অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনী ছাড়া আজও অচল বাংলা সাহিত্য পাঠ

আন্তর্জাতিক স্তরে বাঙালির স্বীকৃতি যেমন আমাদের সমৃদ্ধ করে তেমনই বাংলার ভিত গড়তে বাংলার প্রতি বাঙালির অবদানই একমাত্র সম্বল, সেকথাও আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না। শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে বিনোদন অথবা খেলাধুলা, প্রতিভার অভাব বাংলায় কোনোকালেই ছিল না। যুগে যুগে বাঙালির কাজই যে আগামী প্রজন্মকে কলার তোলার সুযোগ করে দেয়, সেকথাও আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না। আজও সেরকমই একটা কলার তোলার দিন। বাঙালি হিসেবে তো বটেই। বাংলা সাহিত্য - এ যেন এক সীমাহীন পরিধি। “বাংলাটা ঠিক আসেনা”-এর যুগেও বাংলা সাহিত্যকে (Bengali Literature) ভালোবাসার মানুষ যে কমতি পড়েনি তা অবশ্য কলেজগুলোর বাংলা বিভাগের রমরমা দেখে ভালোই আঁচ করা যায়। উচ্চমাধ্যমিকের পরই বাংলা নিয়ে পড়তে চাওয়া ছেলে বা মেয়েটির কাছে পুরো বিষয়ের সবটুকু নিয়ে হাজির হন যে মানুষটি, তিনি হলেন অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (Asit Kumar Bandopadhyay) । তাঁর সেই বিখ্যাত বইটির নাম ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’।
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, নয় খণ্ডে প্রকাশিত এই বিশাল কাজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। গবেষণার কাজে এতটুকুও ফাঁকি দেননি তিনি। বাংলা সাহিত্যকে জানতে হলে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটির অপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই।
এমনিতেই কবিতা-প্রবণ জাত বলে বাঙালিদের খানিক ‘বদনাম’ আছে। সেই কবে থেকে এত বিশাল সংখ্যক সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে এই বঙ্গদেশে। এখনও হয়েই চলেছে। সেসবকে একসঙ্গে আনাও তো চাট্টিখানি কথা না! সেই কাজটাই বিংশ শতকে করে গিয়েছিলেন যিনি, সেই অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় খানিক নীরবেই শতবর্ষ পার করে ফেলেছেন দু বছর আগেই। ১৯২০ সালের ৩ জুন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার নকফুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা অক্ষয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা চারুবালা দেবী। যদিও জন্মের বছর পাঁচেক পর থেকেই তার চলে আসা হাওড়া জেলায়। ১৯৩৮ সালে হাওড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ছোটো থেকেই লেখাপড়ায় ছিলেন তুখোড়। রিপন কলেজ থেকে আইএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে বি.এ এবং এম.এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। লেখাপড়ায় ভালো হলেই নাকি রাশভারী, সিরিয়াস গোছের হয় মানুষ, এটাই প্রচলিত ধারণা। তবে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই পথের পথিক ছিলেন না। বাস্তব জীবনে ছিলেন একেবারেই অন্যরকম। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন ছাত্রদরদী, অন্যদিকে তেমনই ছিলেন রসিক। কলেজে পড়ার সময় থেকেই অনুবাদের কাজ করতেন তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর গল্প ‘দেশ’ এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯৪৫ সালে এমএ পাশ করে সেই বছরেই নবদ্বীপে বিদ্যাসাগর কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে হাওড়া গার্লস কলেজ, রিপন কলেজ এবং ১৯৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। হাওড়া গার্লস কলেজে থাকাকালীন তাঁর সহকর্মী ছিলেন স্বয়ং জীবনানন্দ দাশ। তিনি যেমন ছিলেন নিজের পড়াশোনায় সিরিয়াস, তেমনই ছিলেন ছাত্রদরদী। কারোর যদি পয়সার অসুবিধা হত, এগিয়ে আসতেন নিজেই। নিজের বাড়ি থেকে বই দিয়ে দিতেন পড়ার জন্য। ছাত্ররাই যে তাঁর ‘অ্যাসেট’, সে কথা বারবার বলতেন স্বয়ং। ১৯৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন অসিতকুমার। ২০০২ সালে অন্নদাশঙ্কর রায়ের মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, নয় খণ্ডে প্রকাশিত এই বিশাল কাজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। গবেষণার কাজে এতটুকুও ফাঁকি দেননি তিনি। বাংলা সাহিত্যকে জানতে হলে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটির ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অসামান্য গবেষণা কর্মের সবচেয়ে মৌলিক অংশটি পাওয়া যাবে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পর্ব থেকে ঊনিশ শতকের প্রথম পর্ব -- ভারতচন্দ্রের পর থেকে মাইকেলের আগে অবধি বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত পর্বটি নিয়ে। মহা গ্রন্থের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ খণ্ডে প্রায় আড়াই হাজার পাতায় যে তথ্য বিশ্লেষণ ও সাহিত্য বিচারের নিদর্শন তিনি হাজির করেছেন, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা কমই আছে।
তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থগুলি বাংলার নবজাগরণ বিষয়ে রচিত। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ও বাংলা সাহিত্য, বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর, সাহিত্য জিজ্ঞাসায় রবীন্দ্রনাথ হাওড়া শহরের ইতিহাস ইত্যাদি। তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ গল্প শ্রেষ্ঠ লেখক, জীবনের গল্প গল্পের জীবন, সত্যেন্দ্র রচনাবলী, বিদ্যাসাগর রচনাবলী, সঞ্জীব রচনাবলী উল্লেখযোগ্য। ‘স্মৃতি বিস্মৃতির দর্পণে’ নামে তার একটি আত্মকথাও রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতিত্ব করা ছাড়াও তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গবেষক ছিলেন। ১৯৮১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বুদ্ধমহাভাব মহাসম্মেলনে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ সালে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসাবে ভাষণ দেন। চিন্তাবিদ ও গবেষক হিসাবে একাধিক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন অসিতকুমার।
সারাজীবন হাওড়ার বাড়িতেই থেকেছেন তিনি। নিজেই জায়গা নিয়ে যেমন গর্ব ছিল ঠিক তেমনই কলকাতা, হাওড়ার দূষণ নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়তেন না। জীবনটাকে উপভোগ করেছেন প্রাণভরে। বাংলা ভাষাকে লালন করেছিলেন নিজের অন্তরে। তাঁর একমাত্র সম্পদ ছিল তাঁর অজস্র ছাত্রছাত্রীরাই। যারা সর্বক্ষণ আঁকড়ে থাকতেন তাঁদের প্রিয় অধ্যাপককে, তিনিও থাকতেন বইকি! বাঙালিদের এই যে শতবর্ষ উদযাপন নিয়ে এতো মাতামাতি, তা নিয়েও জনসমক্ষে ঠাট্টা করেছেন একাধিকবার। আর তাই বোধ হয় কোনোও এক অলিখিত কারণে তাঁর শতবর্ষ চলে গেল খানিক নীরবেই। আড়ম্বরহীনতা যে তাঁর প্রিয় ছিল, এ যেন তারই উদাহরণ হয়ে রইলো। ২০০৩ সালের ২১ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক হয়ে থাকা অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
তথ্যসূত্র –
১। http://www.milansagar.com/
২। উইকিপিডিয়া
৩। আনন্দবাজার পত্রিকা
৪। www.ba.cpiml.net