দুর্ধর্ষ ডাকাতের স্মৃতি বয়ে চলেছে রানাঘাটের নাম

চূর্ণি নদীর ধারে তখন নাকি ডাকাতের আস্তানা। সেই ভয়ে সব নৌকো যেত দলবদ্ধভাবে। ডাকাত-সর্দারের এমনই দাপট যে তাঁর জন্যেই কালক্রমে অঞ্চলের পুরোনো নামটিও গেল খসে। সেই থেকে ডাকাত-সর্দারের কিংবদন্তী নামের শরীরে নিয়েই বহরে বাড়ছে রানাঘাট। যদিও, সেই নামকরণ নিয়ে আরো অনেক গপ্প রয়েছে। গপ্পরা আসলে ঘিরে আছে গোটা রানাঘাটকেই।
নদীয়া জেলার এই শহর আদতে ঘোর মফস্সল। সামান্য দূরেই বর্ডার। গেদে পেরোলেই বাংলাদেশ। ওপার বাংলা। দেশভাগের পর তাই ছিন্নমূল মানুষদের সবচাইতে বড়ো ঢল চাক্ষুষ করেছিল এই শহরই। রাতারাতি ‘উদ্বাস্তু’ তকমা লেগে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য এখানেই খোলা হয়েছিল ‘কুপার্স ক্যাম্প’। অবশ্য, রানাঘাটও ছিন্নমূল হতে বসেছিল তার আগে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর দু’দিনের জন্য সে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে। তারপর, ফের ভারতে অন্তর্ভুক্তি। তিনদিনের মধ্যে দু’দুবার দেশ-বদল। ইতিহাস মোটে সাদামাটা নয় এই সুপ্রাচীন জনপদের।
রানাঘাট পুরসভার জন্ম ১৮৬৪ সালে। তার দু’বছর আগেই চালু হয়ে গেছে শিয়ালদা-রানাঘাট ট্রেন চলাচল। এই রানাঘাট সংলগ্ন বীরনগর পুরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন কবি নবীনচন্দ্র সেন। পরে এই অঞ্চলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটও হয়েছিলেন তিনি। নবীনচন্দ্র সেনের আমন্ত্রণেই রানাঘাটে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দুই কবির যুগলবন্দিতে সেদিন উত্তাল হয়েছিল এই জনপদ। কৃষ্ণনগরে কর্মরত দীনবন্ধু মিত্রও কাজের সূত্রে আসতেন এই মহকুমা শহরে। রানাঘাটের চারপাশে তখন বিপুল নীলচাষ হত। ফলে, নীলবিদ্রোহেরও অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চল। যে নীলচাষ, নীলচাষিদের যন্ত্রণাকেই ‘নীলদর্পণে’ বুনেছিলেন দীনবন্ধু।
রানাঘাটের ইতিহাস অবশ্য আরো পুরোনো। বয়সে কলকাতার চেয়েও বেশ খানিকটা বড়ো এই শহর। কথিত, আগে নাকি এর নাম ছিল ব্রহ্মডাঙা। অবশ্য, এই আদিনামের সত্যতা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে। সে যাই হোক, চুর্ণি নদীর তীরে এই ব্রহ্মডাঙাতেই নাকি রানা ডাকাতের ডেরা ছিল। সে শ’পাঁচেক বছর আগের কথা। একচারটি দাপট ছিল বটে রানা ডাকাতের। তাঁর ভয়ে যাত্রীবাহী বা পণ্যবাহী-- কোনো নৌকোই একা একা যেত না চুর্ণি নদী দিয়ে। চুর্ণি নদীর ধারে কালিপুজোও করত রানা ডাকাত। তাঁর ভয়েই ব্রহ্মডাঙাকে সবাই ডাকতে শুরু করল রানা ডাকাতের ঘাঁটি বা রানাঘাট নামে। আর এভাবেই, নিজের নাম বদলে ফেলল এই অঞ্চল।
তবে, নামের ধাঁধাঁ কি এত সহজে মেটে। তাই কেউ কেউ বলেন, রানাঘাট নামের মূলে নাকি আসলে রয়েছে ‘রানির স্নানের ঘাট’। নদীয়ার রাজপরিবারের বধূ বা পালচৌধুরী জমিদারদের বধূ অর্থাৎ ‘রানি’-দের স্নানের ঘাট কথাটিই নাকি লোকমুখে হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রানাঘাট’। আবার, এহেন নামের আড়ালে রাজপুত রানাদের অস্তিত্বও খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। সেই রাজপুত রানা-র স্মৃতিই নাকি বহন করছে রানাঘাট নাম।
নামকরণের ইতিহাস নিয়ে এহেন জটিলতায় অবশ্য ভ্রূক্ষেপও নেই রানাঘাটের। সে নিজের ইতিহাসেই মত্ত। নানা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল। এই স্টেশনেই তো একবার নেমেছিলেন খোদ আইনস্টাইন। যদিও, তারপরের অভিজ্ঞতাটি খুব একটা সুখের হয়নি তাঁর। অবাক হচ্ছেন? তার মানে আপনারা বিভূতিভূষণের ‘আইনস্টাইন ও ইন্দুবালা’ গল্পটা পড়েনইনি। শুধু এই গল্প নয়, রানাঘাট স্টেশন থেকে বেরোতেই ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’। এই হোটেলকে ঘিরেই লেখা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উপন্যাস। একসময় রানাঘাটে নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিভূতিভূষণের। ব্রিটিশ আমল থেকেই সংবাদপত্র প্রকাশিত হত এই শহরে। ‘বার্তাবহ’-র সম্পাদক ছিলেন কবি গিরিজানাথ মুখোপাধ্যায়। এই পত্রিকার অফিসেও সাহিত্যের আড্ডা জমাতে আসতেন বিভূতিভূষণ। এইসব আসা-যাওয়া-আড্ডারই ফসল ঐ গল্প-উপন্যাস।
রানাঘাটে এসেছিলেন নজরুল ইসলামও। সে অবশ্য স্বদেশি আন্দোলনের প্রয়োজনে। স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বারবার উত্তাল হয়েছে রানাঘাট। অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবীদেরও অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই মফস্সল। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম চরিত্র, মাস্টারদার সহযোগী বিপ্লবী সহায়রাম দাস রানাঘাটেরই ভূমিসন্তান। দ্বীপান্তর হয়েছিল তাঁর। এছাড়াও শিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিশিরকুমার বসু, কেশবচন্দ্র মিত্র, মহম্মদ হবিবুল্লহ, মহম্মদ কালু শেখ, শ্রীধর মুখোপাধ্যায়ের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও ঠিকানা এই শহরই।
সাহিত্য-গান-সংস্কৃতিতেও রানাঘাটের ঐতিহ্য বেশ জোরালো। এশিয়ার প্রথম ‘রবীন্দ্র ভবন’ তৈরি হয়েছিল এখানেই। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে স্থানীয় মানুষরা মিলেই গড়ে তুলেছিলেন ‘রবীন্দ্র ভবন’। এখান থেকে প্রকাশিত হত একাধিক পত্র-পত্রিকা। এই রানাঘাটেই বেড়ে উঠেছেন কবি জয় গোস্বামী। তাঁর প্রথম পর্যায়ের কবিতাগুলির জন্ম-সাক্ষী এই ছোটো শহর।
অনেকেই হয়তো জানেন না, বিষ্ণুপুরের মতো রানাঘটেরও নিজস্ব সঙ্গীত ঘরানা রয়েছে। এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বন্নে খাঁ, বড়ে দুন্নি খাঁ, রমজান খাঁ, শ্রীজান বাঈ-এর পাশাপাশি যদু ভট্টের কাছ থেকেও তিনি ধ্রুপদের শিক্ষা নিয়েছিলেন। কালক্রমে, একটি নিজস্ব ঘরানার জন্ম দেন নগেন্দ্রনাথ। যে ঘরানার সবচাইতে উজ্জ্বল শিল্পী শিবকুমার চট্টোপাধ্যায়। ‘গুলিনদা’ নামেই অবশ্য তাঁর বেশি পরিচিতি।
এই রানাঘাটের অন্যতম ঐতিহ্যশালী বংশ ‘পালচৌধুরী’-রা। আড়াইশো বছরেরও বেশি আগে কৃষ্ণ পন্থী অতি দরিদ্র অবস্থা থেকে হয়ে উঠেছিলেন বিরাট ব্যবসায়ী। দান-ধ্যান-সেবায় তাঁর খ্যাতি পৌঁছে গেছিল দূর-দূরান্তরে। তিনি ‘পালচৌধুরী’ উপাধি পান। সেই থেকেই পালচৌধুরী জমিদার বংশের সূচনা। জমিদার বাড়িটি দেখার মতো। স্কটিশ স্থাপত্যে তিনশোরও বেশি ঘর নিয়ে তৈরি বিশাল ইমারৎ। ভিতরে টেরাকোটার মন্দির।
কৃষ্ণনগরের সরভাজা যেমন বিখ্যাত, তেমনই রানাঘাটের পান্তুয়াও কম যায় না স্বাদে। জগু ময়রার পান্তুয়া তো বিখ্যাত। এই রানাঘাটেই একত্র সহাবস্থান শাক্ত-বৈষ্ণব-সুফি-খ্রিস্টানদের। সিদ্ধেশ্বরী কালিমন্দির, গির্জা সবই আছে রানাঘাটে। লোকায়ত ধর্মাবলম্বী মানুষদের দেখাও মিলবে। আর আছে, শহর থেকে দু’পা বেরোলেই ফুলের চাষ।
কলকাতা থেকে ৭৪ কিলোমিটার দূরে এইসব নিয়েই দিব্বি আছে রানাঘাট। চুর্ণি নদীর জলে ভেসে আসে ওপার বাংলার ঢেউ। স্টেশনে ট্রেন বারবার উগড়ে দেয় হাজারো মানুষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মফস্সলও বদলাচ্ছে, নিজের চরিত্র হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। তত আরো বেশি করে স্মৃতিকাতর হচ্ছেন বয়স্করা। তবু, এখনো রানাঘাট নিজেকে ফুরিয়ে ফেলেনি। সে নিজের গল্প আজো বুনতে জানে। কবি মৃদুল দাশগুপ্ত যথার্থ লিখেছেন-
“ছোট্ট শহর রানাঘাটে
মানুষ যেন চন্দ্রে হাঁটে
তাদের দেখে সেলাম ঠোকে হিমালয়ের চূড়া।”
তথ্যসূত্রঃ ‘বহু ইতিহাসের সাক্ষী রানাঘাট’, সৌমিত্র সিকদার, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ অক্টোবর, ২০১৪; ফুল ফল মফস্সল, মৃদুল দাশগুপ্ত, রোববার, প্রতিদিন, ১৫ অক্টোবর, ২০১৭।