No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    প্রবাসের পুজো : জার্মানিতে গুগল ম্যাপে দেওয়া প্রথম দুর্গাপুজো

    প্রবাসের পুজো : জার্মানিতে গুগল ম্যাপে দেওয়া প্রথম দুর্গাপুজো

    Story image

    “ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে...” 

    মান্না দে তাঁর প্রিয় গায়ক। জন্ম ও কর্মসূত্রে তিনি সত্যিই মহাসিন্ধুর ওপারেরই বাসিন্দা। জার্মানির স্টুটগার্ট শহরের বাসিন্দা তিমিরকান্তি গাঙ্গুলি রীতিমতো দুর্গাপুজো নিয়ে আর পাঁচটা বাঙালির মতো উদ্বেল হয়ে ওঠেন। প্রবাসের পুজো বলতে যা বোঝায়, তাঁর কাছে বাড়ির পুজোটা তার থেকে আলাদাই। কারণ, তিনি কলকাতার পুজো মাত্র একবারই দেখেছেন। ১৯৯৭ সালে কলকাতায় পুজোর সময় না এলে হয়তো সেটাও দেখা হত না।

    গ্রীষ্মের ছুটি পড়লে কলকাতায় আসতেন প্রায় প্রতি বছর। সেটা পুজোর আগে আগে। ফলে কলকাতার আকাশে বাতাসে তখন পুজো পুজো গন্ধ লেগে আছে। তিমিরকান্তি গাঙ্গুলি সেই গন্ধ প্রবলভাবে অনুভব করে ফিরে যেতেন নিজের শহরে। ফেরার সময় পুজোর ক্যাসেট সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন প্রচুর। তাও সে অনেক কাল হয়ে গেছে। ক্যাসেটই এখন হারিয়ে গেছে। পুজোর গানের চলও উঠতে বসেছে কলকাতায়। এসব কিছুই জানেন না তিমির। তাঁর ভালো লাগে বাংলা গান, আজও নিজের শহরে গাড়িতে উঠে অনলাইন বাংলা রেডিও চ্যানেল শোনেন। ওয়েস্টার্ন মিউজিক একদমই শুনতে পারেন না। তিমিরের ছয় বছরের কন্যার মধ্যে যাতে ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাই তাকেও তিমির বাংলা গানই শোনান।      

    এসব কথা হচ্ছিল হোয়াটসঅ্যাপ কলে। দুর্গাপুজো আর কলকাতার কথা শুনতে শুনতে আবিষ্কার করলাম আস্ত বাংলাপ্রেমী এক প্রবাসী বাঙালিকে। তিমিরকান্তির সঙ্গে কথা বলতে বলতেই জানলাম, সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে যে অচিনপুরী, কলকাতা থেকে অনেক দূরের যে ইউরোপ, সেখানে হয়তো আমাদের চেনা-অচেনা মানুষেরা থাকেন। কথায় বলে প্রবাস। কিন্তু প্রবাসেও জাতিসত্তা ভুলে থাকতে পারেননি তিমিরকান্তির বাবা, তুষারকান্তি গাঙ্গুলি। বাংলা ছেড়ে জার্মানির স্টুটগার্টে বাস তাঁর সেই কবে থেকে। ১৯৫৯ থেকে তিনি জার্মানির বাসিন্দা। তারপরে ওখানেই রয়ে যান। আর দেশে ফেরা হয়নি। কলকাতা আর তার জাঁকজমক তিনি কি মিস করতেন না? সেই উত্তর পাওয়া গেল ১৯৯৫ সালে। কয়েকজন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে শুরু করলেন স্টুটগার্টের একমাত্র দুর্গাপুজোটি। আজ ২০২১ সালেও সেই পুজো হয়ে আসছে নিয়মনীতি মেনে। মার্সিডিজ বেনজ-এর ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তুষারকান্তি গাঙ্গুলি। তাঁর বয়স এখন চুরাশির কাছাকাছি। দায়িত্ব তাই তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের। সাতাশতম বছরের পুজো নিয়ে এবারও খানিক করোনাবিধি নিয়ে চিন্তিত বর্তমান প্রজন্মের তিমিরকান্তি গাঙ্গুলি।

    পেশায় আইটি কর্মী তিমির। ১৯৯৫ সালে যখন সারা পৃথিবী জুড়ে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের রমরমা হয়নি, মানুষ স্মার্ট ফোন, সেলফি বা সোশ্যালমিডিয়া জানত না। তখন কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র হওয়ার সুবাদে তিমিরকান্তি তৈরি করে ফেলছিলেন বাড়ির দুর্গাপুজোর ওয়েবসাইট। গুগল ম্যাপে দিয়েও দিয়েছিলেন সেটা। ফলে জার্মানির তো বটেই, এমনকি পড়শি দেশ পোল্যান্ড, রোমানিয়া, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড থেকেও সবাই ম্যাপ দেখে দেখে দুর্গাপুজো দেখতে আসত। এই পুজো দেখে উৎসাহী হয়ে সুইজারল্যাল্ডের বাঙালিরা আবার পুজো শুরু করল।

    এই দুর্গাপুজো জার্মানির প্রথম পুজো নয়। এবার ৪৭তম বছরে পা দিয়েছে বার্লিনের প্রথম পুজো, ৪২-এ পড়ল ফ্রাঙ্কফুর্ট আদি সার্বজনীন পুজো। তাদের থেকে হয়তো কমদিনই শুরু হয়েছে তিমিরদের স্টুটগার্ট অ্যাসোসিয়েশনের দু্র্গাপুজো। তবে প্রথমবার কেউ এমন করে ইন্টারনেটে দুর্গাকে দেশ-কাল–সীমানার গণ্ডির বাইরে ছড়িয়ে দিল। এমনকি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনীকেও অনলাইনে প্রবাসী বাঙালিদের শোনানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে কলকাতার পুজো দেখে কী মনে হয়েছিল? তিমির বলেন, “সেই প্রথম কলকাতায় পুজো দেখা। বাবা-মা কতদিন কলকাতার পুজো দেখেননি, তাই আমি ভিডিও রেকর্ডিং করে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

    ১৯৯৫ সালে কলকাতা থেকে যে প্রতিমা গিয়েছিল, সেই প্রতিমাই প্রতিবছর পুজো পায়। মাঝেমাঝে প্রতিমা রং করে নতুন হয়ে ওঠে। গাঙ্গুলিবাড়ির বেসমেন্টে প্রতিমা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। পুজো এলে তাঁর ডাক পড়ে অকালবোধনের জন্য পুজোমণ্ডপে। প্রতিবছর পুজোর জন্য পুরোহিত আসেন দূর দূর থেকে। প্রথম পুজোর পুরোহিত এসেছিলেন লন্ডন থেকে। বাংলার বাঁকুড়া, মহিষাদল থেকে পুরোহিত এসে পুজো করেছেন। ২০১৯ সাল অবধি নানা জায়গা থেকে পুরোহিত এসে পুজো করেছেন। এমনকি ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কার সিংহলি পুরোহিতও পুজো করেছেন। করোনার জন্য বাদ সেধেছে তাতে। সাত জনের বেশি সমবেত হতে পারবেন না। তাই এবার বড়ো হল বুক করার দরকার নেই বলে মনে করছেন তিনি। বাড়িতেই পুজো হবে এবার। পুজোয় তিমিরের মা রীতা গাঙ্গুলির আয়োজনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাবতীয় সাজসজ্জা, ভোগরান্না সবটাই তাঁর নির্দেশেই হয়। আর সঙ্গে থাকেন তিমিরের স্ত্রী অরিত্রা গাঙ্গুলি। যে এক এলাহি ব্যাপার, কলাগাছ, তুলসীপাতা থেকে বেল পাতা সবটাই ওই প্রবাসের মাটিতেই আয়োজন করার ঝক্কি তারা ভাগ করে নেন। আগে এসব দেশ থেকে যেত, এবার ভারতীয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে অর্ডার করা হয়েছে।

    দুর্গাপুজো শুধু একটা উৎসব নয়, একটা প্রবল জাতিসত্তারও প্রতীক। দেবী দুর্গার আগমণ উপলক্ষ্যে দশমীর দুপুর অবধি চলে ভোগ খাওয়ার এলাহি আয়োজন। লুচি, ছোলার ডাল, খিচুড়ি, জিরা রাইস, ভেজ রাইস, লাবড়া, আলুর দম, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি- কী নেই তাতে! ২৫তম বর্ষে ফুচকা, ঝালমুড়ির আয়োজনও হয়েছিল।

    ‘ভারত মজলিশ’ বলে একটি সংগঠনের কথা জানা গেল এই সূত্রেই। ৫০ বছর আগে দিপাবলি উদযাপনের আয়োজন করেছিলেন তারা। তুষারকান্তি গাঙ্গুলি এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন। সেই ছোটোবেলায় বাবা মায়ের হাত ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি বজায় রাখতে ইন্দো-জার্মান নাটক, শ্রুতিনাটক করেছেন শিশু তিমির। এখন অবশ্য এমন সংগঠন প্রচুর হয়েছে। মনে তারই রেশ নিয়ে তিমির এগিয়ে চলেছেন দুর্গাপুজোর দায়িত্ব নিয়ে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @