No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘সে বেদনা বুকে চাপ্যে রেখ্যে বেরিয়ে আসবে শুধু আনন্দ আর আনন্দ’ : মঞ্চসফল স্বাতীলেখা

    ‘সে বেদনা বুকে চাপ্যে রেখ্যে বেরিয়ে আসবে শুধু আনন্দ আর আনন্দ’ : মঞ্চসফল স্বাতীলেখা

    Story image

    সংস্কৃত ‘নৃত্য’ থেকে প্রাকৃত ‘নচ্চ’ হয়ে ‘নাচ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত উদ্ভব, এ কথা কে না জানে! এই অঙ্গসঞ্চালনই নৃত্যের আজন্ম সঙ্গী। ‘নাচনি’ শব্দটি যে ‘নাচ’ জাত তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। তবে ‘নাচনি’ সম্প্রদায়কে জনপ্রিয় করে তুলেছে রাঢ় বাংলার পুরুলিয়া জেলা। আমরা জানি, দেবরাজ ইন্দ্রের রাজসভায় সুন্দরী নর্তকীদের নৃত্যের কথা। আমরা জানি বেহুলার নৃত্যকথা। তবে নাচনিদের নাচে একরকম নিজস্বতা আছে। শহর কলকাতা নাচনিদের নতুন করে চিনেছিল ২০১৩ সালে ‘নান্দীকার’ নাট্যদলের জন্যই। নাচনিদের জীবনের চাপা কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা সেখানে মেলে ধরেছিলেন সদ্য প্রয়াত অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। অনেক বছর আগে সাহিত্যিক মহাশ্বেতাদেবী লিখে গিয়েছেন, “পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়াতে নাচনি মেয়েদের মৃত্যু হলে, তাদের দাহ বা সমাধি হয় না। তার মৃতদেহ যায় ভাগাড়ে। বেজায় প্রগতিশীল রাজ্য সরকারের বেজায় প্রগতিশীল মহিলারা, পঞ্চায়েত স্তর থেকে মহিলা কমিশন অবধি যাঁরা দাপটে লেকচার দিয়ে বেড়ান, তাঁদের মনের চোখে গ্লুকোমা। কেন না তাঁরা নাচনিদের ন্যূনতম মানবাধিকার দেওয়ার কথা ভাবেন না।”

    এই মন্তব্যটি মহাশ্বেতাদেবী করেছিলেন বাম জমানায়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তাঁদের কিছু গোড়া-রক্ষণশীল মনোভাবের জন্য ঢাকাচাপা পড়ে গিয়েছিল কত গ্রামীণ শিল্প, বিশেষ করে মহিলাদের শিল্প। আজ যে নাচনিরা খুব আয়েশে আছেন তা নয়, কিন্তু দিনের শেষে লোকমুখে যখন নাচনিদের নাম ঘুরেফিরে আসে, তাতে ঘুমে চোখ বুজে আসে। চোখ বুজলে রঙীন স্বপ্ন আসে। সেই নাচনির শরীর জুড়ে নৃত্য কী অসামান্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন স্বাতীলেখা।

    গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ আর তাঁদের শিল্পজীবন নিয়ে বড়ো পরিসরের নাটক ‘নাচনি’। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘রসিক’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই নাটক সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত একবার বলেছিলেন, ‘‘নাচনিদের নিয়ে কাজ করা যেন সমাজের বিন্যাসটাকেই আবার খতিয়ে দেখা।” এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নাচনিদের না আছে বাবু, না আছে অর্থ। থাকার বলতে ওই একটা কণ্ঠ আর একটা শরীর। তাই দিয়ে যদ্দিন চলে। সুব্রত মুখোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে লিখেছিলেন, “যেন রাধাকৃষ্ণ-ভাবে উপনীত গান, কথায়ও বৈষ্ণব পদাবলীর ছাপ কাচ মরকত নবনী জড়িত/ কাঁচা মণিমুক্তো ননী জড়ানো সুকোমল তনু শ্যামল/ ও তার ভুরু দু’টি আঁকা ঈষৎ বাঁকা/ বাঁকা আঁখি দু’টি ঢলোঢলো।”ঢলোঢলো আঁখিতে পুরুলিয়ার পাথুরে মাটিতে যেন প্রাণ ঢেলে চলেন তাঁরা। নাটকেও দেখি দুই নাচনিকে। স্বাতীলেখা আর সোহিনীর অপূর্ব অভিনয়ে সেদিন পুরুলিয়া প্রাণ পেয়েছিল আরও একবার। নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন পার্থপ্রতিম দেব। প্রবীণা এবং নবীনা দুই নাচনির চরিত্রে স্বাতীলেখা ও সোহিনী যেন পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁদের জীবনেও আলাদা দুই রসিক (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং দেবশংকর হালদার)। দ্বন্দ্ব তাঁদের মধ্যেও। কিন্তু সেই একাকিত্ব আর যন্ত্রণাই আবার এক করে দেয় দুই নাচনিকে। স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত মঞ্চে চিৎকার করে যখন সংলাপ বলেন, “এ গানে বড়ো বেদনা আছে রে বাপ, সে বেদনা বুকে চাপ্যে রেখ্যে বেরিয়ে আসবে শুধু আনন্দ আর আনন্দ।” এমন সংলাপ যখন এক নাচনি বলেন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ান আরেকজন নাচনিই। নাচনির যন্ত্রণার ভাষা নাচনিরা ছাড়া আর কে-ই বা বুঝবে!

    এত কাণ্ড করে অর্থ উপার্জনের পরেও সংসারে তাঁদের ঠায় মেলে না। নাচনির টাকাতেই রসিকের এত ফূর্তি। অথচ মরার পর চিতায় পোড়ানো হয় না নাচনিকে, ডোম দড়ি দিয়ে বেঁধে ভাগাড়ে ফেলে দেয়। আসলে রসিকদের একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে। সেখানে তাঁদের কথাই শেষ কথা।স্বাতীলেখাদেবীর কন্যা ও অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ‘নাচনি’ প্রসঙ্গে ‘বঙ্গদর্শন’-কে জানান, “মা ভীষণ পাংচুয়াল ও পরিশ্রমী ছিলেন। নাচনির চরিত্রটা মা নিজেই নিজেই তুলেছিলেন। আসলে মা ছিলেন একজন পাকা অভিনেত্রী৷ এমনকি আমাদের রিহার্সালের সময় পুরুলিয়ার নাচনি সম্প্রদায় থেকে সরস্বতীদেবী এবং হরেরাম মুখোপাধ্যায়রা এসেছিলেন৷ দু-তিনদিন আমাদের সঙ্গে থেকে অনেককিছু শিখিয়েছিলেন।”প্রায় সাত বছর ধরে বাংলা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের মঞ্চে ‘নাচনি’ অভিনীত হয়েছে শ’য়ে শ’য়ে। আজ এতদিন পর হঠাৎ কেন এই নাটকের প্রসঙ্গ? কারণটা অবশ্যই স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। যাঁরা স্বাতীলেখাকে সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ দেখে চেনেন কিংবা চেনেন নান্দীকারের ‘ম্যাম’ হিসেবে। সেই যে ‘ঘরে বাইরে’-র বিমলা হলেন, তারপর তাঁকে মানুষ চিনল-জানল, অথচ সিনেমামুখো হলেন না আর। জীবন জুড়ে শুধুই থিয়েটার। সিনেপর্দায় এলেন বহু বহু বছর পর ‘বেলাশেষে’ ছবিতে (যদিও তার আগে ‘চৌরঙ্গ’ ছবিতে অতিথিশিল্পী হিসেবে তাঁকে দেখা গিয়েছিল)। দর্শক তা পছন্দ করল৷ কিন্তু সত্যিকারের স্বাতীলেখাকে এ বাংলার দর্শক খুব কমই দেখেছেন। তাঁর থিয়েটার বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাতীলেখা একজন জাত অভিনেত্রী। কেউই তার খবর রাখল না।

    আমার কাছে স্বাতীলেখা তাই ‘আন্তিগোনে’ আর ‘নাচনি’-র মতো কাজ। যেখানে একমাত্র তিনিই। তাঁর জন্যই ছুটে যেতেন দর্শক। উনি প্রয়াত হয়েছেন বেশ কয়েকদিন হল। অথচ মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না ঘুরেফিরে আসা সেই সংলাপ, “সে বেদনা বুকে চাপ্যে রেখ্যে বেরিয়ে আসবে শুধু আনন্দ আর আনন্দ।”

    ছবি সৌজন্যেঃ নান্দীকার

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @