তপন সিংহ-কে অবাক করে দিয়ে ছবি বিশ্বাস বললেন, ‘বলাই’ কাবুলিওয়ালা সাজুক

‘কাবুলিওয়ালা’-র শুটিং-এ তপন সিংহকে ভালোই বিপদে ফেলেছিলেন ছবি বিশ্বাস। কাবুলিওয়ালা চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে বললেন, ‘‘কাবলেদের সম্বন্ধে আমাকে একজন অথরিটি ভেবে নিতে পারো। ওদের সঙ্গে অনেক মেলামেশা করেছি।’’ তপন সিংহ চাইছিলেন কিছু সংলাপ পুশতু-তে দিতে। ঠিক হল একজন কাবুলিওয়ালা মাঝেমাঝে ছবি বিশ্বাসের কাছে যাবে, তার থেকেই ভাষা-আদবকায়দা শিখে নেবেন তিনি। মেকআপ নিয়েও দুশ্চিন্তা নেই। সেসবও নাকি ছবি বিশ্বাস নিজেই করে নেবেন। সব ঠিকঠাক হওয়ায় নিশ্চিন্ত মনে শুটিং-এর তোড়জোড় শুরু করলেন তপন সিংহ।
শুটিং-এর প্রথম দিনেই ধাক্কা। তপন সিংহ লিখছেন, “আমরা যখন সেট লাইট প্রভৃতি নিয়ে ব্যস্ত, হঠাৎ ছবি বিশ্বাস কাবুলিওয়ালার বেশে প্রবেশ করলেন। চমকে উঠলাম। এ কাকে দেখছি? অতি দরিদ্র মলিন বেশধারী হিং বিক্রেতা কোনও কাবুলিওয়ালা, না সদ্য কবর থেকে বেরিয়ে আসা স্বয়ং মহম্মদ বিন তুঘলক? মাথায় জরির পাগড়ি। গায়ে সিল্কের আচকানের ওপর জরির কাজ করা হাতকাটা জ্যাকেট। পায়ে সোনার জরির কাজ করা নাগরা। তখন আমি তিনশো টাকা মাইনের এক জুনিয়র পরিচালক। আর ছবি বিশ্বাস হলেন সে যুগের অজেয় দুর্দান্ত অভিনেতা। সুতরাং ইগনোর্যাকন্স ইজ্ ব্লিস কথাটি ভেবে কাজ শুরু করে দিলাম।’’
যদিও শেষ অবধি এই রাজকীয় পোশাক বদলাতে হয়েছিল ছবি বিশ্বাসকে। প্রযোজক অসিত চৌধুরী তাঁকে এই পোশাকে দেখে রেগে গেলেন। তারপর, একরকম জোর করেই সাধারণ কাবুলিওয়ালাদের মতো পোশাক পরানো হল তাঁকে। কিন্তু ছবি বিশ্বাসও নিজের মর্জি ঠিক বুনে দিলেন সময়মতো। তখন আউটডোরের শুটিং হচ্ছে পহেলগাঁওয়ের কাছে একটা উপত্যকায়। তপন সিংহ তখন জ্বরে ভুগছেন। তার মধ্যেই সকালে কল টাইম। ছবি বিশ্বাস এলেন। দেখে চমকে উঠলেন পরিচালক। ঘটনাটা শুনলে আমাদেরও অবশ্য অবাক না হয়ে উপায় থাকবে না। “দূর থেকে দেখছি জিপ থেকে কাবুলিওয়ালা নামলেন, কিন্তু তার পর যিনি নামছেন, তিনি কে? স্যুট পরা লম্বা চওড়া এক ভদ্রলোক! কাছে আসতে চমকে উঠলাম, উনি তো ছবি বিশ্বাস! তা’হলে কাবুলিওয়ালা কে? এসেই বললেন, দারুণ জায়গা বেছে নিয়েছ তো! এত সুন্দর জায়গায় কি আর আমার ক্লোজ-আপ নেবে? তাই তোমার সহকারী বলাইকে কাবুলিওয়ালার মেকআপ করালাম। একটু লং-এ ট্রিট করলে কেউ ধরতে পারবে না।’’
তারপর কাবুলিওয়ালা-রূপী বলাইকে নিয়েই সেই দৃশ্যের শুটিং হল। কী আর করণীয়! ছবি বিশ্বাসের মুখের ওপর কথা বলে কার সাধ্যি!
এই ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে সঙ্গীতের দায়িত্ব সামলেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ছবির প্রয়োজনেই ‘অ্যারাবিউন টিউন’ জাতীয় কিছু চাইছিলেন তপন সিংহ। আফগানিস্থানের দৃশ্য আছে ছবিতে, সেখানেই জোড়া হবে সেই সুর। কিন্তু রবিশঙ্কর খুঁতখুঁতে। এত সহজে যে-কোনো সুর জুড়ে দিলেই হল নাকি? খোঁজাখুঁজির মধ্যেই একটা আশ্চর্য যোগাযোগ ঘটে গেল। হঠাৎ করেই আফগানিস্তানে ‘কাবুলি রেডিও’ থেকে ডাক পেলেন রবিশঙ্কর। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ওখান থেকে কিছু পেলেই নিয়ে আসবেন সঙ্গে করে।
কথা রেখেছিলেন রবিশঙ্কর। কাবুল থেকে ফিরেছিলেন টেপ রেকর্ডার ভর্তি পুশতু ভাষার গান নিয়ে। ‘অ্যারাবিউন টিউন’-এর তাপ্পি আর লাগাতে হয়নি সিনেমায়। খাঁটি আফগানি সুরই ব্যবহৃত হয়েছিল। এ যেন হাতে চাঁদ পাওয়া।
পরিচালক তপন সিংহ-র জীবনে ‘কাবুলিওয়ালা’ একটি মাইলফলক। গোটা দেশ ধন্য ধন্য করেছিল ছবি দেখে। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবেও উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল সেই ছবি। শুটিং-এর সময় নানা সময়ে বিপদে ফেললেও অভিনয়ে তপন সিংহ-কে মুগ্ধ করে দিয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। সঙ্গে ছিল রবিশঙ্করের অসামান্য সুরারোপ।
পণ্ডিত রবিশঙ্করের জন্মশতবার্ষিকী এই বছরই আর আজ তপন সিংহ-র জন্মদিন।