No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাঁকা একটি নদীর নাম

    বাঁকা একটি নদীর নাম

    Story image

    ভাঙাভাঙি করা আমাদের স্বভাব হয়ে গেছে। বর্ধমানটাও দু’ভাগ হয়ে গেল। সে যাকগে ভালোই হয়েছে। অজয়, দামোদর, ভাগীরথী, বরাকর, নোনিয়া, সিঙ্গারণ, ট্যামলা, কুকুয়া, কুনুর, টুমুনি, খড়ি, বাঁকা, বেহুলা, গাঙ্গুর, খণ্ডেশ্বরী, ব্রাহ্মণী, কাড়ুলিয়া, ঘীয়া অজস্র নানা গতির, নানা মতির নদী। এই নিয়ে বর্ধমান। ছিল। এ যুগের তলায় এখন চাপা পড়ে আছে, চাপা পড়ে গেছে আরও অসংখ্য প্রাচীনতর নদীগর্ভ। পলিমাটি, মানুষের বসত, মানুষের হাতিয়ার, শ্রম সব চাপা পড়ে আছে। ঘিরে ধরে আছে থরে থরে আপার টার্শিয়ারি, কোয়াটারনারি সেডিমেন্ট আর প্লাস্টিক... কংক্রিট।

    দামোদর তো সেই কোন যুগ থেকে বয়। এখনও বয়। কোনওমতে। দামোদর প্রথম দেখি ৭-৮ বছর বয়সে। তার আগে মামাবাড়ি যেতে হাওড়া ব্রিজ দেখেছি। হাওড়া ব্রিজের তলায় গঙ্গা দেখেছি। ফুলেশ্বর দেখেছি। রূপনারায়ণ দেখেছি। কাঁসাই নদীর বান দেখেছি। আবার শুকিয়ে কাঠ কাঁসাই নদীও দেখেছি। দেখেইছি, চেনাজানা হয়নি। কিন্তু ততদিনে সবচেয়ে বেশিবার দেখেছি বাঁকা।

    “কূল বাঁকা, গাঙ বাঁকা
    বাঁকা গাঙের পানি
    আমি সকল বাঁকায় বাইলাম নৌকা
    তবু, বাঁকারে না জানি।।”

    মনে পড়ে, আমার এক দাদা আমায় বৈষ্ণব পদাবলি বোঝাতে গিয়ে শুনিয়েছিল এই অংশটুকু। বাঁকাতে লীন থেকেও বাঁকের গূঢ়ার্থ বোঝা যায় কই? তবে, এই বাঁকা একটি নদীর নাম। আমি তখন, যাকে বলে ‘প্রথম শ্রেণী’তে পড়ি। বাঁকা নদী আমাদের স্কুলের পাশ দিয়ে বইত। পাশের আদিবাসী বস্তিগুলোর বাচ্চারা বর্ষায় জল থাকলে ব্রিজের উপর থেকে ঝাঁপ দিত। আমি স্কুলের পোশাক পরে দেখতাম। তখনও সাঁতার দিতে পারতাম না। এখনও না। ভাবতাম, বাঁকার নাম এমন কেন হল? শুনলাম বাঁকার চলনই আঁকাবাঁকা। তাই। কিছু দূর যেতে না যেতেই বাঁকার বাঁক বদলে যায়। এসব ছোট থেকেই জানি। তারপর বড় হয়ে স্কুলের ভূগোল কেতাবে ‘মিয়েন্ডার’ কী, কাকে, কীভাবে ইত্যাদি পড়লাম। তবে বাঁকা নিয়ে পড়া হয়নি। পড়া যায় না। কেউ পড়তে চাইবেও না। চাইবেই বা কেন? বর্ধমান পৌরসভা বাঁকাকে চেনে পয়ঃপ্রণালী হিসেবে। নাগরিকরাও তাইই। আর বাঁকাকে বোধহয় কেউ দেখতেও পারে না। কথায় আছে “যাকে দেখতে নারি, তার...”। বাঁকায় তাই আবর্জনা ফেলা চলে।

     তবে সম্প্রতি বাঁকা সংস্কার চলছে। পাড় বাঁধিয়ে। তলা বাঁধিয়ে। ডিভিসির নির্বাহী বাস্তুকার আদেশ দিয়েছেন বাঁকা নালায় আবর্জনা ফেলা যাবে না। কেউ বলেনি বাঁকা নদীকে নালা বলে ডাকা যাবে না। যাইহোক, জিটি রোডের উপর এই ব্রিজের গায়ে ওই আদেশ টাঙানো আছে। আগে জিটি রোড এখান দিয়ে যেতই না। বাঁকা যেত বটে। তবে জিটি রোড তো বহুবার বাড়ানো চাড়ানো হয়েছে। ১৭৯০তে জিটি রোড চওড়া ক’রে ৩০ ফুট হয়। সেজন্যে সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যুগে বর্ধমানের মহারাজা হাজার দশেক টাকা অ্যালাওয়েন্সও পান। এরপরে জিটি রোড আরও সরে আসে। বাঁকার উপর ব্রিজ তৈরি হয়। ১৮০২ থেকে ওই ব্রিজে যান চলাচল শুরু। তারপর কালেক্টর, পিডব্ল্যুডি ইত্যাদি ইত্যাদি।

    বাঁকা এসবের থেকে ঢের পুরনো। কালেক্টরের থেকে, ইংরেজদের থেকে, রাজারাজড়াদের থেকে, জিটি রোডের থেকে। বাঁকার বওয়া শুরু গোপালপুর থেকে। দামোদরে ধারে ঢেউ খেলানো জমি, দিগন্ত উপচানো ধানক্ষেত। দামোদর থেকে গড়িয়ে সেইসব ধানক্ষেত থেকে বাঁকার বওয়া শুরু। তারপর কখনও পুবে, কখনও দক্ষিণে এঁকেবেঁকে বাঁকা এগিয়েছে। কখনও ধানজমিতে পড়ে ছড়িয়ে গেছে। কখনও ঢালু জমিতে ছিপছিপে হয়ে গেছে। পাশের কোনও জলধারার সঙ্গে মিশে কোনও বিলে গিয়ে পড়েছে। নলখাগড়ার বনে, ঘাসবনে, জলাজমিতে মিশেছে। বাঘরোল, মেছোবিড়ালরা মাছ ধরে খেয়েছে। এখন সেসব দিন ফুরিয়ে এসেছে। বাঁকাকে দেখে মনে হয় তার দিনও ফুরিয়েছে। বর্ধমান শহর জুড়ে বাঁকার উপর বেশ কয়েকটা ব্রিজ আছে। তার একটা-দু’টোকে দিনে কয়েকবার পেরোতেই হয়। বাঁকার মৃতদেহ দেখি রোজ। বাঁকা আর বয়না। অথবা বাঁকা বয়।

    “যেখানে রুপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর,
    যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর;
    যেখানে সোনালি মাছ খুঁটে-খুঁটে খায়
    সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙ্খায়;
    নির্জন মাছের রঙে যেইখানে হ’য়ে আছে চুপ
    পৃথিবীর একপাশে একাকী নদীর রূপ”...

    বাঁকাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে বর্ধমান তার এক ইতিহাস হারাবে। পাথুরে ইতিহাস নয়, বয়ে চলা প্রাণের ইতিহাস।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @