রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ মঞ্চস্থ করবেন অঞ্জন দত্ত, রঘুপতি তিনিই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বিসর্জন’ নাটকে জয়সিংহকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন সেই অমোঘ সত্য কথাটি, “দেবতার নামে মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ”। নাটকটি লেখা হচ্ছে ১৮৯০ সালে। তারপর কেটে গেছে ১২৯ বছর। সমগ্র নাটকটি বাদ দিলেও শুধুমাত্র উল্লিখিত এই সংলাপ এখনও প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। মনুষ্যত্বই যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম, তা ২০১৯ সালেও জনে জনে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে। ধর্মীয় হানাহানি এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ক্রমশ মাথাচাড়া দিচ্ছে। সময় এগোচ্ছে, কিন্তু ভাবনা-চিন্তা? যুক্তি? ‘বিসর্জন’ নাটক আদতে সমাজের ব্রাহ্মণ্যবাদ বা পুরুষতন্ত্রকে বারবার খণ্ডন করতে চেয়েছে। তাই যে দেশটা চরম ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং শ্রেণি বিভাজনের শিকার, তা এই নাটক পড়লে পরতে পরতে বোঝা যায়।
কয়েকদিন আগেই প্রখ্যাত অভিনেতা-পরিচালক অঞ্জন দত্ত প্রকাশ করছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ নাটক অনুপ্রেরণায় একটি থিয়েটার প্রযোজনা মঞ্চস্থ করতে চান। অঞ্জন দত্ত ১৯৭৮ সালে নাট্যজীবন শুরু করেন সার্ত্রের নাটক দিয়ে। অস্তিত্ববাদী দর্শন তাঁকে টানে। মার্ক্সবাদ নিয়ে পড়াশোনার পরেও তাঁর মনে হয় ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গা থেকে অস্তিত্ববাদ অনেক বড়ো। প্রশ্ন এই জায়গায়। আর অঞ্জন দত্ত বারবার নিজেকেই প্রশ্ন করতে চান একজন বাইরের মানুষ হয়ে। আমরা কি ভালো আছি? আমাদের দেশটা কি ভালো আছে? ভারতবর্ষ এই মুহূর্তে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তা ক্রমশ ভাবাচ্ছে অঞ্জন দত্তকে। ধর্মের রাজনীতি আর অসহিষ্ণুতা কতদিন চলবে? হিন্দ্-হিন্দু-হিন্দুস্তান করে হিন্দু ধর্মকেই কি অপমান করা হচ্ছে না? একটি সংবাদপত্রে নিজের বয়ানে অঞ্জন দত্ত লিখছেন, “এই ৬৫ বছর বয়সে এসে আমার প্রথম সত্যি-সত্যি ভয় করছে। আমি তিনটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেছি। কিন্তু এইরকম প্রবলভাবে গোটা দেশকে, আমার নিজের দেশকে এত ভয় পাইনি। তাই মনে হয়েছে চারপাশের, এই ভয়ংকর সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থাটাকে যদি কোনওভাবে আমার নিজের কাজের মধ্যে সরাসরি নিয়ে আসা যায়।”
বাংলার দর্শক এর আগে অঞ্জন দত্তকে বিদেশি ক্লাসিক নাটকে দেখতে অভ্যস্ত। এই প্রথমবার তিনি দেশীয় ক্লাসিক করতে চলেছেন। তাঁর মতে, জীবনের শেষ পর্যায়ে হয়তো রবীন্দ্রনাথই ভরসা। সেখানেই ফিরে আসতে হয়। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকটির ভাবার্থ ব্যবহার করবেন অঞ্জন। সম্পূর্ণ বিনির্মাণ করবেন এখনকার প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসে। বদলে যাবে আঙ্গিকও। ‘ছাগল বলি’কে ‘নরবলি’ কিংবা সরাসরি বিজাতীয়দের ‘বলি’ করা হবে। রঘুপতি আর রাজা গোবিন্দমাণিক্যর লড়াই হবে হিন্দু বনাম দলীয় রাজনীতির। অপর্ণাকে দেখাতে চাইছেন একজন মুসলিম মেয়ে হিসাবে। হিন্দু জয়সিংহ অপর্ণার প্রেমে পড়ে এবং ছোটো থেকে শিখে আসা প্রথাকে প্রশ্ন করবেন বারবার। রঘুপতি এবং জয়সিংহর দ্বন্দ্ব দেখানো হবে বড়ো আকারে। পুরো নাটকটিই মঞ্চস্থ হবে চলিত ভাষায়। এমনকি নাটকের নাম ‘বিসর্জন’ বদলে রাখতে চান ‘রঘুপতি’। রঘুপতির চরিত্রে অভিনয় করবেন স্বয়ং অঞ্জন দত্ত। জয়সিংহ হবেন সুপ্রভাত ব্যানার্জি। সঙ্গীত পরিচালনা করবেন নীল দত্ত এবং মঞ্চ ও পোশাক নির্মাণ করবেন ছন্দা দত্ত-অঞ্জন দত্ত দু’জন মিলে। এই বছর ডিসেম্বর নাগাদ প্রথম মঞ্চস্থ হবে।
আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী প্রাঙ্গনে এই নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। সেখানে রঘুপতির চরিত্রে নিজেই অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীকালে ‘বিসর্জন’ নাটক পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গায় অভিনীত হলেও জনমানসে সাড়া ফেলেছিল সুমন মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনা। যেখানে রঘুপতির চরিত্রে গৌতম হালদার, জয়সিংহর চরিত্রে কৌশিক সেন এবং অপর্ণার চরিত্রে তূর্ণা দাশ অভিনয় করেছিলেন। অঞ্জন দত্তের নাটকে বাকি চরিত্রগুলি কারা করবেন এখনও ঠিক হয়নি। তবে অঞ্জন দত্তের হাত ধরে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নতুন মোড়কে উন্মোচিত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হতে গেলে এমন প্রযোজনা খুবই জরুরি বৈকি!
তথ্যসূত্র- 'সংবাদ প্রতিদিন' সংবাদপত্রে প্রকাশিত অঞ্জন দত্তর নিজস্ব কলাম- 'ভারত সত্যিই খুব বড় ধরনের একটা বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে: অঞ্জন দত্ত'