‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে আবার তুমি আসবে কি?’ গাইলেন সুচিত্রা সেন

রমা দাশগুপ্ত থেকে সুচিত্রা সেন। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ‘ম্যাডাম’ এবং অতঃপর মহানায়িকা খেতাব – এ এক বিরাট জার্নির আখ্যানবলয়। আর একের পর এক খ্যাতির সিঁড়ি চড়তে চড়তে আত্মপরিচয়কে সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন ব্যক্তিত্বময়ী শব্দের অর্থক্ষেত্রে। আপসহীন জীবনে নিজের শর্তেই চলেছেন আজীবন। বেপরোয়া, সাহসী, অত্যন্ত বাকপটু সুচিত্রার নানা গল্প বাতাসে ভেসে বেড়ায় আজও। স্টারডাম, আভিজাত্যের সঙ্গে সততা, আত্মবিশ্বাস এমন বৈচিত্র্যময় স্বভাবে রহস্যময়ী রমণীয়ত্বের ঘেরাটোপ বরাবরই বজায় ছিল তাঁর। বাংলা সিনেমার সুবর্ণযুগকে চিহ্নিত করতে করতে এগিয়েছে যে প্রজন্ম, সেই প্রজন্মের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। একটা নাম, একটা ব্র্যান্ড। আর এ সবকিছুই নিজের স্বাতন্ত্র্যে।
একবার ‘কমললতা’ সিনেমার শ্যুটিং চলছে। নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। পরিচালক নারায়ণবাবুকে অনুরোধ করলেন, যদি বাড়ি এসে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় একটু বুঝিয়ে দেন। পরে সুচিত্রা সেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘দাদা, ঠিক হচ্ছে তো?’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত এই সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছিলেন স্বয়ং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। তাই সুচিত্রা ঠিক মানুষকেই প্রশ্নখানি জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
সুচিত্রা সেন অভিনীত বাংলা ছবিগুলিতে গানের বিরল সম্ভার। ঢুলি, অগ্নিপরীক্ষা, সবার উপরে, সাগরিকা, শিল্পী, চন্দ্রনাথ - অসংখ্য ছবি আর অসংখ্য গান। সেসব গানের শিল্পীরা দিকপাল, সন্দেহ নেই। কিন্তু অসামান্য লিপ দেওয়ার গুণে গানগুলি মহানায়িকারই গান হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন “প্রতিটি গানেই লিপের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন সুচিত্রা। ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ গানটির ‘মিতা মোর কাকলি কুহু’ কথাগুলো যেখানে আসছে, ওই জায়গাগুলোয় লিপ দেওয়া কিন্তু ভীষণ কঠিন। বিশেষ করে ‘কুহু’ শব্দের আন্দোলনের যে বৈচিত্র্য তা পর্দায় এমন ভাবে লিপ দেন সুচিত্রা যা দেখে দর্শকরা আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন।”আসলে এমনটা তখনই সম্ভব যখন গানের অন্দরে নিজের মতো করে প্রবেশ করা যায়। গানের ভাব আর নিজের মনের ভাবনাকে একাত্ম করা যায় এবং সর্বোপরি গান গাইবার ওপর প্রচণ্ড দখল রাখা যায়। এর সবটাই ছিল মহানায়িকা সুচিত্রা সেন-এর। যদিও আপামর বাঙালির ঘরে সুচিত্রা সেনের স্ব-কণ্ঠে গান গাওয়ার খবর রাখা নেই তথাপি এ ঘটনাটিও সত্যি যে তিনি গান গাইতে জানতেন এবং গানের রেকর্ডও করেছিলেন।
সেটা ১৯৫৯ সাল। ২৭শে জুলাই। একটি বিশেষ রেকর্ড কভারে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির কর্ণধার কমল ঘোষ অনেক আশা নিয়ে একটা নতুন ঘটনা ঘটালেন। তিনি সুচিত্রা সেনের স্ব-কণ্ঠে গানের রেকর্ড প্রকাশ করলেন। নায়িকা সত্ত্বা থেকে তিনি বার করে আনলেন সুচিত্রার গায়িকা সত্ত্বাকে। এই রেকর্ডের একপিঠে রয়েছে ‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে’ আর অন্যপিঠে ‘বনে নয় আজ মনে হয়’। এসব গানের কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আর সুর দিয়েছিলেন রবীন চট্টোপাধ্যায়। ‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে’ গানটি মিউজিকের সাথে শুরু করার আগে প্রথম শব্দকটি মুখে বলেছিলেন সুচিত্রা সেন। যেন শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন। যেন জিজ্ঞাসা করছেন তাঁর গানের নিমন্ত্রণে শ্রোতা সাড়া দেবে কি? যেমন ভাবে তাঁর ছবির জন্য সবাই পাগল হয় তেমনটাই হবে কি তাঁর কণ্ঠে গান শুনে? এক বিরাট প্রশ্ন নিয়ে ও প্রশ্ন দিয়েই গানের জগতে পা ফেলেছিলেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু কী পেয়েছিলেন তিনি?
বিখ্যাত ‘প্রসাদ’ পত্রিকায় লেখা হল “দরদি কণ্ঠে বেশ কিছু বছর আগে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে বলেছিলেন ‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে আবার তুমি আসবে কি?’ কিন্তু সেদিনের সেই গানের নিমন্ত্রণে সাড়া তিনি বিরাট ভাবে পাননি। আর সেই কারণেই বুঝি হৃদয়ের সংগীত সত্ত্বাকে শুধু মাত্র হৃদয়ের পিঞ্জরেই বন্দি করে হারিয়ে গিয়েছেন জনগণের সূক্ষ্ম বিচার কক্ষ থেকে আজকের জনগণবন্দিতা সুচিত্রা সেন।”