No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    দ্য বেঙ্গল স্টোর : বাংলার চিত্রকলা, কারুশিল্প ও বয়নশিল্পের উদযাপন

    দ্য বেঙ্গল স্টোর : বাংলার চিত্রকলা, কারুশিল্প ও বয়নশিল্পের উদযাপন

    Story image

    মাদের বাংলাকে শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। বহু বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির ইতিহাসই বাংলার সবথেকে বড়ো পরিচয়। বৃহত্তর বাংলা তো বটেই, পশ্চিমবাংলার জেলাভিত্তিক শিল্প-সংস্কৃতির কতটুকুই বা আমরা জানি! এই বাংলার প্রতিটি কোণে, প্রতিটি জেলার রয়েছে নিজস্ব গল্প। বেশিরভাগই প্রচারের আলোয় আসে না, থেকে যায় নাগালের বাইরে। কিন্তু, শহর-গ্রাম-ব্লক-পাড়া নির্বিশেষে বাংলার সমস্ত সম্পদ যদি ছোঁয়া যেত পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে! ঠিক এই ভাবনা থেকেই পথ চলা শুরু করেছিল ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ (The Bengal Store)। এটিই ছিল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট, যা বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা সম্পদকে বিশ্বব্যাপী সংগ্রহে রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল। ই-কমার্স সাইটের সঙ্গে এবার দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে গত ৩ মে যাত্রা শুরু করলো দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর প্রথম বিপণি।

    শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বিপণি নয়, মানুষ জন এখানে আসবেন নিজেদের শিকড়ে ফেরার তাগিদে। শিল্পকর্ম ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবেন, আর জানবেন একেকটি শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন গল্পকথা। অভিজ্ঞতার একটা শক্তপোক্ত বন্ধন তৈরি করতে চেয়েছে দ্য বেঙ্গল স্টোর। তাদের কথায় এই ঠিকানা আসলে ঘরে ফেরার সুর।

    স্টোরে ঢুকলেই সাদা দেওয়ালে বড়ো বড়ো করে লেখা তাদের মূল ভাবনা। সেখানে বলা হয়েছে, “বৃহত্তর বাংলার হাতে বোনা শিল্প যেন মাটির গন্ধ বয়ে আনে। দক্ষিণ থেকে উত্তর – মানুষের হস্তশিল্পের মধ্যেই রয়েছে বাংলার জিয়নকাঠি। এই হস্তশিল্পের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে সুদৃঢ় হবে আমাদের আত্মীয়তা, ভালোবাসার বন্ধন। প্রতিটি শিল্পকর্মের গল্পগাথা ছুঁয়ে দেখাও তো একটা আস্ত অভিজ্ঞতা! এমনই এক তাগিদ থেকেই বৃহত্তর বাংলার এই অভিজ্ঞতার সঙ্গী হওয়া।”

    শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বিপণি নয়, মানুষ জন এখানে আসবেন নিজেদের শিকড়ে ফেরার তাগিদে। শিল্পকর্ম ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবেন, আর জানবেন একেকটি শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন গল্পকথা। অভিজ্ঞতার একটা শক্তপোক্ত বন্ধন তৈরি করতে চেয়েছে দ্য বেঙ্গল স্টোর। তাদের কথায় এই ঠিকানা আসলে ঘরে ফেরার সুর।

    হাতে বানানো শিল্প

    দ্য বেঙ্গল স্টোরের যোধপুর পার্কের ঠিকানায় গিয়ে জানা গেল অনেক অজানা কাহিনি। গালা একধরনের প্রাকৃতিক রজন, পাওয়া যায় ‘লাক্ষা’ (Coccus lacca) নামের একধরনের ছোট্ট পোকার থেকে। আগে সিলমোহরের কাজে, বার্ণিশের কাজে, গয়না, পুতুল তৈরিতে ব্যাপক ভাবে গালার ব্যবহার হত। এমনকি শিশুদের চুষিকাঠি তৈরি হতো গালা দিয়ে; অর্থাৎ গালা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর নয়। অধুনা সারা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মাত্র দুজন শিল্পীই ঐতিহ্যবাহী গালা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁদের হাতে বানানো অভিনব সব গালার পুতুল ও গালার অন্যান্য শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করেছে দ্য বেঙ্গল স্টোর। আবার, প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো মজিলপুরের পুতুল তৈরির ইতিহাসও তুলে ধরছে এই বিপণি। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মজিলপুরে আগুন-মাটির ছাঁচে নির্মিত পুতুলগুলির নিজস্ব ইতিহাস ও অতুলনীয় সৌন্দর্য রয়েছে। কিংবদন্তি পুতুলশিল্পী শম্ভু দাসের পৌত্র শিল্পী মন্মথ দাস বর্তমানে এককভাবে তৈরি করে চলেছেন এই মাটির পুতুল।

    মোট কথা, গোটা বাংলার ২৩টি জেলার সেরা সম্ভার এক জায়গায় নিয়ে এসেছে এই বিপণি। বোঙা হাতি, ষষ্ঠী পুতুল, দেবদেবী পুতুল, রানি পুতুল, টেপা পুতুল, ভাগ্যমণি পুতুল (প্লাস্টিকের যুগে যেসব মাটির পুতুল প্রায় হারিয়েই গিয়েছে, সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস), বিভিন্ন জেলার প্রায় লুপ্ত হয়ে যাওয়া হস্তশিল্প, বিরল সব বাংলা বই, প্রিন্ট, পোড়ামাটির কাজ, ডোকরা কাঠের গুঁড়ো দিয়ে বানানো মুখোশ, দিনাজপুর-নকশালবাড়ির কাঠের মুখোশ, কাগজের শিল্পসামগ্রী, শুশুনিয়ার পাথর খোদাই, কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা, ঝুড়ি, মাদুর, দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী ঢোকরা, সাবাই ঘাসের সামগ্রী, সেরামিক্স, সুপারি-আমড়ার আঁটি এবং বাঁশের অংশ দিয়ে বানানো পাখি, বিষ্ণুপুরের লণ্ঠন, পটচিত্র, মেদিনীপুরের পটচিত্র ঘরানার কাণ্ডারি দুখুশ্যাম চিত্রকর-এর দুষ্প্রাপ্য ‘প্রায়শ্চিত্ত পট’, রাজ্যস্তরে পুরস্কারপ্রাপ্ত বেতের হাতি ও বাঁশের অসামান্য কালীমূর্তি – কী নেই সেখানে!

    হাতে বোনা কাপড়

    পরীক্ষা করলে দেখা যাবে আজকাল ‘হ্যান্ডলুম’ বলে যা আমরা কিনি তার অধিকাংশই ভুয়ো। অর্থাৎ, ‘হ্যান্ডলুম’-এর বদলে সস্তায় দেদার বিক্রি হচ্ছে ‘পাওয়ার লুম’ ও কৃত্রিম সুতোয় মেশিনে বোনা কাপড়। সেই জায়গা থেকে ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ ঘোষণা করছে – আগে চিনুন তারপর কিনুন। এই বিপণিতে আপনি সে সুযোগ পাবেন।

    দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর টেক্সটাইল ডিজাইনার শ্যাম বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে চিনে নিতে পারবেন ‘হ্যান্ডলুম’ ও ‘পাওয়ার লুম’-এর তফাৎ। জানতে পারবেন কেন বাংলার বহু তাঁতিঘরে আজ আর মাকুর খটখট শব্দ নেই, নেই টানাপোড়েনের গল্প। কৃত্রিম বা পলিয়েস্টার সুতোয় বোনা কাপড় তাঁতশিল্পের এত বছরের ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি প্রকৃতি বা মানবজীবনেও ডেকে আনছে বিপদ। সেখান থেকে ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর পোশাক পশ্চিমবঙ্গের আদি ও অকৃত্রিম তাঁতশিল্পের পুনরুত্থানের কথা বলছে, বলছে হাতে বোনা তাঁতের ঐতিহ্য। শুধু তাই নয়, বিলুপ্তপ্রায় ‘ন্যাচারাল ডাই’ পদ্ধতি অবলম্বন করেই ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর পোশাক সম্ভার। প্রাকৃতিক উপকরণ বা রঞ্জক ব্যবহার করে কাপড়ে রং করার এই পদ্ধতিকেই আমরা ‘ন্যাচারাল ডাই’ বলি। পেঁয়াজের খোসা, হরতকি, নীল, লোহার গুঁড়ো, ছাই, গাঁদা, গোলাপ, জবা ইত্যাদি সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানেই কাপড় রাঙানো হতো আগে। খাঁটি সুতি, সিল্ক বা উলে দীর্ঘস্থায়ী সেইসব নির্ভেজাল রং। দ্য বেঙ্গল স্টোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা আগামী দিনে সমস্ত পোশাক ন্যাচারাল ডাইয়ের মাধ্যমেই তৈরি করবেন। এছাড়াও রয়েছে, দার্জিলিঙের গ্রামীণ মহিলাদের হাতে বোনা উলের সোয়েটার, মাফলার ও শাল নিয়ে এই স্টোরের নিজস্ব ডিজাইনে আকর্ষণীয় পাহাড়ি সম্ভার। উলের এই বুননশিল্পে উঠে এসেছে তিব্বতী, গোর্খা ও লেপচা সংস্কৃতির রোজনামচা।

    এই বিপণির প্রত্যেকটি শাড়িরই রয়েছে আলাদা আলাদা গল্প। সেসব অত্যন্ত যত্ন নিয়ে শাড়ির সঙ্গে ট্যাগ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ও শেষ নির্মিত ছবি ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘ঘরে বাইরে’-তে চরিত্র সর্বজয়া ও বিমলার পরনে ব্যবহৃত শাড়ির পুনর্নিমাণ ঘটিয়েছেন শিল্পী শ্যাম বিশ্বাস – কুঞ্জলতা পাড়ের শাড়ি (সর্বজয়া) এবং ভেলভেট পাড়ের শাড়ি (বিমলা)। এছাড়াও বাংলার তাঁতিদের হাতে বোনা শাড়ির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কলমিলতা, পাছাপেড়ে, টাঙ্গাইল বেনারসি, ডাকের সাজ, হাজার বুটি, গঙ্গা যমুনা – সম্পূর্ণ সুতির এই প্রত্যেকটি শাড়িই বোনা হয়েছে ৯২X৯২ কাউন্টে। স্টোরের আরেকদিকে রয়েছে শার্ট (পুরুষদের জন্য), সেগুলিও সম্পূর্ণ সুতির এবং হাতে বোনা।

    ভেজালহীন খাবার

    গত কয়েক বছরে বাংলার হস্তশিল্প, হাতে বোনা তাঁত বা ভেষজ খাবারের চাহিদা অনেকটাই বেড়েছে। অনেকেই তাই বাণিজ্যের স্তম্ভ হিসেবে এগুলি বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু, খাবার, পোশাক কেনার সময় বিক্রেতা ঠিক যা যা বলে আপনাকে তাঁর সামগ্রী বিক্রি করেন, আপনি কি যাচাই করে নেন? দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ রয়েছে খাঁটি ঘি, মধু, মশলা, আচার, পাঁপড়, সরষের তেল, গয়না বড়ি, চাল, ডাল, আখের গুড়। চালের মধ্যে রয়েছে কালো-নুনিয়া, চমৎকার, রাধা তিলকের মতো সুগন্ধী চাল। বাজারচলতি ক্ষতিকারক রাসায়নিক মুক্ত এই খাবারগুলি সরাসরি বাংলার চাষিভাইদের হাত থেকে সংগৃহীত এবং NABL স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে পরীক্ষিত।

    এছাড়াও

    বিশিষ্ট ভাস্কর অলোকানন্দা সেনগুপ্ত, শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত, শিল্পী অসীম পালের শিল্পকর্ম ছাড়াও সোমনাথ হোর, যোগেন চৌধুরী, কে.জি সুব্রহ্মণ্যন-এর মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কাজও সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে দ্য বেঙ্গল স্টোরে। আরও যে-দুটি জিনিস দ্য বেঙ্গল স্টোরে চোখ টানছে, সেগুলি হল মুর্শিদাবাদের বালাপোষ এবং খড়োকিস্তি নৌকোর প্রতিলিপি।

    কথিত আছে, অবিভক্ত বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র শীত নিবারণের জন্য জামাই সুজাউদ্দিনের নির্দেশে খলিফা রমজান শেখ তৈরি করেছিলেন তুলোর আবরণ। কার্পাস তুলোকে ঢেকে দেওয়া হল সিল্ক কাপড়ে। নাম দেওয়া হল বালাপোষ। নবাবী আমলে বালাপোষে ব্যবহৃত হত উন্নতমানের কার্পাস তুলো। ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ ফিরিয়ে এনেছে কার্পাস তুলো আর সিল্কের কাপড়ে মোড়া নবাবী-বালাপোষ।

    অন্যদিকে শোন যায়, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার গেঁওখালি অঞ্চলের নৌকো সুন্দরবন থেকে প্রায় ৪০০ কাহন খড় নিয়ে কলকাতায় জোগান দিত৷ কারিগরি কৌশলের নিরিখে বাংলার এই নৌকো অনবদ্য। আজ আর এই নৌকো নেই। বাংলার ‘নৌকো মানব’ হিসাবে পরিচিত প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ড. স্বরূপ ভট্টাচার্য নিজের হাতে প্রতিলিপি পুনর্নির্মাণ করে ফিরিয়ে এনেছেন বাংলার এই নৌকো-ঐতিহ্য। তাঁর বানানো নৌকো শুধুমাত্র দ্য বেঙ্গল স্টোরেই পাওয়া যাচ্ছে।

    বিশিষ্ট কার্টুনশিল্পী উদয় দেব সযত্নে সাজিয়ে তুলেছেন এই বিপণি। চার দেওয়াল জুড়ে বাংলার এইসব হস্তশিল্প, বয়নশিল্প ও কৃষকদের নানান কার্টুন প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে নানাবিধ বাংলা ক্যাচলাইন। এছাড়া রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে উদয় দেবের কিছু কাজও সংগ্রহ করা যাবে এই বিপণি থেকে।

    অর্থাৎ, সারা বাংলার দুর্লভ হস্তশিল্প, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট খাদ্যদ্রব্য, প্রাকৃতিক রঙের পোশাক, হাতে বোনা তাঁত, প্রসাধনী, শিল্পীদের সৃষ্টি করা বিশ্বমানের ছবি, ভাস্কর্য – এক ছাদের নিচেই এবার বাংলার অমূল্য সব সম্পদ। ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ শুধুই একটি বিপণি নয়; বাংলার চিত্রকলা, কারুশিল্প ও বয়নশিল্পের উদযাপন। বাংলার বিরল, হারিয়ে যাওয়া শিল্পের খোঁজ ও প্রতিটি শিল্পকর্মের গল্পগাথার সঙ্গী হওয়া।

    _______ 
    ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর ঠিকানা

    ১২৭, গড়িয়াহাট রোড, যোধপুর পার্ক, কলকাতা ৭০০০৬৮ (সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা/ সোমবার বন্ধ)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @