No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    তারকোভস্কির বৃষ্টি ২

    তারকোভস্কির বৃষ্টি ২

    Story image

    সোলারিস । ১৯৭২

    মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি 
    না এলেই ভালো হত অনুভব করে ; 
    এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি

    এফ মাইনর-এ বাখের অরগ্যান প্রিলুডের বাজনা নাম দেখানো শেষে থেমে গেলে কানে আসে পোকামাকড় পাখি হাওয়ার শব্দ আর জলকথা। দেখি জলের নীচে জলতল তারও নীচে ধারাস্রোত যেখানে প্রাণ ছিল।ঘন সবুজ জলজ ঝাঁঝিসকল ছিল চঞ্চল। জলে বেশ টান ছিল। উপরিতলে ভেসে যায় কালচে বাদামী রঙের এক ঝরা পাতা যা একদা সবুজে─জীবনে ছিল। ক্যামেরা বামে তাকায়, সেখানে জলতলে মাটি ছিল তথাপি কোনো প্রতিবিম্ব ছিল না আকাশের।

    ক্রিস কেলভিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। একা। সে দেখছিল চারিধার, শুনছিল সবকিছু, বুঝতে চাইছিল আগাছার চুপচুপকে, বুনোঝোপেদের জটলাকে। একটা ভীমরুল বোঁ-ও-ও করে উঠল পাশেই। বিরাট বড়ো ঘন-সবুজ পাতার আড়াল থেকে একটা খুদে পাখি স্তব্ধতাকে চমকে পাখসাট দিয়ে যেন বলে উঠল ─ আমি এখানেই থাকি গো। তখন জলতলে ডুবো জলঘাসেরা শরীরি বিভঙ্গে ঢেউ তুলছিল অতি নিকটেই। দূরে কোথাও একটা পাপিয়া (কুকু) ডেকে উঠল। কুয়াশামাখা সকালে বুনোঝোপে ফুল ফুটে ছিল। সেসবের ভিতর পায়ে-চলা-পথ ধরে পিছন ফিরে ক্রিস চলে যায়। বিশালাকায় গাছে ঢাকা মাঠে ঝরা পাতার সমারোহ। দূরে গাছপালার আড়াল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডান দিকে মিলিয়ে যায় সে। একটা পানা পুকুরের পাড়ে দাঁড়ায় ক্ষণিক। জল ছুঁয়ে সকালের নরম রোদ মেখে কুয়াশা চলে যায়। ক্রিস ফ্রেম ছেড়ে যায়, ক্যামেরা মাথা তোলে, দেখতে পাই পুকুরের ওপারে একটা বাড়ির সামনে উড়তে ইচ্ছুক একটা বড়ো হলুদ বেলুন সুতোয় বাঁধা। কিছুটা এগিয়ে কেলভিন জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখি ― নির্জন জলের রঙ তাকায়ে রয়েছে

    ছবিটি ইউটিউবে দেখতে  ক্লিক করুন

    একটা ঘোড়া ফ্রেমের বাঁ দিক থেকে দ্রুত ডানদিকে গিয়ে আবার কি মনে করে ঘুরে, ফিরে আসে ও চলে যায়। ক্রিস কিছুটা গিয়ে হাতের টিফিন বাক্সটা ঘাটে রেখে পানা সরিয়ে পুকুরের জলে হাত ডুবিয়ে ধুতে থাকে। একটা গাড়ি থামার শব্দে সে মুখ তুলে তাকায়। আগন্তুক এক বয়স্ক মানুষ (ব্রেতন্) যাঁকে তার বাবা আপ্যায়ন করছে। একটি বালকও নামে গাড়ি থেকে। ব্রেতন্ একজন প্রাক্তন নভোশ্চর। বাবা ক্রিসকে হেঁকে ওখানে আসতে বলে। একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখতে পাই যে ওখানেই ছিল। বাচ্চা দুটির বন্ধুত্ব হয়। বাবা ব্রেতনকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে যায়

    সবুজ মাটির পথে ব´সে আমি দেখিতে চেয়েছি জল, ― জলের নিঃশ্বাস
    হৃদয়ের রক্তে আমি মিশাতে চেয়েছি এই মাটির ধুলোর পথে ব´সে;
    অনেক আকাশ দেখে যেই জল জেগে আছে আকাশের মতোন সাহসে,
    তাহার হৃদয় থেকে যেই জল খুলে’ ফেলে গেছে এই পৃথিবীর ফাঁস,

    ঘরের ভেতরে বাবা আর ব্রেতন্ একটা পাখির খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকে তারপর ক্রিসের বাবা বেরিয়ে গিয়ে জানলার বাইরে থেকে কথা চালু রাখে। ক্যামেরা দেখায় দেওয়ালে টাঙানো প্রাচীন বেলুন উড়ানের ছবিসমূহ।
    "এই জায়গাটা বেশ মনোরম", ব্রেতঁন্ বলে।
    "ঠাকুরদার বাড়িটা ঠিক এরকম ছিল। আমার খুব ভালো লাগত সেটা; তাই সেরকমভাবেই এটা বানিয়েছি। নিত্যনতুন বদল আমি ভালোবাসি না", এ কথা বলে মুখ তুলে ওপরে তাকায় ক্রিসের বাবা। তারপর সরে আসে জানলার কার্নিসের নীচে। হঠাৎই বৃষ্টি নামে। বাবা বৃষ্টি দেখতে থাকে। বাচ্চা দুটো আর কুকুরটা (আগে দেখিনি) দৌড় দেয়, ভিজতে ভিজতে দূরে চলে যেতে থাকে। মেঘ ডেকে ওঠে। ক্রিস অঝোর বৃষ্টিতে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, স্থিরভাবে নিজেকে ভিজতে দেয়। তার মুখ মাথা কোট প্যান্ট ভিজে যেতে থাকে যেন সে গায়ে মুখে মেখে নিতে চাইছে এই জলধারাকে। নীচে তাকিয়ে দেখি টেবিলের ওপর একটা চীনা মাটির চায়ের পট, দুটি পেয়ালা তাতে লিকার চা ভর্তি, একটা ডিশের ওপর চামচ আর একটা টেবিলে পড়ে। একটা গোটা আপেল, তিন-চারটি চেরি ফল, আধ-খাওয়া আপেলটিতে একটা ডেঁয়ো পিপড়ে ঘুরছে। সওব ভিজছে। এক্সট্রিম ক্লোজে দেখি লাল চায়ের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। ক্রিস কোটের দুটো মুখ চাপা দিয়ে চেয়ারটা টেনে গুছিয়ে বসে, বৃষ্টি ভেজার জন্যে। টেবিলে আরও খাদ্য ও ফল নজর করি যা ভিজে যাচ্ছিল। বেশ জোরে মেঘের গর্জন শোনা যায়। অপ্রত্যাশিতভাবে বৃষ্টি থেমে যায়, চলে যাই সেই পানা পুকুরের কাছে। পাড়ের হেলানো গাছের শাখা পাতা শ্যাওলা-ধরা গুঁড়ি থেকে তখনও টুপ টুপ ফোঁটা ঝরছিল জলের ওপরে। ওপারে বৃষ্টিস্নাত সবুজ বৃক্ষরাজি, নীচে জল আর দূরে ওপরে আকাশ।

    দেড় মিনিটের এই বৃষ্টির জন্যে তারকোভস্কি আমাদের প্রস্তুত করেছেন সাড়ে ন-মিনিট ধরে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আলাপ-বিস্তার দ্রুতের মতো কিন্তু এই চলনে কোনো গৎ নেই। বৃষ্টিএখানে গতে-বাঁধা নয়, আচমকা এসে হঠাৎ চলে যায়, আসা যাওয়ার মাঝে ওই দেড় মিনিট সে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। বৃষ্টি এখানে নাটকের ক্লাইম্যাক্সের মতো। এই এগারো মিনিটে তিনি রেখেছেন তাঁর বিবৃতিসমূহ। জল মাটি গাছ পাতা আগাছা বুনোফুল ঝোপঝাড় জলতলের ঝাঁঝি জলঘাস পানা শ্যাওলা-ধরা-গাছ পতঙ্গ পাখি ঘোড়া চায়ের ওপর জলের ফোঁটা ও জলের ওপর জলের ফোঁটা। এই যে বিশ্ব এখানে কোনো তাড়া নেই। আমরা তাল রাখতে না পেরে বলি মন্থর। প্রকৃতপ্রস্তাবে আমাদের প্রচল বেগ বেড়ে গেছে, থিতু হতে, নিবিষ্ট হতে পারি না। চলচ্চিত্রের এই যে আহ্নিক গতি, যে চলন তা আমাদের স্থির হতে শেখায়, ছটফটানি কমিয়ে তিনি আমাদের যে জগতে নিয়ে যান তা পাই লবটুলিয়ার জঙ্গলে―যা দাবী করে ধীর লয়ের নিবিষ্টতা। তাই এই চলন। দেখো, শোনো বোঝো যে এসব আছে বলেই এখনও বৃষ্টি হয়। এই জগতের সবকিছুকে পরম মমতায় দেখান তিনি। জীবনের, প্রাণের, প্রাণশক্তির এবং প্রকৃতির শ্রেষ্ট জাদুময় বিজ্ঞান হিসেব অন্তিমে এই বৃষ্টি। তাই সে এখানে চমৎকারা।
    আমাদের মনের চিকিৎসা দরকার। প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের ঈঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন ডি-নেচারড না হতে। ক্রিসের বাবার কথায়, ঘরের দেওয়ালে বেলুনের ছবিতে সেসবের ঈঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এহ্ বাহ্য। বাইরে নয়, মহাকাশে নয় এই কাদা মাটি জল গাছ আর আগাছেই তাঁর পক্ষপাত─যে দর্শন তা পাই কেবল জীবনানন্দ দাশের কবিতায় তাই সেসব এসেছে এখানে, ইতস্তত, ইটালিকসে।

    নক্ষত্রের পানে যেতে─যেতে
    পথভুলে বার-বার পৃথিবীর ক্ষেতে 
    জন্মিতেছি আমি এক সবুজ ফসল

    ক্রিস এক জন মনোবিদ। মানব অন্তরের অজ্ঞেয় অনধিগম্য যে মনসমূদ্র সেখানে তার ডুবসাঁতার। পৃথিবীতে আজই তার শেষ দিন। তাকে রওনা হতে হবে সোলারিস স্পেস স্টেশনে। সেখানে নভোশ্চরদের নানারকম মানসিক সমস্যা হচ্ছে কেন, তা খুঁজতে বুঝতে তাকে যেতে হবে। আমরা তার সঙ্গে যাব না। চলচ্চিত্র-সময় অনুসার ঠিক আড়াই ঘন্টা পর, শেষে একবারই যাব তাকে ফিরিয়ে আনতে। সোলারিস থেকে ফেরার অব্যবহিত আগের শটে দেখব মহাকাশযানের জানলায় খোলা অবস্থায় সেই টিফিন বাক্সটিকে (শুরুতে তার হাতে ছিল) যেটায় করে সে নিয়ে গিয়েছিল একটি অঙ্কুর আর কিছুটা পৃথিবীর মাটি। সেটা এখন জীবনে কিন্তু অ্যানিমিক। এর ওপর এসে পড়ল বাখের কোরাল প্রিলুড। কাট শটে পৃথিবীতে ফিরলেও, সঙ্গীতকার এডওয়ার্ড আর্তেমিয়েভ সেটি কাটেন না। জলতলে সেই জলঘাস আগের মতোই চঞ্চলপ্রাণা, সেই পুকুর, সেই হেলানো গাছ। মহাকাশ যাত্রার আগে ক্রিস যেখানে থেমে ছিল, যেখানে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সেভাবেই চলে ও দাঁড়ায়। এখন পুকুরের জল হিম থমথমে, তরঙ্গহীন। বাড়ি। কুকুরটা দৌড়ে আসে স্বাগত জানায় ও সঙ্গে নিয়ে এগোয়। বাখের সঙ্গীত থেমে সোলারিস মহাসমূদ্রের অপার্থিব ধ্বনিতরঙ্গ শুরু হয়। বাড়ির বাইরে আগুন জালানো রয়েছে , ধোঁয়া উঠছে ; আমরা ঘরের ভেতর থেকে কাচের জানলার মধ্য দিয়ে দেখি। ক্রিস ক্রমে এগিয়ে এসে জানলায় মুখ ঠেকিয়ে দেখতে থাকে ─
    অহো! এ কোন ধারাজল!
    ─গ্রন্থসকল ভিজে যায়! ঝরঝর করে জল পড়ে ভিতরে। টিফিন বাক্স চীনা মাটির পাত্র তাতে ড্রাগনের নীল নকশা। ক্রিসের চোখে অপ্রকাশিত অশ্রুর আকুলতা! এবার ক্রিসের চোখে দেখি, সেই ঘর সেই দেওয়ালে টাঙানো ঝোলা ব্যাগ, বিউগল। বাবা পিছন ফিরে জানলার গোবরাটে রাখা বইপত্র নাড়াচাড়া করছেন, দু-হাতে দুটো বই নিয়ে টেবিলে ডাঁই করা বইয়ের সামনে এসে কী যেন ভাবছেন! অঝোরে জল পড়তে থাকে বাবার কোটের ওপর, জামার হাতায় সব ভিজে যেতে থাকে! কী মনে করে বাবা মুখ ফিরিয়ে ক্রিসকে দেখতে পান, ভালো করে নজর করেন, ঈষৎ বিস্মিত তারপর প্রসন্নতা ও চাপা আনন্দের অভিব্যক্তি দেখি। সেখানে, ঘরের ভেতরে তখন অঝোরে জল পড়িতেছিল যদিও বাইরের পৃথিবীতে কোনো বৃষ্টি ছিল না। ক্রিস জানলা ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় বাবাও দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ান।
    আমরা একটু দূর থেকে দেখি দরজায় কুকুরটি বসে, ক্রিস এগিয়ে গিয়ে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পা দুটি জড়িয়ে ধরে যেন রেমব্র্যান্টের রিটার্ন অফ দি প্রডিগাল সন চিত্রকর্মটি উঠে আসে। ক্যামেরা ওদের ছেড়ে দিয়ে ক্রমশ উঁচুতে চলে যেতে থাকে, অনেক ওপর থেকে সেই হলুদ বেলুনটাকে চিনতে পারি তারপর মেঘেদের থেকেও উঁচুতে আরও ... সবকিছু সাদা হয়ে যায়।

    সোলারিস
       রেমব্র্যান্টের রিটার্ন অফ দি প্রডিগাল সন

    শুরুর ছ মিনিটের পাশে টানেলের পাঁচ মিনিটের শটটি মনে করুন। প্রথমটা অতি ধীর ও মন্থর যেখানে দ্বিতীয়টি বিশাল গতিময় অথচ দ্বিতীয়টা বেশি একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর। বাচ্চাটার সিটে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। অফুরান প্রাণকে না দেখে উদ্ভিন্না জীবনে না-তাকিয়ে মহাকাশে যাই প্রাণসন্ধানে! নগর সভ্যতার (টোকিও শহরে তোলা) আবেগহীন মনহীন আধুনিকতার বিরুদ্ধে তাঁর বিবৃতিসমূহে তিনি নিরীক্ষণের দাবি রাখেন। তাঁর কন্ঠস্বর আমাদের অধরা থাকে না! তিনি দুর্বোধ্য নন আমরা বধির হয়ে যাচ্ছি!
    আমাদের বিস্মৃত পিতাকে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। নাড়ির ডাককে শুনতে বলেন তিনি । আমাদের উপরে-ফেলা শিকড় ফিরিয়ে দেন তিনি।
    তাই অন্তর্বৃষ্টির এই বর্ষণে কিছু মায়া রহিয়া যায়।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @