No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    আট থেকে আশি সকলের হাতেই রং-তুলি, পটশিল্পের আখড়া পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়া গ্রাম

    আট থেকে আশি সকলের হাতেই রং-তুলি, পটশিল্পের আখড়া পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়া গ্রাম

    Story image

    শ্চিম মেদিনীপুর (Paschim Midnapur) জেলার পিংলার (Pingla) কোণ ঘেঁষে ছোটো একটি গ্রাম। নাম নয়া গ্রাম (Naya Village)। এ এমন এক গ্রাম যেখানে শিশুরা ঠিক করে হাঁটতে শেখার আগেই হাতে তুলে নেয় রং-তুলি। এ গ্রাম আক্ষরিক অর্থেই যেন বাংলার শিল্পী-গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির দেওয়ালই যেন কোনো এক অজানা চিত্রকরের খোলা ক্যানভাস। আর বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জাত শিল্পী। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভুরি ভুরি পুরস্কার নিয়ে এসেছেন এই গ্রামের শিল্পীরা, এখনকার নিজস্ব শিল্পরীতি ‘পট চিত্র’-এর (Pata Chitra) মাধ্যমে সারা বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এখনকার শিল্পীরা এই মৃতপ্রায় শিল্পকে সময়ের পরীক্ষায় টিকিয়ে রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিরলসভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এই শিল্পের ধারা। এঁরাই  নয়া গ্রামের লোকশিল্পী, যাঁরা বাংলার অসামান্য লোক-শিল্পের ঐতিহ্যকে পটে সংরক্ষণ করেছেন। এই পটগুলি উন্মোচন করলে চোখের সামনে ধরা দেয় এক নতুন জগত, যে জগতের প্রতিটি ফ্রেমে পটশিল্পীরা তাঁদের আঁকার মাধ্যমে বুনেছেন নানা গল্প। নয়া গ্রাম ভ্রমণ যেন সত্যিই চোখের আরাম।

    প্রতি বছর নভেম্বর মাসে নয়া গ্রামের শিল্পীদের বার্ষিক ‘পট মায়া’ উৎসবে শিল্প, সঙ্গীত এবং নৃত্যানুষ্ঠানে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। এছাড়াও অনুষ্ঠানে থাকে রং-তুলির কাজ করা শাড়ি, শাল, টি-শার্ট এবং ঘর সাজানোর নানান সরঞ্জামের প্রদর্শনী।

    এই গ্রামের প্রতিটি মাটির কুঁড়েঘরের দেওয়ালেই রয়েছে অসাধারণ গাছপালা এবং প্রাণীর ছবি। কোথাও উজ্জ্বল হলুদ রঙের ডোরাকাটা বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার দিকে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে তার উজ্জ্বল লাল জিহ্বা, কোথাও আবার রোদে ঝলমলে গাছপালা, ফুল, কোথাও বা বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে থাকবে পেঁচা সহ অন্যান্য পাখিরা। এ যেন সাধারণ মানুষের মধ্যেই প্রকৃতি এবং শিল্পের অনবদ্য সহাবস্থান। মূলত সাঁওতাল, হোস, মুন্ডা, জুয়াং এবং খেরিয়া উপজাতিদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল এই পটচিত্র। প্রাথমিক পর্যায়ে এরা পূর্বপুরুষ পিলচু হারাম এবং পিলচু বুরহির জন্মবৃত্তান্ত চিত্রিত করতেন। তাঁদের জীবনের কথা, তাঁদের সাত ছেলে এবং সাত মেয়ের কথা, কীভাবে এই সাত ভাইয়ের সঙ্গে সাত বোনের বিয়ে হয়েছিল সেইসব গল্পই ফুটিয়ে তুলতেন তাঁদের পটে। সেসময় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য, বৌদ্ধ রাজা ও সন্ন্যাসীরা পটচিত্রের বহুল ব্যবহার করেছিলেন। ফলে ক্রমেই পটুয়াদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এমনকি এই সময়ে বালি, জাভা, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং তিব্বতের দূরবর্তী উপকূলেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই পটচিত্র। পরবর্তীকালে অবশ্য মুসলিম আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটলে চিত্রশিল্পীরাও ইসলাম অনুসারী হয়ে যান।

    আজও এই প্রাচীন লোকশিল্পটির আঁকার শৈলী, রং, রেখার টান এবং স্থান নির্বাচনের জন্য সারা বিশ্বের শিল্পপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। ‘পট’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘পট্ট’ থেকে, যার অর্থ কাপড়। আর এই পট আঁকেন যেসব চিত্রশিল্পীরা, তাদের বলা হয় পটুয়া। মজার বিষয় হল, পটুয়ারা শুধু যে ছবিই আঁকেন এমন নয়, দর্শকদের সামনে যখন সেই পটটি তুলে ধরেন তখন সঙ্গে বিভিন্ন লোকগানও পরিবেশন করেন। এই গানগুলি ‘পটের গান’ নামে পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী পৌরাণিক কাহিনি এবং উপজাতীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আধুনিক ভারতীয় ইতিহাস এবং সমসাময়িক নানা বিষয় যেমন – বনভূমি সংরক্ষণ এবং এইচআইভি বা এইডসের মতো রোগ প্রতিরোধের বার্তা প্রভৃতি ছড়িয়ে দেন এইসব পটের গানের মাধ্যমে। পটুয়ারা আঁকার ক্ষেত্রে সাধারণত প্রাকৃতিক রং-ই ব্যবহার করেন। বিভিন্ন গাছ, পাতা, ফুল এবং কাদামাটি থেকে সংগ্রহ করেন এই সব রং।

    নয়া গ্রামের মানুষের রক্তে শিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এরা জাতশিল্পী। বর্তমানে এই গ্রামে প্রায় আড়াইশো জন পট-চিত্র শিল্পীর বাস। তাদের বেশিরভাগই নিত্যদিন সকাল থেকে লেগে পড়েন আঁকার কাজে। কেউ মাটির পট, কেউ শাড়ি অথবা গয়নাতে রং তুলির টান দিতে থাকেন। সব থেকে আশাপ্রদ যে বিষয়টি, এই গ্রামের প্রতিটি শিশুও ছোটো বয়স থেকেই শিখে নেয় তুলি টানার পদ্ধতি। এখনকার বহু চিত্রকরই মনু চিত্রকরের মতো আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। মনু চিত্রকর আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক এবং ব্লুজ গায়ক আর্থার ফ্লাওয়ার্স-এর যৌথ সহযোগিতায় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জীবনী ‘আই সি দ্য প্রমিজড ল্যান্ড’ নিয়ে গ্রাফিক-উপন্যাস রচনা করেছেন। মনুর মতো চিত্রকররা হিন্দু এবং ইসলাম উভয় ধর্মেরই রীতিনীতি পালন করে। তাই হিন্দু ও মুসলিম রীতিনীতি প্রায়শই মিলেমিশে যায় এই গ্রামে।

    কলকাতা থেকে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার দূরত্ব। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে নয়া গ্রামের বাসিন্দারা একটি বার্ষিক উৎসবের আয়োজন করেন। এই উৎসবটি ‘পট মায়া’ নামে পরিচিত। ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এবং এখনকার চিত্রকরদের সাফল্য উদযাপন করতে তিন দিনের এই উৎসবে শিল্প, সঙ্গীত এবং নৃত্যানুষ্ঠানে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের প্রদর্শনীতে থাকে রং-তুলির কাজ করা শাড়ি, শাল, টি-শার্ট এবং ঘর সাজানোর নানান সরঞ্জাম যেমন-ল্যাম্পশেড, পর্দা, দেওয়ালে ঝোলানোর বাহারি জিনিস ইত্যাদি। এছাড়াও এই গ্রামে রয়েছে ‘চিত্রতরু’ নামে একটি লোকশিল্প সম্পদ সংরক্ষণকেন্দ্র, যেখানে সারা বছর পটচিত্র চিত্রকর্ম এবং অন্যান্য পণ্য প্রদর্শন করা হয়। শুধু তাই নয়, রয়েছে আলাদা কর্মশালার ব্যবস্থাও। কেউ যদি পটচিত্র অঙ্কন এবং প্রাকৃতিক রং তৈরির কাজ শিখতে চায়, তাহলে শিল্পীরা সাদরে হাতে-কলমে শিখিয়েও দেন সেই কাজ।

    মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @