বাঙালির পেটপুজো উৎসবে প্লেট সাজিয়ে হাজির গোটা বিশ্ব

আমরা বাঙালি। রসে বসে থাকতে ভালোবাসি। পাড়ার বিরিয়ানির দোকান থেকে দূরের কোনো মাল্টিক্যুইজিন রেস্তোরাঁ – একা হোক বা অনেকে – মাঝে মাঝে হানা না দিলে আমাদের শান্তি হয় না। অশান্তিই আমাদের চালিকাশক্তি। এই অশান্তিই আমাদের রঙিন করে রাখে, জীবনটাকে একঘেয়ে হতে দেয় না। বঙ্গবাসীর এমন রংচঙে জীবনে আরেকটা নতুন রং যুক্ত হয়েছে ২০১৫ সাল থেকে, যার নাম ‘আহারে বাংলা’। সরকারি উদ্যোগে একটা গোটা মেলা ভর্তি শুধু খাবার আর খাবার – এই লোভনীয় এবং অভিনব আয়োজন সাড়া ফেলে দিয়েছিল সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে। ‘বঙ্গীয় খাদ্য উৎসব’ কিংবা ‘খাদ্য মেলা’ নামে পরিচিত এই মেলা কিছু গঠনমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল। যেমন, কৃষকদের উৎপাদিত ফসল মানুষের সামনে তুলে ধরা, এ রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া রান্না নতুন করে খাদ্যরসিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, ছোটো-বড়ো রেস্তোরাঁগুলিকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসা এবং কৃষি, মৎস, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ব্রয়লার মুরগি প্রভৃতি খাবার-দাবার সংক্রান্ত শিল্পগুলির আর্থিক লাভকে সুনিশ্চিত করা।
প্রথম বছরেই মেলা সুপার হিট। দলে দলে মানুষ পাড়ি জমিয়েছিলেন মিলন মেলা প্রাঙ্গনে। নানান দেশের নিরামিশ-আমিশ-টক-ঝাল-মিষ্টি রকমারি আইটেম চেখে দেখা, ইচ্ছে করলে প্যাকেটবন্দি করে বাড়ি নিয়ে আসা, সব কিছুরই সুঠাম বন্দোবস্ত খাদ্যরসিক মহলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তারপর আরও দু’বছর সফলভাবে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবার ‘আহারে বাংলা’ চার বছরে পড়ল। ইতিমধ্যে মেলার জায়গা পালটে গেছে। এবছর মেলা বসেছে নিউটাউন মেলা প্রাঙ্গনে। গত মঙ্গলবার ২০ নভেম্বর জমকালোভাবে মেলার উদ্বোধন করলেন মৎসমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা, খাওয়া-দাওয়া চলবে আগামী ২৫ নভেম্বর রবিবার পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাণী সম্পদ মন্ত্রকের উদ্যোগে মেলাটির আয়োজন করা হয়েছে। সহযোগিতায় রয়েছে কৃষি, কৃষি বিপণন, মৎস, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, উদ্যান পালন, আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দপ্তর। ‘আহারে বাংলা’-র যাবতীয় আপডেট যাতে সাধারণ মানুষ পেতে পারেন, তার জন্য একটি অ্যানড্রয়েট অ্যাপও চালু করা হয়েছে। শুধুমাত্র মেলার প্রথম দিন সন্ধে ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। বুধবার থেকে শেষ দিন পর্যন্ত অবশ্য দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা অবধি খাবার পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন
মালদার জিভে কনসাটের স্বাদ
গত বছর মেলায় ছিল ১০৮টি স্টল, এবার স্টলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২৫টি। এর মধ্যে থাকছে ৫৫টি নাম করা রেস্তোরাঁ, ৪টি সরকারি সংস্থা এবং ৩০টি মিষ্টির দোকান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি, মৎস, কৃষি বিপণন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রক থেকেও স্টল থাকছে। ইউরোপ, চিন, জাপান আফগানিস্তানের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের খাবার-দাবার রাখা আছে পেটপুজোর অপেক্ষায়। থাকছে সেলিব্রিটি শেফরাও। বিশেষ পুরস্কার থাকছে নতুন এবং জনপ্রিয় খাবারের জন্য। খেতে খেতে কিংবা খাওয়ার আগে-পরে যদি আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে হয়, তারও বন্দোবস্ত রয়েছে এখানে। গত তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মেলার লোকধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবার। এই বছরের মেলায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন মানুষ একসঙ্গে বসে খেতে পারবেন। এরকম তো হতেই পারে, খেয়ে দেয়ে কারো ইচ্ছে হল, সুস্বাদু কিছু খাবার বাড়িতে তৈরি করে নিজে খাবেন, পরিবারের লোককেও খাওয়াবেন। তাঁদের কথা ভেবে মেলাতেই রয়েছে ‘আহারে বিকিকিনি’, যেখান থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে সবজি সহ রান্নার হরেক রকম দরকারি জিনিস। সব মিলিয়ে এবারও শীতের শুরুতে ‘আহারে বাংলা’ যে পেটুক বাঙালিকে আশাহত করবে না, সেটা জলের মতোই পরিষ্কার।
ছবি সূত্র- অন্বেষা সেনগুপ্ত