মহিলা ছদ্মনামের বিড়ম্বনায় একবার নিজের মা-কে কবি সাজিয়েছিলেন শরৎকুমার

প্রয়াত কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। নব্বই বছর বয়সী এই কবি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। আজ মঙ্গলবার ভোরে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়। ১৯৭৩ সালে লেখা ‘পাশাপাশি দু-খানা ঘর’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “পাশাপাশি দু-খানা ঘর ভাড়া করে থাকে দু-জন/ অবশ্য একটাই বাথরুম/ একটাই রান্নাঘর, বাকি সব নিজের নিজের।/ কোনোদিন এ হয়তো বললঃ/ ক্লান্ত, আজ রাঁধতে ইচ্ছা করছে না/ আমার জন্যে একমুঠো চাল নিয়ে নিন;/ আবার কোনোদিন ও এসে বললে/ আজ আমি ক্লান্ত,/ আপনার ঘরে গিয়ে এক হাত দাবা খেলি, চলুন।/ এছাড়া অন্যান্য দিন, অধিকাংশ -/ ওদের দেখাই হয় না পরস্পরের সঙ্গে-/ কাজ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে/ আনন্দ আনন্দ নিয়ে”। এমনই কিছু সরল লেখনী ঘিরেছিল তাঁর কবিতাজগতে।
আরও পড়ুন: ‘মাতাল’ তারাপদ
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ কবি ছিলেন শরৎকুমার। ১৯৩১ সালে জন্ম এই কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে আসেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায়। তারপর কৃত্তিবাসের ঘরেরই একজন হয়ে ওঠেন। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেও তাঁর প্রধান নেশা ছিল কবিতা। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সোনার হরিণ’ প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাস থেকেই। তাঁকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। প্রথম পর্যায়ে ‘নমিতা মুখোপাধ্যায়’ ছদ্মনামে লিখতেন। একদিন হঠাৎ মধ্যমগ্রামের বাড়িতে ‘অঙ্গনা’ পত্রিকার দুই মহিলা কর্মী তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে আসেন আগে থেকে চিঠি দিয়েই। তারপর ঘটে গেল সাংঘাতিক এক ঘটনা। নিজের মা-কে নমিতা মুখোপাধ্যায় সাজিয়ে সে যাত্রা পার করেছিলেন। তার কিছুদিন পরেই দেখা করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কৃত্তিবাস’ অফিসে। এবং তারপর থেকে আর ছদ্মনামে লেখেননি তিনি।
‘র্যাঁবো, ভের্লেন এবং নিজস্ব’ বা ‘সোনার পিত্তলমূর্তি ওই’-এর মতো কাব্যগ্রন্থে উঠে এসেছিল নগরের নিজস্ব উচ্চারণ। সুনীল, শক্তিদের মতো তিনিও ছিলেন কলকাতা শাসন করা এক কবি। এক সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছেন সে কথা। কৃত্তিবাস পত্রিকার চারজন যুবকের মধ্যে প্রধান ছিলেন সুনীল ও শক্তি। দলের অন্যান্যরা বাকি দুজনের জায়গা নিতেন। মোট সাত-আটজন মিলিত হতেন। তারপর রাত আটটা থেকে শুরু হত তাঁদের কলকাতা ভ্রমণ। খালাসিটোলা, ছোটা ব্রিস্টল হয়ে চলে যেতেন শহরের আরও গভীরে। রাত বাড়লে তাঁদের মন যেত চোলাইয়ের ঠেকে। শেষ অবধি পড়ে থাকতেন যে চারজন, সারারাত হেঁটে গান গাইতে গাইতে কলকাতা ঘুরতেন। পুলিশ দেখলেও তাঁদের কিছু বলতেন না। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, চারজন মিলে কার্তিকের দিশি মদের দোকানের পিছনে এক ট্যাঙ্কের উপর বসে, মদ খেয়ে তারপর গোলবাড়িতে মাংস-রুটি খেয়ে বাড়ি ফিরতেন যে যার মতো। আর এটাই বাংলা সাহিত্যে রচিত আছে ‘মধ্যরাতের কলকাতা শাসন’ নামে।
শুধুই কি কবিতা! উপন্যাস ও ছোটোগল্পেও শরৎকুমার ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সহবাস’ প্রকাশিত হয় শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। স্ত্রী-বদল নিয়ে লেখা সেই আখ্যান সে সময় প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি করে। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘আশ্রয়’, ‘কথা ছিল’ বা ‘নাশপাতির গন্ধ’। ২০০৯ সালে ‘ঘুমের বড়ির মতো চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
একে একে নিভে যাচ্ছে কবিতাময় আলো। যাঁদের সারাজীবনের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে থেকেছে কবিতা, তাঁরা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এই ধরাভূমের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে। কবিতাময় পাগলামির সংখ্যাও কমে আসছে। কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে বাঁচার মতো বাঁচতে ক’জনই বা পারেন! শরৎকুমার পেরেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় অমর রহে।