No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মিহির সেন : প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল পেরনো বিশ্বমানের সাঁতারু

    মিহির সেন : প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল পেরনো বিশ্বমানের সাঁতারু

    Story image

    দেশ স্বাধীন হয়েছে বেশ কিছু বছর কেটে গেছে। সে সময় ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়াকে জীবনের বিরাট এক সাফল্য বলে মনে করা হত। তৃতীয় বিশ্বের একজন চালচুলোহীন ‘নেটিভ’ ভারতীয় তথা বাঙালি এ বিষয়ে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে, এ ছিল সারা পৃথিবীর বিস্ময়। সেই বিস্ময়কর ঘটনাটাই ঘটিয়েছিলেন বাংলার অতি সাধারণ এক তরুণ - মিহির সেন। সারা বিশ্বকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন ইচ্ছে থাকাটাই আসল কথা। শুধু ইংলিশ চ্যানেল নয়, মিহির সেন হচ্ছেন একমাত্র সাঁতারু যিনি এক বছরে (১৯৬৬ সাল) পাঁচটি মহাদেশের সমুদ্র (পাক প্রণালী, জিব্রালটার প্রণালী, ডারডেনিলস উপসাগর, বসফোরাস প্রণালী ও পদ্মা চ্যানেল) অতিক্রম করেন। এ দেশের ব্রজেন দাশ, বিমল চন্দ ও আরতি সাহার মতো সেসময়ের তরুণ দীর্ঘপথের সমুদ্র সাঁতারুদের কাছে তিনিই ছিলেন অনুপ্রেরণা।

    ১৯৩০ সালের ১৬ নভেম্বর পুরুলিয়ার মানভূমে তাঁর জন্ম। বাবা রমেশ সেনগুপ্ত ছিলেন চিকিৎসক। চিকিৎসা করতেন  পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব মানুষদের। এর ফলে পাঁচ সন্তান নিয়ে সংসার খরচ চালানো বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। বাড়িতে গরু, হাঁস, মুরগি পুষে গ্রামের লোকদের দুধ ও ডিম বিক্রি করতেন তাঁর মা - লীলাবতী সেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মিহির ছিলেন বড়ো। বাবা-মায়ের এই কঠোর পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ আর সততা তাঁর মধ্যেও একশো শতাংশ ছিল। সেকারণেই তো সাঁতার কেটে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন রাঢ় বঙ্গের মিহির সেন।

    ৮ বছর বয়সে মায়ের পরিবার সহ পড়াশোনার জন্য চলে আসেন কটক। সাঁতারু হবেন এ ভাবনা ছিল না তাঁর। ছোটোবেলা থেকে আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছে ছিল। সেইমতো ভুবনেশ্বরের উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ইচ্ছে ছিল আরও শিখবেন, আরও পড়বেন। বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। উড়িষ্যার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়েক পাশে দাঁড়ান এ মেধাবীর। তার সহায়তায় ১৯৫০ সালে জাহাজে বিলেত যাত্রা। মনে অনেক স্বপ্ন। আর যাত্রাকালে হাতে ছিল একটি তৃতীয় শ্রেণির টিকিট।

    বিলেতের জীবন বিলাসপূর্ণ ছিল না মিহিরের। লিংকন্স ইনে ব্যারিস্টার ডিগ্রির জন্য ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। সাঁতারে সংশ্লিষ্টতা ছিল না তখনও। ছাত্রাবস্থায় ইংলিশ চ্যানেলজয়ী প্রখ্যাত মার্কিন মহিলা সাঁতারু ফ্লোরেন্স চ্যাডউইককে নিয়ে পত্রিকায় একটি লেখা পড়েন। নিভৃতে নিজের মতো অনুশীলন করতে থাকেন দূরপাল্লার সাঁতার।         

    বিশ্ব মিহির সেনকে চিনলো ১৯৫৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এ দিন তিনি ১৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সাঁতরে ডোভার থেকে ক্যালাইস পাড়ি দিয়ে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন।

    মিহির ভারতে ফেরেন জাতীয় বীর হয়ে। ১৯৫৯ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাকে “পদ্মশ্রী” পদকে ভূষিত করেন। তাঁর জন্য নির্ধারিত রেখেছিলেন আরও অনেক কিছু। 

    ১৯৫৮ সালে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের পর ভারতে ফিরে আইন পেশায় নিয়োজিত হন মিহির সেন। কলকাতা সুপ্রিম কোর্টে বর্ণবাদী প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তার দ্রোহে ঔপনিবেশিক আইন পাল্টাতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। মূলত ফৌজদারি আইন নিয়ে আদালতে লড়তেন মিহির সেন। পেশাজীবনে অর্থ ও সাফল্য আসে দু’হাত ভরে। 

    মিহির সেনের পক্ষে এখানেই থেমে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি সাত সমুদ্র পার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। যার নাম দিয়েছিলেন ‘অপারেশন সেভেন সিজ়’। সেই স্বপ্নেরই ফল ১৯৬৬ সালে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মধ্যবর্তী জলপ্রণালী যা ‘পক স্ট্রেট’ নামে খ্যাত, সেই প্রণালী সাঁতরে পার হওয়া। এই অভিযানের জন্য নৌবাহিনীর একটি বোট ভাড়া করার অর্থের সবটাও মিহির জোগাড় করে উঠতে পারেননি। তখন মরিয়া হয়ে যাত্রা শুরুর কয়েক দিন আগে তিনি ইন্দিরা গাঁধীকে অর্থসাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। পাশে দাঁড়ান ইন্দিরা গান্ধি। সহায়তা করে ভারতের নৌবাহিনী।

    লন্ডনে ইন্ডিয়া হাউসে, লর্ড ফ্রেইবার্গের হাত থেকে শংসাপত্র গ্রহণ করছেন মিহির সেন (পাঠকের ডানদিক থেকে দ্বিতীয়জন)

    ১৯৬৬ সাল, এই এক বছরে মিহির সেন একে একে অতিক্রম করেন পাক প্রণালী, জিব্রালটার প্রণালী, ডারডেনিলস উপসাগর,বসফোরাস প্রণালী ও পদ্মা চ্যানেল। সমুদ্রের জলে বিষধর সাপ বা হাঙরের আক্রমণ এড়িয়ে বরফের চেয়েও ঠান্ডা জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁকে সাঁতার কাটতে হয়েছে। তাঁর এই অবিশ্বাস্য সাফল্য গিনেস বুকে নথিবদ্ধ হয়ে আছে। ১৯৬৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান দেয়। তাঁর এই সাফল্যের কথা ‘অনারেবল সোসাইটি অব লিঙ্কন ইন’এর ‘ব্ল্যাক বুক’-এ আজও নথিভুক্ত হয়ে আছে। এ এক বিরল সম্মান।

    ‘অপারেশন সেভেন সিজে’র সাফল্যের পর মিহির হয়ে উঠেছিলেন দেশনায়ক। তাঁকে ভারতের যুব সম্প্রদায়ের কাছে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হত। রেডিয়োতে কুইজ় কনটেস্টে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন থাকত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে নানা উদ্দীপক লেখা আজও খুঁজলে চোখে পড়বে। তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা ‘ব্লিৎজ়’ মিহিরকে নিয়ে দেশাত্মবোধক কবিতাও ছেপেছিল। যার নাম ছিল ‘স্করপিও’। যার প্রথম চরণটি হল, “আই সিং দ্য সং অব মিহির সেন/মিহির সেন, ম্যান অফ মেন/হু ব্রেভড দ্য ট্রেচারাস ওয়াটারলি বেলস” আর শেষ দুটি লাইন হল, “হোয়াট ফিয়ার হ্যাজ় মাদার ইন্ডিয়া, হোয়েন/শি ব্রিডস সনস লাইক মিহির সেন!”

    ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ে মিহির সেন রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও জিততে পারেননি। তবে সেই রাজনৈতিক পালাবদল ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ মিহির সেনের জীবনে অভিশাপের মতো নেমে এসেছিল। এক দেশনায়ক ও সফল বাঙালি উদ্যোগপতির সোনার সংসার ও প্রতিষ্ঠান জ্বলে খাক হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন বামপন্থী শ্রমিক আন্দোলনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিলেন। তৎকালীন বাম নেতৃবৃন্দ তাঁকে শ্রেণিশত্রু হিসেবেই কেবল চিনেছিলেন। ফলে জঙ্গি শ্রমিক ইউনিয়নের আন্দোলনের চাপে মিহির সেনের সিল্কের ব্যবসা লাটে উঠে গিয়েছিল।

    এর পর থেকে আলিপুরের ফ্ল্যাটে স্মৃতি হারানো, বিভ্রমে আক্রান্ত মিহির সেনকে যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা চোখের জল আটকাতে পারেননি। দেখেছেন সেই বিস্মৃত, বিধ্বস্ত দেশনায়ককে নিয়ে স্ত্রী বেলার বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা। তাঁদের বড় কন্যা চন্দ্রার স্বামী আমেরিকা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। অনেক আবেদন নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় সরকার মিহিরের জন্য মাসিক এক হাজার টাকার পেনশনের বন্দোবস্ত করেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জন্য এককালীন কিছু অর্থ সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

    সাঁতারু-আইনজীবী মিহির সেন 

    মিহির সেন বলেছিলেন “আমি এইসব বিপজ্জনক সাঁতার অভিযান করেছিলাম খ্যাতি বা পুরস্কারের আশায় নয়। আমি কেবল পৃথিবীর মানুষকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা ভারতীয়রা আর ভীত নই, আমরাও পারি।” সদ্য স্বাধীন এক জাতির এক স্বাধীন নাগরিকের এই মননকে আজ বোঝা হয়তো সহজ হবে না। ৬৬ বছর বয়সে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৭ সালের ১১ জুন চলে যান মিহির সেন, শুধু রেখে যান তাঁর কীর্তি ও দূরকে জয় করার অপূতভূর্ব অনুপ্রেরণা।   

    তথ্যসূত্রঃ

    Mihir Sen : Where is he now (Film Division Documentary by Nishith Banerjee)
    আনন্দবাজার পত্রিকা
    Get Bengal

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @