কলকাতার বুকে এই প্রথম অভিনব ‘পেন মহোৎসব’

কথায় বলে “শখের প্রাণ গড়ের মাঠ”, সে কথাই যেন চোখের সামনে প্রমাণিত হল। নিমেষের মধ্যে পকেট থেকে চেকবই বের করে, লাখ খানেক টাকার একটি চেক লিখে ফেললেন একজন। তারপর আর কি! সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটি প্যাকিং বাক্সে ভরে হাতে ঝুলিয়ে নিলেন। মুহুর্তের মধ্যে কিনে ফেলা এই দামী জিনিসটা কী, সেটা শুনলে হয়তো অনেকেই চমকে যাবেন। জিনিসটি হল একটি পেন। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে একটি পেনের দাম এক লক্ষ টাকা, তাও আবার খোদ কলকাতার বুকে।
আজকের বহুল প্রচলিত ইংরেজি পেন (Pen) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ পেন্না (Penna) থেকে, যার অর্থ হল সেই পাখির পালক। সেকালের পালকের কলম ব্যবহার থেকেই এরকম নামকরণ হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
ময়দান মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে বামদিকে হো চি মিন সরণি দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে শেষ প্রান্তে আমেরিকান দূতাবাস অফিসের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে আইসিসিআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস্)-এর অফিস। গত ১৫, ১৬ এবং ১৭ এপ্রিল এখানেই হয়ে গেল এক অভিনব উৎসব। পেন উৎসব। গেটের বাইরে হোর্ডিং-এ বড়ো করে লেখা পেন উৎসবের যাবতীয় বিবরণ। ভিতরে ঢুকে লিফটে করে চারতলায় একটি সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এই অসাধারণ প্রদর্শনী। ছিল বিনামূল্যে প্রবেশ করার সুযোগ।
কথায় বলে, বাঙালি বাঁচে নস্টালজিয়ায়। সে কোনও ব্যক্তিমানুষকে নিয়েই হোক, বা কোনও জিনিস। মাঝেই মাঝেই শোনা যায় ‘আহা! সেই দিনগুলো কেমন ছিল!’ সেরকমই একটি নস্টালজিয়া হল ফাউন্টেন পেন। এখনও অনেকে আঁকড়ে ধরে থাকেন এই পেন। সে ব্যবহারেই হোক, অথবা সংগ্রহে রাখতে। শুধু বাঙালি নয়, পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যেও ঝর্না কলম নিয়ে আবেগকে খানিকটা উস্কে দিতেই এই পেন উৎসবের আয়োজন করেন কিশলয় ইভেন্টস এন্ড অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এবং সহযোগিতায় ছিল কলকাতার “পেন ক্লাব”।
এবছর নববর্ষের দিন উদ্বোধন হয় উৎসবের। এদিন এই পেন মহোৎসবে উপস্থিত ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড: সুরঞ্জন দাস, জাস্টিস শুভ্র কমল মুখার্জি, ইনস্টিউট অফ ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিস এন্ড রিসার্চ-এর ডিরেক্টর ড: স্বাতী গুহ, ফুটবলার হোসেন মুস্তাফি, নাসির আহমেদ, ড্যান্স থেরাপিস্ট নুপুর মুখার্জী, অভিনেত্রী সিমিকা রায়, মিউজিক ডিরেক্টর অভিজিৎ মন্ডল, মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী ইমন-এর কর্ণধার অনিন্দিতা সাহা প্রমুখ।
সময়টা প্রযুক্তির হলেও, মানুষের আবেগের সঙ্গে কোনো আপোষ চলে না। আজকের কম্পিউটারের যুগে দাঁড়িয়ে যখন লেখার বদলে আমরা টাইপ করে বেশি অভ্যস্ত তখন যদি খানিক পিছনে ফিরে তাকাই নজরে পড়ে এক অন্য রকম ইতিহাসের দিকে। কলমের ইতিহাস প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরানো। ধারণা করা হয়, প্রাচীন মিশরীয়রা সর্বপ্রথম কলম ব্যবহার শুরু করে। সে সময় কলম হিসেবে তারা ব্যবহার করত নলখাগড়া, শর বা বেণু, বাঁশের কঞ্চি অথবা ফাঁপা খন্ড। কালি বিভিন্ন গাছের রস এবং বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা প্রস্তুত করা হত । পাঁচের শতক থেকে কঞ্চি বা নলখাগড়ার জায়গা দখল করে পাখির পালক।
আজকের বহুল প্রচলিত ইংরেজি পেন (Pen) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ পেন্না (Penna) থেকে, যার অর্থ হল সেই পাখির পালক। সেকালের পালকের কলম ব্যবহার থেকেই এরকম নামকরণ হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আমাদের দেশে পুরোনো দিনে ছিল খাগের কলম। এখন অবশ্য কেবল সরস্বতী পুজোয় দেখা যায় খাগের কলম। পরে ওয়াটারম্যানের আধুনিক ফাউন্টেন আবিষ্কারের পর পৃথিবীর জুড়ে ফাউন্টেন পেনের ব্যবহার এবং তৈরি শুরু হয়।
এই “পেন মহোৎসব”-এ শেফার্স, পার্কার, পাইলট, ভিসকন্টি, কাওয়েকো, মঁ ব্লাঁ, ওয়াটারম্যান, পাইলট, সেইলর, অরোরা, পেলিকান, — নানা বিদেশি কলম যেমন ছিল, তেমনি ছিল ক্লিক, আসা, ম্যা গনা কার্টা, গামা, রঙ্গা, কানরাইট ইত্যাদি দেশি কলমের সংগ্রহও।
এ হেন কালি এবং কলমের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আজকের নয়। তবে আশির দশক থেকে কালি–কলমের বদলে বীরো সাহেব ( ল্যা জলো বীরো) -এর তৈরি ডট অর্থাৎ বল পেন জায়গা নিল বাঙালির ঘরে ঘরে। কালি, দোয়াত, কলমের বদলে রংবেরঙের ইউজ অ্যান্ড থ্রো পেন অথবা নিদেনপক্ষে জেল পেন হয়ে উঠল লেখার অন্যতম মাধ্যম। হাতেগোনা কয়েকজন কলমচি ছাড়া প্রায় সবাই পুরনো কালি–কলম তুলে রাখলেন দেরাজে। সস্তার বাজার চলতি বল পেন এসে ঝর্ণা কলমকে সরিয়ে দিল ঠিকই, তবে আভিজাত্য রয়ে গেল একই রকম অটুট। আজকের ইউজ অ্যান্ড থ্রো -এর যুগে রোজনামচা থেকে হারিয়ে গেলেও আবেগ থেকে হারায়নি তারা। তিনদিনের পেন মহোৎসবে অজস্র মানুষের ভিড় যেন সেকথাই আবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের, জানান দেয় জৌলুসে, মেজাজে আজও একই রকম সাবলীল ঝর্ণা কলম।
কলকাতার বুকে মানুষের কালি কলমের এই চিরাচরিত আবেগ নিয়েই কাজ করছে “পেন ক্লাব”। এই মহোৎসবের ভাবনাও এসেছে সেই থেকেই। আজ প্রায় তিন বছর হল পথচলা শুরু করেছে পেন ক্লাব। কলেজস্ট্রিট চত্বরে এস.এস.এনট্রারপ্রাইজের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে দোকান রয়েছে পেন ক্লাবের। ক্লাবের সংগ্রহে রয়েছে বহু ভিন্টেজ কলম। পেন ক্লাবের সদস্য শিব নাথ জানান, “এই উৎসবে ২২টা দুষ্প্রাপ্য পেন সংগ্রাহক-দল এসেছে নিজেদের পসরা নিয়ে। ৫০০ টাকা দামের কলম থেকে শুরু করে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দামের কলম রয়েছে এখানে। শুধু রয়েছে বললে ভুল হবে বিক্রিও হয়েছে।”
এই “পেন মহোৎসব”-এ শেফার্স, পার্কার, পাইলট, ভিসকন্টি, কাওয়েকো, মঁ ব্লাঁ, ওয়াটারম্যান, পাইলট, সেইলর, অরোরা, পেলিকান, — নানা ধরনের বিদেশি কলম যেমন ছিল, তেমনি ছিল ক্লিক, আসা, ম্যা গনা কার্টা, গামা, রঙ্গা, কানরাইট ইত্যাদি দেশি কলমের সংগ্রহও। রয়েছে বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত সুলেখা কালির ঐতিহ্যবাহী মেল বন্ধনের কথাও। শুধু যে পেন বিক্রি কিংবা প্রদর্শনী হয়েছে তাই নয়, পাশাপাশি এই উৎসবে ছিল, পেন তথা লেখনীর সঙ্গে সম্পর্কিত নানান সামগ্রী। ছিল বিভিন্ন রকমের অভিনব ডাইরি, পেন কেস, পেন রাখার বাক্স, ব্যাগ ইত্যাদি। একটি টেবিলে আবার ছিল বিভিন্ন রঙিন পেন্সিল, মার্কার পেন, রঙ, হাইলাইটার ইত্যাদিও। সবমিলিয়ে এ যেন এক ছাদের তলায় লেখালিখি আর আঁকাআঁকির সম্ভার।
কিশলয় ইভেন্টস-এর পক্ষ থেকে প্রসেনজিৎ গুছাইত জানান, “যেহেতু এ ধরনের উৎসব কলকাতায় এই প্রথম তাই প্রাথমিকভাবে অনুষ্ঠানের ধারণা পেন ক্লাবের পক্ষ থেকে হলেও, কলকাতার বুকে এরকম একটা সফল উৎসব আয়োজনের জন্য প্রয়োজন ছিল পেন ক্লাব এবং কিশলয় ইভেন্টস-এর যৌথ উদ্যোগ।”
অনুষ্ঠানের অন্য একজন আয়োজক সুব্রত দাসের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে অন্য একটি দিকও। তিনি বলেন, “দেখুন শুধু লেখার জন্য তো কেউ এই ধরণের পেন কেনেন না, ঘরের শোকেসে সাজিয়ে রাখার জন্যও কেনেন। একটা দুষ্প্রাপ্য ফাউন্টেন পেন দিয়ে কাউকে এক লাইন লিখে দিলেও তার মধ্যে ভালোবাসা, প্রাপ্তি তৈরি হয় সেই অনুভুতিটারই দাম আসলে অমূল্য।”
আজকের গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর যুগে দাঁড়িয়ে দূষণ যখন গ্রাস করছে সভ্যতাকে ঠিক তখনই যেন আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কালি কলমের ব্যবহার। আমাদের ব্যবহারের তালিকায় আজকাল যেসব পেন রয়েছে তার বেশিরভাগই প্লাস্টিকের তৈরি। ব্যবহার তারপর বর্জন, ব্যাস প্লাস্টিক দূষণ আর আটকায় কে! ঝর্ণা কলমে কালি ভরে বহুবার ব্যবহার করা যায় পাশাপাশি এগুলি ধাতব হওয়ায় দূষণের সম্ভাবনাও নেই। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির দিকটাও তুলে ধরছেন আয়োজকরা।
পরিশেষে একথা বলতেই হয়, আজকের এই যান্ত্রিক সময় দাঁড়িয়ে আইসিসিআর এই উৎসব যেন মানুষের শৌখিন সত্ত্বাকে বারবার উস্কে দিয়ে যায়। সুযোগ করে দেয় বিবিধ ভিন্টেজ কলম একেবারে হাতে কলমে ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের। শুধু তাই নয়, কত শত ঘটনার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে যে কলমে, সেই কলমগুলিই যে এখন ইতিহাসের অংশ তাই যেন ধরা থাকলো তিনদিনব্যাপী কলকাতার পেন মহোৎসবে।
ছবি সৌজন্যে – কঙ্কনা মুখার্জী