজট বাড়িয়েও তোলে খানিক। বিরক্তিতে ক্রমশ অভ্যস্তও হয়ে পড়ে শহর। সঙ্গে চাপা উত্তেজনা, দেশের প্রথম পাতালরেল চলবে এখানেই। মাটির তলা দিয়ে, এমনকি খালের তলা দিয়েও নাকি সুড়ঙ্গ খোঁড়া হচ্ছে। হাতেনাতে কাজের প্রমাণ দেখেও অনেকে বিশ্বাস করতে চান না। সত্যিই মাটির তলা দিয়ে রেলগাড়ি যেতে পারে নাকি! শহরজুড়ে প্রযুক্তির এত বিরাট ব্যবহারও স্বাধীনতার পর সেই প্রথম দেখছিল কলকাতা।

    কাজে বাধাও আসছিল নানারকম। রাজনৈতিকভাবে সময়টা বেশ অস্থির। সত্তর দশকের আগুনে আঁচ রোজই টের পাচ্ছে মহানগরী। মাঝে অর্থের যোগানে টান পড়ল। প্রয়োজনীয় মালমশলার আমদানিও বিঘ্নিত হতে লাগল। মামলায় স্থগিতাদেশ পড়ল প্রকল্পের কাজে। শেষ অবধি সত্যিই কলকাতায় পাতাল রেল চালু হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহও দেখা দিচ্ছিল কলকাতাবাসীর মনে। তার মধ্যেই কাজ এগোতে লাগল। একসময় শেষও হল সুড়ঙ্গ খোঁড়া। তারপর একে-একে স্টেশন তৈরি হল, ট্রায়াল রানও হল। সমস্ত বাধা পেরিয়ে অবশেষে ভারতের প্রথম পাতালরেল ছোটা শুরু করল ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর। আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগে।

    প্রথমেই কিন্তু দমদম থেকে টালিগঞ্জ অবধি চালু হয়নি পাতালরেল। এসপ্ল্যানেড থেকে ভবানীপুর (বর্তমানে নেতাজি ভবন) পর্যন্ত চলেছিল শহরের প্রথম পাতালরেল। প্রথম পাতালরেলের চালক ছিলেন দুই বঙ্গসন্তান—তপন কুমার নাথ এবং সঞ্জয় শীল। দমদম-টালিগঞ্জ অবধি মেট্রো পরিষেবার স্বাদ পেতে অবশ্য শহরবাসীকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো বেশ কিছুদিন। মাঝে যাত্রীসংখ্যা কম হওয়ায় উত্তরে মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। শ্যামবাজার থেকে সেন্ট্রাল অবধি ভূর্গভস্থ সুড়ঙ্গতে নানা কাজও চলছিল। শেষে, ১৯৯৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর চালু হল দমদম থেকে টালিগঞ্জ অবধি নিরবিচ্ছিন্ন মেট্রো পরিষেবা। কলকাতার পাতালরেল তখন গোটা দেশের কাছেই বিস্ময়।

    রেলগাড়ি যখন প্রথম তার বিশাল কলেবর নিয়ে হাজির হয়েছিল এ-দেশে, সে এক বিরাট বিস্ময় ছিল বটে। বলা ভালো, দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতিকেই একধাক্কায় অনেকটা বদলে দিয়েছিল রেলগাড়ি। কলকাতার পাতালরেলের আগমন অনেক পরে, তখন সময়টাও আধুনিকতার পোশাক চড়িয়েছে গায়ে। তারপরেও তাকে ঘিরে বিস্ময়ের ঘোর কম ছিল না। চলমান সিঁড়ি, টিকিট পাঞ্চ করে ঢোকা-বেরোনো—সবটা নিয়েই রোমাঞ্চিত হতেন কলকাতার মানুষ। যানজটহীন রেলযাত্রায় হুশ করে পৌঁছে যাওয়া যায় অফিস-পাড়ায়। ক্রমে লোকাল ট্রেনের চাইতে এক ভিন্ন চরিত্র গড়ে উঠল পাতাল রেলের। দৈনন্দিন যাত্রার অভ্যেসে ধীরে ধীরে বিস্ময় মরে আসতে লাগল। পাতাল রেলে আগুন, রেল লাইনে ঝাঁপ আত্মহত্যার ঘটনা শোনা যেতে লাগল। রেকের বয়স বাড়ল, শ্রী চটে গেল। দেশের অন্যান্য শহরেও পাতালরেল চালু হল। পরিষেবার মান নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠতে লাগল। বিস্ময়ের, গর্বের পাতালরেল ঘিরে তখন দেদার অভিযোগ।

    সেই অভিযোগের রেশ আজো বিদ্যমান। এরই মধ্যে নতুন মেট্রো রুট তৈরি হচ্ছে। সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে কলকাতার বুকে ভেঙে পড়ছে বাড়ি। বারবার মেট্রো-পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার খবরে ছেয়ে যাচ্ছে সংবাদ-মাধ্যম। প্রযুক্তি-অধ্যুষিত দুনিয়ায় তাকে ঘিরে কোনো বিস্ময়ই আর অবশিষ্ট নেই। তবু সে চলছে। পুজোয় যাত্রীদের ভরসা জোগাতে প্রায় সারা রাত ধরে তার ছোটা। অফিস টাইমে সে আজো হাজার-হাজার নিত্যযাত্রীর ভরসা। নতুন এসি রেক, টিকিটের বদলে টোকেন—বেশ কিছু বদলও সে ঘটিয়ে ফেলেছে নিজের ভিতরেই। মাটির তলা দিয়ে সে আজো ছুটছে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ। দক্ষিণের সীমা অবশ্য শহর ছাড়িয়ে আরো সুদূর দক্ষিণে পৌঁছেছে। বয়স বাড়ছে তার। বিগত যৌবন পাতালরেল তবু গতি কমায়নি।

    আজ তার জন্মদিন। দেশের প্রথম পাতালরেল, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম পাতালরেল। সমস্ত বিরক্তি, অভিমান, অভিযোগের পরেও গৌরবের একটা ইতিহাস তাকে ঘিরে আজো লেপ্টে। সেই ইতিহাসকে তো মোছা যাবে না কিছুতেই। 
       

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @