অভাবের হার্ডল টপকেই ‘সোনার মেয়ে’ স্বপ্না

জলপাইগুড়ির পাহাড়পুর। পাতকাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের ভিতরে এক-কাঠা জমিতে একচিলতে কুঁড়েঘর। সেখানেই মাথা গুঁজে ছ-ছটা মানুষের বাস। নিজেদের জমি নয়। সেনপরিবারের জমিতে আধিয়ার হিসেবে থাকা। পঞ্চানন বর্মণ ভ্যান-চালক, স্ত্রী বাসনা কাজ করেন চা বাগানে। চার সন্তান। সবার ছোট মেয়েটি সবচাইতে দুরন্ত। খেলাধুলোর প্রতি বড়ো ঝোঁক। দৌড়োয় খুব জোরে। লাফায়ও দারুণ। সারাদিন লাফালাফি-ঝাঁপাঝাঁপি লেগেই আছে। তার সঙ্গে দৌড়ে হেরে ভূত হয়ে যায় ছেলেরাও, এমনকি দাদা অসিতও। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসার। তবু, ছোট মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন স্বামী-স্ত্রী। চান মেয়ে অ্যাথলেটিক্স নিয়ে মেতে থাক। বড়ো হোক। তাই, বাড়িতেই বাঁশের কঞ্চি বেঁধে মেয়েকে হাইজাম্প প্র্যাকটিস করান পঞ্চানন। আর বাসনা, চা বাগানের কাজ থেকে ফিরে সাইকেল চালিয়ে মেয়েকে নিয়ে যান ১৩ কিমি দূরে জলপাইগুড়ির ‘স্পোর্টস কমপ্লেক্সের’ খেলার মাঠে। মেয়েকে ঘিরে পরিবারের সবারই তখন একটাই স্বপ্ন, যেন আকাশ ছোঁয় মেয়েটা। অভাবের হার্ডলে যেন পা আটকে না যায় শেষ ল্যাপে।
মেয়েটির নাম যে স্বপ্না বর্মণ তা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন পাঠক। আমাদের ‘সোনার মেয়ে’। এশিয়াডের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্ট হেপ্টাথলনে সোনা জিতেছেন স্বপ্না। লাফিয়ে ডিঙিয়ে গিয়েছেন বাড়ির সামনে জমে থাকা অকুলান কাদা-জল, ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত না-পাওয়াকে ভারী শটপাটে ভরে ছুঁড়েছেন অনেক দূরে, দৌড়ে পেরিয়ে গেছেন অভাবের চোরাবালি-ফাঁদ, শারীরিক ব্যথা-অপমান-যন্ত্রণা। স্বপ্নাদের জেতা কখনোই নিছক একটা জেতা হয় না। স্বপ্না আসলে অনেকগুলো সোনা পেয়েছেন। হেপ্টাথলনের মতোই অসংখ্য ইভেন্ট মিশে আছে এই জয়ের ভিতর। তবে, পার্থক্য একটাই—ইভেন্টগুলি খেলার নয়। জীবনের।
স্বাভাবিকভাবেই, স্বপ্নার বাড়িতে খুশির জোয়ার। ছেলেবেলায় বোনের কাছে হেরে যাওয়ার গল্প বলতে বলতেও আজ গর্বে গলা বুজে আসছে দাদা অসিতের। মেয়ের সোনা পাওয়ার মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বাসনা। অসুস্থ পঞ্চাননের আবেগও বাঁধ মানছে না। রাতারাতি যেন পৃথিবীটাই বদলে গেছে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই পরিবারের। আজ হয়তো দেশের সবাই জানতে চাইবেন তাঁদের লড়াইয়ের কথা, অভাবের কথা, যন্ত্রণার কথা। ক্যামেরার মুখ এতদিন পরে ঘুরবে তাঁদের দিকে। জানতে চাইবেন, কীভাবে চোয়াল চেপে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন স্বপ্না! ইতিমধ্যেই ছেঁকে ধরেছেন সাংবাদিকেরা। এবং, এই ‘অত্যাচারে’ আজ এতটুকু ক্লান্ত বা বিরক্ত নন পঞ্চানন-অসিত-বাসনারা।
বোনের সোনা পাওয়ার পরই জলপাইগুড়ি শহরে ছুটে গেছিলেন দাদা অসিত। সেখানে মিষ্টি বিলি করেছেন আনন্দে। শহর থেকেই কিনে এনেছেন বাজি। ফোনে অবশ্য স্বপ্না বারণ করেছেন বেশি বাজি ফাটাতে। গোটা গ্রামেই আনন্দের ঢল নেমেছে। মানুষে-মানুষে ছয়লাপ ছোট্ট টিনের চালা-ঘেরা ঘরটাও। শয্যাশায়ী পঞ্চানন এই অবস্থাতেও অনেকের মুখে মিষ্টি পুরে দিয়েছেন। চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়েটিকে ঘিরে তাঁর প্রত্যাশা আজ সফল। বাসনাদেবীর ঘোর কাটছে না। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে, পায়ের জুতো না মেলার বিষয় নিয়ে স্বপ্নার দিনের পর দিন সমস্যায় ভোগার কথা। তাঁর পায়ে ছয়টি আঙুল। পড়তেন কালিয়াগঞ্জ স্কুলে। সেখানে স্কুলের শিক্ষকদেরও তাঁর ছয়-আঙুলের জন্য জুতোর খোঁজ করতে গিয়ে এক সময় বেশ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। চাঁদা তুলে বিশেষ অর্ডার দিয়ে জুতো বানাতে হয়। প্লাসটার অব প্যারিসে মেয়ের সেই পায়েরই একটা ছাপ নিয়ে রেখেছিলেন বাসনা। সেটা আজ ফের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন। এভাবেই যেন মেয়েকে আদরের ছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে তাঁর।
হাঁটু ও কোমরের চোটের জন্য এশিয়াডে যাওয়াই একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল স্বপ্নার। ইভেন্টের ফাইনালের দিনও মুখে অসহ্য যন্ত্রণা। তারপরেও সোনা। অসিত বলছিলেন, বোনের জেদ আর সমর্পণের কথা। “ওকে ছোটবেলায় দেখেছি মা বারবার ভাত খাওয়ার জন্য ডাকছেন। ওর সেদিকে নজর নেই। ওর নজর শুধু খেলার দিকে।” এই সমর্পণের প্রতিদান ফিরিয়ে দিয়েছে স্বপ্নার সর্বস্ব জুড়ে থাকা অ্যাথলেটিক্সও।
রাজমিস্ত্রি ভাইয়ের সামান্য রোজগার ছাড়া পরিবারের অর্থের সংস্থান বলতে ছিল স্বপ্নার কাছ থেকে আসা টাকাই। এই সাফল্যের পর মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন দশ লক্ষ টাকা পুরস্কার। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চাকরিরও। হয়তো অভাবের অন্ধকার ঘুচবে এবার। কিন্তু, তা নিয়ে পরিবারের কেউই বিশেষ ভাবিত নন। অভাব, নিরাপত্তাহীনতার মাটি থেকেই তো স্বপ্নের উড়ান দিয়েছেন স্বপ্না। তাহলে আর ভয় কি!
বরং, স্বপ্নের আকাশটাকে আরও খানিক উঁচু করে নেওয়ার কথা ভাবছেন সকলে। এবার লক্ষ্য অলিম্পিক।