‘আদরে আখরে’-এর শালিনী ঘোষ : বইমেলার ভিন্ন মুখ

আট থেকে আশি, লক্ষাধিক পাঠকের সমাগমে, সুপারহিট রাজ্যবাসীর বাৎসরিক বইপার্বণ। থরে থরে সাজানো রঙ-বেরঙের নতুন বইয়ের মলাট, হালকা মেঠো ধুলো, থিম সং, বাতাসে খাবারের ঘ্রাণ, আর সেলফি গ্যালারিতে উপচে পড়া ভিড় - এসব নিয়েই জমজমাট এবছরের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা (Kolkata International Book Fair)।
বইমেলা মানে শুধুই যে বইয়ের ভান্ডার, তা নয়। আজকাল বইমেলার প্রাঙ্গণে পরিচিত ছক ভাঙছেন অনেকেই। বইমেলা প্রাঙ্গনের ঝিল পাড় ঘেঁষে পর পর রয়েছেন সেই সব মানুষেরাই। সেরকমই একজনের সঙ্গে আলাপ হল। ঝলমলে হাসিমুখের সেই মানুষটির নাম শালিনী ঘোষ (Shalini Ghosh)। প্রায় ছয় বছর হল তিনি অংশগ্রহণ করছেন কলকাতা বইমেলায়। আর সঙ্গে থাকছে ডায়েরি নিয়ে তাঁর অসাধারণ কিছু হাতের কাজ।
“ডায়েরি” শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রোজনামচার গল্প। দৈনন্দিন চর্চা কিংবা শখের লেখালিখি সব কিছু ঘিরেই ডাইরি। তাতে যদি মিশে থাকে হাতের পরশ তবে তার কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ভালোবাসা আর শিল্প দুই মিলেমিশে ডায়েরির রূপ বাড়িয়ে তোলে অনেকটাই।
শালিনী ঘোষের কথায়, “আগে আমি শুধু লিটিল ম্যাগাজিন (Little Magazine) নিয়েই থাকতাম। তারপর ভেবে দেখলাম বাইন্ডিং-এর সমস্ত মেশিন যখন হাতের কাছে আছে তখন ডায়েরি তৈরির কথা ভাবাই যায়।”
দুপুরের রোদ খানিকটা পড়ে এলে বইমেলার খোলা মাঠের স্টলগুলোয় ক্রমশ ভিড় বাড়ে। দেখা গেল সেই সময় লাল, নীল বাটিক কিংবা কলমকারি কাপড়ের মলাটে থরে থরে সাজানো ডায়েরি (Hand Made Diary)। ভিড় করে দেখছেন ক্রেতারা। কোনটার দাম কতো টাকা, তা বলতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন শালিনী ঘোষ।
শালিনী ঘোষ একা নন, সঙ্গে রয়েছেন আরও অনেক বন্ধুই। সকলকে নিয়েই রয়েছে বুটিক ‘আদরে আখরে’। বারাসাতে, নিজেদের হাতে তৈরি করা হয় বুটিকের সমস্ত জিনিস। শালিনী ঘোষের কথায়, “আগে আমি শুধু লিটিল ম্যাগাজিন (Little Magazine) নিয়েই থাকতাম। তারপর ভেবে দেখলাম বাইন্ডিং-এর সমস্ত মেশিন যখন হাতের কাছে আছে তখন ডায়েরি তৈরির কথা ভাবাই যায়।”
রংবেরঙের মোড়কে হরেক রকম হ্যান্ডমেড পেপারের ডায়েরি। কোনোটা ফিতে দিয়ে বাঁধা, কোনোটায় আবার হাতে আঁকা ছবি। দেখলেই শান্তিনিকেতনের ঘরানা চোখের সামনে ধরা দেয়। এই প্রসঙ্গে শালিনী বলেন, “হ্যান্ডমেড পেপারের ডায়েরি আর তাতে কাপড়ের মলাট এই ভাবনা যে কেবল শান্তিনিকেতনের নয়, সে কথা মাথায় রেখেই আমার কলকাতায় এই কাজ শুরু করা। বইমেলায় আমরা মূলত ডায়েরি নিয়ে আসি। এছাড়াও মোট ৩৫ রকমের জিনিস নিয়ে সম্ভার সাজাই। সারাবছর ফেসবুকে এইসবের বিক্রিবাট্টা হয় আমাদের।”
জিজ্ঞেস করলাম, গ্রাহকদের থেকে সাড়া পাচ্ছেন? এ কথার উত্তরে গলায় ছিল ভালোলাগার রেশ। “হাতের কাজের প্রতি বাঙালির টান চিরকালই বেশি। আমাদের ডায়েরি নিয়েও তাই মানুষের প্রচুর উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এইগুলোই তো সাহস জোগায় আমাদের কাজে”, বললেন শালিনী ঘোষ।
জানতে পারলাম, প্রতিবারই বইমেলায় বসা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় টিম ‘আদরে আখরে’-কে (Adore Akhore)। কিন্তু তারাও নাছোড়বান্দা, বছরের এই কটাদিন বইমেলায় তাদের থাকতেই হবে। এই সময়ে প্রতিবছরই এমন অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়, যারা অনেকেই সারাবছর বিভিন্ন জিনিস কেনেন ওঁদের থেকে।
বাঙালির মননে শিল্পের প্রতি আকর্ষণ আজকের নয়। নিত্যনতুন ভাবনা অথবা সাজে ভরপুর থাকে আবেগ। সেই আবেগ নিয়েই কাজ করছেন শালিনীদের মতো অনেকেই। স্বপ্ন বুনছেন নিজের হাতে। পাল্লা দিচ্ছেন আজকের সময়ের সঙ্গে। নতুন ডায়েরির পাতার গন্ধে ভালোবাসার মহল তৈরি করছেন। বাঁধা-ধরা গতের বাইরে বেরিয়ে হয়ে উঠছেন বইমেলার ‘ভিন্ন মুখ’।