No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জাতীয় সংগীত গেয়ে খুন হতে যাচ্ছিলেন, সেই মাসুম আখতারের হাতে আজ ‘পদ্মশ্রী’

    জাতীয় সংগীত গেয়ে খুন হতে যাচ্ছিলেন, সেই মাসুম আখতারের হাতে আজ ‘পদ্মশ্রী’

    Story image

    ২০১৫ সালের ২৬ মার্চের একটি ঘটনা। কলকাতা শহরের মেটিয়াব্রুজ এলাকা তখন থমথমে। যাদবপুর কাটজুনগর স্বর্ণময়ী স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক কাজী মাসুম আখতার একটি ঘটনায় প্রায় খুন হতে যাচ্ছিলেন মৌলবাদীদের হাতে। কিন্তু কেন? কী সেই ঘটনা, যা তোলপাড় করেছিল গোটা বাংলাকে? 

    কাজী মাসুম আখতার মেটিয়াব্রুজের তালপুকুর আড়া উচ্চ মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ায় মৌলবাদীদের শিকার হতে যাচ্ছিলেন। এই মাদ্রাসার তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাসুম সাহেব। মাসুম আখতার ভীষণভাবে চাইতেন, ছাত্ররা যাতে ভারতীয় সংবিধান মেনে চলে। তাই দেশের ও দশের কথা ভেবে ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ একসঙ্গে গাইছিলেন। ঠিক সেই সময় মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হতে হয় তাঁকে। এখানেই শেষ নয়, এলাকার বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন মাসুমবাবু। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কলম ধরেছেন তিনি। তিন তালাকের বিরুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে দৌড়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এত সব ঘটনার পর লোহার রড দিয়ে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেয় মৌলবাদীরা। তারা মাসুমবাবুর এই স্বাধীন চিন্তাধারা এবং মতপ্রকাশ ঠিক মতো মেনে নিতে পারেনি সেদিন। মাসুম আখতারের অভিযোগ ছিল, তাঁকে মারধর করার কারণ, ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে বাল্য বিবাহের শিকার না হয় এবং প্রত্যেকে যাতে জাতীয় সংগীত গায়। এই ঘটনায় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে ধরে বারবার আলিপুর আদালতে আবেদনও করেন এই শিক্ষক।

    “যতই হুমকি বা হামলা হোক, দায়িত্ব পালন থেকে এক মুহূর্ত সরব না” - কাজী মাসুম আখতার 

    নিরাপত্তার কারণে কলকাতার ওই মাদ্রাসা থেকে ২০১৬ সালের মে মাসে যাদবপুরের কাটজুনগর স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসাবে বদলি করে দেয় রাজ্য সরকার। তারপর ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরপর এই রুগ্নদশার স্কুলকে কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুলের পরিচয় দেন। শুধুমাত্র তাঁর মতো একজন শিক্ষক আছেন বলেই ক্লাসে ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। 

    অবশেষে মিলল স্বীকৃতি। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২০ সালের পদ্মশ্রী পাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক কাজী মাসুম আখতার। এই পুরস্কার ঘোষণার পর তিনি বলেছেন, “এই সম্মান আমাকে দিল আমার দেশ। যতই হুমকি বা হামলা হোক, দায়িত্ব পালন থেকে এক মুহূর্ত সরব না।”

    রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে শিক্ষক দিবসে মাসুম আখতারকে ‘শিক্ষারত্ন সম্মান’ প্রদান

    কাজী মাসুম আখতারের পদ্মশ্রী ঘোষণার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। ভেসে যাচ্ছে অভিনন্দনের বন্যা। তাঁর অনেকদিনের বন্ধু গোপাল মণ্ডল লেখেন, “২০১৭ সালে শিক্ষক দিবসে মাসুম ভাইকে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শিক্ষারত্ন সম্মান’ প্রদান করেছেন। হ্যাঁ, ইনিই সেই জাতীয়তবাদী শিক্ষাব্রতী, যিনি তালপুকুর আড়া উচ্চ মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত গাওয়ানোর কারণে কিছু নির্বোধ মানুষের হাতে নিদারুণভাবে প্রহৃত হন। মাসুম ভাইয়ের মুখেই জেনেছিলাম, ৫০ বছরের মধ্যে কোনো দিন ওই মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়নি। উনি ওই মাদ্রাসাতে রবীন্দ্রজয়ন্তী, বিবেকান্দ ও নেতাজির জন্মদিবস পালনের পাশাপাশি নবী দিবস পালনের ব্যবস্থা করেন। ইসলামী সমাজে বাল্য বিবাহ রোধ করতে উদ্যোগ নেন। কিন্তু কিছু নির্বোধ ওঁকে লোহার রডের আঘাতে রক্তাত্ব করে। কলকাতা পুলিশ সে ব্যাপারে মামলা রুজু করেছিল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। বর্তমানে মাসুম ভাই যাদবপুরের এক হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত। ওঁর উদ্যোগে বর্তমানে এই স্কুলের পঠন-পাঠন-সহ সামগ্রিক উন্নতি সত্যি প্রসংশনীয়।” 

    তাঁর এক ছাত্র সঞ্জীব কুমার লিখেছেন, “স্যারের মতো উদার মানুষেরা কোনো সম্মানের জন্য দেশ সেবা করেন না। তাছাড়া এঁদের জন্য কোনো পুরস্কারই যথেষ্ট নয়। এই অশান্ত সময়ে স্যারের এই পুরস্কারে বলব, মাসুম স্যার দীর্ঘজীবী হন। আপনার আদর্শ আমরাও যেন সারাজীবন মেনে চলতে পারি।”

    এই আদর্শ, এই জেদ, এই অহংকার এখনকার দিনে কি সত্যিই দুর্লভ! তবে সমাজ যেভাবে এগোবে, মাসুম ভাইয়ের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরও জোরালো ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। আজ বাংলা সত্যিই গর্বিত। কাজী মাসুম আখতার, আপনাকে অভিনন্দন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @