বাজারে ভিড় দেখলেই লম্বা একটা কাঁচি দিয়ে ভিড় সরিয়ে দিচ্ছেন রায়গঞ্জের এই শিক্ষক!

মাথার হেলমেটের মধ্যে শিশুদের একটি গেঞ্জি তিনি লাগিয়েছেন। তার সঙ্গে কিছু হাতে বাঁধার রাখি। এমনভাবে সেসব সাজিয়েছেন যে হেলমেটটি মাথায় লাগানোর পর মনে হয় যেন করোনা সচেতনতার প্রচার চলছে। এরকম বিভিন্ন পদ্ধতিতে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে করোনা সচেতনতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন উত্তরদিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ কর্নজোড়ার এক স্কুল শিক্ষক।
শিক্ষকের নাম বিপ্লব কুমার মণ্ডল। তিনি স্থানীয় বাহিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে স্কুল ছুটি। আর এই ছুটির পর্বকে তিনি পুরোপুরি করোনা সচেতনতার ইতিবাচক প্রচারে কাজে লাগিয়েছেন। পেশায় তিনি স্কুল শিক্ষক হলেও আয়ুর্বেদিক ওষুধের চর্চা করা তাঁর একরকম নেশা। তাই নিজের বেতনের টাকা দিয়ে করোনা সচেতনতায় তাঁর বিভিন্নরকম সামাজিক কাজ চলছে।
নিজের হেলমেটটিকে করোনা সচেতনতার বিশেষ মডেল তৈরি করার পাশাপাশি তিনি নিজের হাতে বিভিন্নরকম মাস্ক তৈরি করে তা বিলি করছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। লকডাউন শুরু হওয়ার পর প্রথমে টিস্যু পেপার দিয়ে মাস্ক তৈরি করতে শুরু করেন। তারপর এখন নিজে কাপড় কিনে এনে তা দিয়ে মাস্ক তৈরি করছেন। এর বাইরে আবার চাররকম পদ্ধতিতে স্যানিটাইজারও তৈরি করছেন। একরকম হাইপোক্লোরাইড পাউডার, ফিটকিরি, কর্পূর, ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে তিনি তৈরি করছেন গাড়ির চাকায় স্প্রে করার জন্য স্যানিটাইজার। আবার তুলসি, অ্যালোভেরা, নিম, অলিভ ওয়েল দিয়ে তৈরি করছেন আর একরকম স্যানিটাইজার। তাছাড়া ইথানল, অ্যালকোহল-সহ আরও কিছু সামগ্রী দিয়ে তৈরি করছেন আরও দুরকম স্যানিটাইজার। সেই সব স্যানিটাইজারের কোনোটা আসবাবপত্র, কোনোটা হাতে ব্যবহার করা যাচ্ছে। রায়গঞ্জ কর্নজোড়া মোটর কালিবাড়ি এলাকায় গিয়ে তিনি বাজারের মধ্যে কারও জুতো, কারও হাত বা গাড়ির চাকা স্যানিটাইজ করতে শুরু করছেন। তাঁর এই সামাজিক কাজ দেখে বহু মানুষ খুশি।
আবার বাজার বা অন্যত্র ভিড় দেখলে তিনি উপস্থিত হয়ে যাচ্ছেন বিরাট এক কাঁচি নিয়ে। কাঁচি দিয়ে তিনি কেটে দিচ্ছেন ভিড়। বাঁশের বাতা দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন বিরাট ওই কাঁচি। কাঁচির মাথায় লেখা আছে কিপ সেফ ডিস্টেন্স। বাজার বা অন্যত্র ভিড় দেখলে বিপ্লববাবু সেই ভিড়ের সামনে গিয়ে কাঁচি খুলে দিচ্ছেন। আর তখন বড়ো করে বেরিয়ে আসছে সেই লেখা, কিপ সেফ ডিস্টেন্স। সেই লেখা পড়ে ভিড়ের মধ্যে থাকা লোকজন সরে যাচ্ছেন। নিজের পয়সা খরচ করে রায়গঞ্জ বারোগন্ডার ওই শিক্ষক এভাবে বিভিন্নরকম কাজ করে চলেছেন। কিন্তু কেন এমন কাজ, প্রশ্ন করলে তাঁর বক্তব্য, এখন স্কুল ছুটি। স্কুলে কোনও কাজ নেই। তাছাড়া করোনা আমাদের সকলকে চাপে রেখেছে। মানুষকে এইসময় সচেতনতাই পারে করোনার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধে জয়ী করতে। তাই ওই প্রয়াস।
শিক্ষকের এইসব অন্যরকম কাজের আরও নমুনা হল, তিনি নিজের পয়সায় পিপিই কিট তৈরি করে কয়েকজন পুলিশকর্মীর মধ্যে বিলি করেছেন। কেন পুলিশকে বিনামূল্যে পিপিই কিট বিলি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে যুদ্ধ করছেন বহু পুলিশকর্মী। তাই তাদের উৎসাহিত করার জন্য ওই পিপিই কিট বিলি।
অন্যদিকে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের দিন বিপ্লববাবু পার্থেনিয়াম আগাছা উচ্ছেদ করার জন্য কুড়ি জন মানুষকে সবুজ অ্যাপ্রন বিলি করেন। সেসব অ্যাপ্রন নিজেই তিনি তৈরি করছেন।
এভাবে বিভিন্নরকম কাজের মাধ্যমে এলাকায় অন্যরকম করোনা যোদ্ধা হয়ে উঠেছেন এই স্কুল শিক্ষক। তাঁকে কুর্নিশ।
ছবিঃ প্রতিবেদক