বৃদ্ধ বয়সেও টেবিল টেনিসের শখ ছাড়তে পারেননি তিনি

তাঁর বয়স হয়েছে ৭৫ বছর। কিন্তু এই বয়সেও প্রতিদিন তাঁকে লিফট ছাড়া পাঁচতলায় উঠতে হয়। আর তাতে তিনি এতটুকুও হাঁফিয়ে ওঠেন না। কারণ, টেবিল টেনিস খেলার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ।
কোনওদিন বিয়ে না করার কারণও এই টেবিল টেনিসই। বিয়ে করলে সংসারের চাপে টেবিল টেনিস খেলতে পারবেন না – এই আশঙ্কা ছিল তাঁর। সংসারে অনেক দায়বদ্ধতা আছে। তাই বিয়ে না করেই যেন এক অন্য সন্ন্যাসিনীর ভূমিকায় রয়েছেন তিনি। শুধু খেলা আর খেলা, পরিবারের ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী সকলকে নিয়ে তাঁর এই বৃদ্ধ বয়স দিব্যি চলছে। নিঃসঙ্গতা নেই। বৃদ্ধ বয়সেও ব্যাট হাতে দিব্যি ছুটে চলেছেন তিনি।
তিনি ভারতী ঘোষ। কেউ কেউ তাঁকে বাবলিদি বলেই ডাকেন। উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী শিলিগুড়ি। টি, টিম্বার, ট্যুরিজম-এর জন্য শিলিগুড়ির খ্যাতি সর্বত্র। কিন্তু তার সঙ্গে বেশ কয়েকবছর ধরে আর একটি টি যুক্ত হয়েছে। সেটি হল, টেবিল টেনিস। জাতীয় স্তরে অনেকগুলো টেবিল টেনিস খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে শিলিগুড়ি। এরমধ্যে অর্জুন মান্তু ঘোষ থেকে শুরু করে অর্জুন শুভজিৎ সাহা যেমন আছেন তেমনই পলি সাহা, সুরভি ঘোষের মতো আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় রয়েছেন। রয়েছেন আরও অনেক তারকা। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস মানচিত্রে শিলিগুড়ি একটি সুনাম করে নিয়েছে। আর এর মূল ভিত তৈরিতে যাঁদের অবদান সবসময় স্মরণ করতে হয় তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ভারতী ঘোষ।
আরও পড়ুন
কুড়ি বছরে ৫৪টি বই লিখেছেন ‘অঙ্কমামা’
১৯৬৯-১৯৭০ সালে শিলিগুড়ির টেবিল টেনিসে শুরুর দিকে প্রথম সায়গল ইন্সিটিউটে তাঁর টেবিল টেনিস খেলা শুরু হয়। প্রথম দিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেন। তারপর ব্যাট হাতে একদিন খেলার সুযোগ আসে। খেলতে খেলতেই অসমে একটি টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ডাক পান তিনি। দারুণ পারফরমেন্স দেখান। আর তাতেই রেলে চাকরি। এরপর শুধু ব্যাট হাতে খেলা আর চাকরি। তারপর খেলা শেখানো। তাঁর হাতে তৈরি কার্যত প্রথম টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হিসাবে জাতীয় স্তরে নাম করেন গনেশ কুণ্ডু। তারপর মান্তু ঘোষ সহ আরও অনেকে। পুরস্কারও অনেক জুটেছে। যদিও সরকারি কোনো পুরস্কার আজও তাঁর কপালে জোটেনি। তবে সরকারি কোনো পুরস্কার না পেলেও তিনি আজও খেলা শিখিয়ে চলেছেন। তাঁর কথায়, ‘পুরস্কার পাব বলে টেবিল টেনিস খেলতে আসিনি। এটা ভাল লাগে, তাই খেলি।’
শিলিগুড়ি দেশবন্ধুপাড়ায় রয়েছে অমিত আগরওয়ালা ফাউন্ডেশন। সেখানে এখন তিনি সপ্তাহে পাঁচ দিন ধরে ৫০ জন ছেলেমেয়েকে খেলা শেখান। আর এই খেলা শেখাতে এই বৃদ্ধ বয়সেও পাঁচ তলা বিল্ডিং-এর ওপর তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান। তার বাইরে আবার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খেলা শেখান। যারা খেলা শেখার জন্য পয়সা দিতে পারে না সেই দুঃস্থদের তিনি বিনে পয়সায় খেলা শেখান। তাঁর হাতে তৈরি মূক ও বধির টেবিল টেনিস খেলোয়াড়পলি সাহা এবং সুরভি ঘোষ আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড়। তাদের একটা চাকরির জন্যও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সারা জীবন খেলার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে এসে মরণোত্তর দেহদানও করেছেন। তাঁর কথায়, ‘যে কদিন বাঁচব টেবিল টেনিস নিয়েই বাঁচব। ব্যাট হাতেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।’