যৌনকর্মীদের থিয়েটার চর্চা

প্রতি শুক্রবার শোভাবাজার দুর্বার কেন্দ্রে চলছে যৌনকর্মীদের নিয়ে নাট্যচর্চা। দুর্বার একটি সংস্থা, যেখানে যৌনকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদের শিক্ষিত করার কাজে ব্রতী হয়েছেন দুর্বার মহিলা উন্নয়ন কমিটি। এঁদের সাংস্কৃতিক গ্রুপের নাম ‘কোমল গান্ধার’। এখানে নিয়মিত নাচ, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি শেখানো হয়। তবে এই প্রথম নাটকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রীতিমতো ওয়ার্কশপের মাধ্যমে পরিচালকদ্বয় সুনয়ন মুখার্জী এবং সুরিন্দর সিং এমন কিছু ছেলেমেয়েকে শেখাচ্ছেন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, শেখাচ্ছেন চোখের এক্সপ্রেশন। তবে সবার আগে দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁদের অক্ষর চেনানো। ছোটবেলা থেকে তাঁরা এমন পরিবেশের মধ্যে কাটিয়েছেন বা যেভাবে বড় হয়ে উঠেছেন তাতে আলাদাভাবে স্কুল কলেজে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনওই তাদের বাড়ি পৌঁছোয়নি। তাই সবার আগে নিরক্ষরতা কাটানোর গুরুদায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন দুই গুরু। প্রশিক্ষক সুনয়ন মুখার্জী বলছেন, “এখানে যাঁরা কাজ করছে তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। এঁদের মধ্যে কেউ থাকেন শোভাবাজারে, কেউ কেউ সোনাগাছিতে। আমরা চেষ্টা করছি ওঁদের সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগৎ উপহার দিতে। ওরা প্রত্যেকেই ভীষণ ভালো কাজ করছে। ছেলে-মেয়েদের কাজ করার আগ্রহের নেশা দেখে আমরা চমকে উঠি। প্রত্যেকেই আমার ভাই-বোন। বাংলা থিয়েটারের জন্য না হয় এইটুকু শ্রম দিলাম!”
এঁদের মধ্যে আবার কয়েকজন নর্মাল স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে। এক মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছেন। প্রশিক্ষকরা কোনোরকম টেক্সট-কেন্দ্রিক কাজ করতে রাজি নন। আলাদাভাবে তৈরি করা হয়নি কোনো স্ক্রিপ্ট। কারণ যৌন কর্মীদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাঁরা পড়তে পারেন না। আলাদাভাবে শারীরিক ইঙ্গিত বা গল্পের ছলে বুঝিয়ে দিতে হয় ঘটনা পরম্পরা। জানিয়ে দিতে হয় একটা কথা বলার সময় কোনদিকে সে মুখ ঘোরাবে, দুই হাতের কাজ কী হবে, পাশের অভিনেতা বন্ধুটিকে কতটা সাহায্য করবে, চোখ বা মুখের হাসি কীভাবে কথা বলে উঠবে, গলার আওয়াজ কখন কোথায় তুলতে হবে- সবটা ধরে ধরে হাতেকলমে শিখিয়ে দিচ্ছেন। একমাসের এই প্রশিক্ষণের পর শুরু হবে প্রোডাকশনের কাজ। সাধারণ কোনো স্ক্রিপ্টে না গিয়ে ওদের জীবন থেকেই তুলে আনা হবে গল্প। সেই গল্পের চরিত্র হবেন তাঁরাই। অংশগ্রহণ করেছেন দশজন ছেলেমেয়ে। কিছুজন যৌনকর্মী, কিছুজন যৌনকর্মীর সন্তান। তাদের গড় বয়স ১৬ বছর থেকে ৪০ বছর।
আরও পড়ুন
ট্যাবু ভাঙতে মঞ্চে ফিরল ‘বিবর’
‘অল্টারনেটিভ থিয়েটার’ বছরে হাতেগোনা দেখা যায়। বাংলা থিয়েটারের শক্তিশালী ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কতকিছুই আমাদের অজানা থেকে গেল। কিছু বছর আগে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় রূপান্তরকামী মানুষদের নিয়ে একটি প্রযোজনা নির্মাণ করেছিলেন ‘দেহান্তর রূপান্তর’ নামে। শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় অন্ধ মানুষদের নিয়ে সারাবছর কাজ করেন। বহরমপুরের প্রদীপ ভট্টাচার্য সংশোধনাগার-কর্মীদের নিয়ে থিয়েটার করেছেন। এইভাবে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে থিয়েটারের অন্যরকম স্পেস খুঁজে নিতে চাইছেন নাট্য-প্রশিক্ষকরা। তেমনই বাংলা থিয়েটারের নতুন সংযোজন শোভাবাজার দুর্বারের এই প্রয়াস।