“সুনীল-শক্তি যুগলবন্দী/পয়সা লোটার নতুন ফন্দি”—লিখেছিলেন তুষার রায়

৪৭ বছর আগে এমনই এক শ্রাবণে প্রকাশ পেয়েছিল ‘যুগলবন্দী’। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যৌথ কবিতার বই। গোটা কলকাতা জুড়ে বেশ একটা হইহই পড়ে গেল। কবিতার জগতে ডুয়েট তো বিশেষ দেখা যায় না। তাও আবার সুনীল-শক্তির ডুয়েট! সবজে রঙের মলাট, প্রথমে সুনীলের ২১টি কবিতা, তারপর শক্তির কবিতা ২২টি। সঙ্গে দুজনেরই লেখা একটি করে গদ্য। সুনীলের লেখা গদ্যের নাম ‘সত্যবদ্ধ অভিযান’ আর শক্তির লেখাটির শিরোনাম ‘কবিতা কলকাতা খেলাঘরে’।
এই বই ঘিরে আলাপ-আলোচনা-আড্ডা জমল কফি হাউজেও। তুষার রায়-ও সেই বই হাতে পেলেন। টেবিল ঘিরে বসে থাকা সুনীল ও শক্তি দু’জনেই উন্মুখ। তাঁদের এই অদ্ভুত কবি-বন্ধুটি কী বলেন বইটি নিয়ে! তুষার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বললেন, “সুনীল-শক্তি যুগলবন্দী/পয়সা লোটার নতুন ফন্দি।” শুনেই হো হো করে হেসে উঠেছিলেন সুনীল ও শক্তি দু’জনেই। না হেসে আর উপায়ও ছিল না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য’ বইতে পরে লিখেছিলেন, “সেই ‘যুগলবন্দী’র জন্য আমরা দু’পাঁচ টাকাও পেয়েছিলাম কিনা সন্দেহ!”
আরো পড়ুন
হেমন্তের অরণ্যের সেই পোস্টম্যান
এই তথ্যে অবশ্য তুষার রায়ের কিচ্ছুটি যেত-আসত না। সরল, উদাসীন, মৃত্যু-বিলাসী অথচ রসিকতা-প্রিয় ছোটোখাটো চেহারার মানুষটি সুনীল ও শক্তিকে নিয়ে অকাতরে মজা করার অধিকারী ছিলেন। অধিকার অবশ্য কে কাকে দেয়! ময়দানের মুক্ত মেলায় যে পুলিশটিকে উদ্দেশ্য করে তুষার ছড়া কেটেছিলেন- “পুলিশ, কবিকে দেখে টুপিটা তুই খুলিস”, তিনি কি আর তুষারকে অধিকার দিয়েছিলেন এহেন ছড়া কাটার! তুষার রায়ের তাতেও কিচ্ছুটি যায়-আসেনি। তুষারের রসবোধ তাঁর কবিতার মতোই তীক্ষ্ণ, তাঁর মৃত্যুর মতোই আকস্মিক।
বন্ধুত্বে অবশ্য একটা উজাড় করা অধিকার থাকে। শক্তি আর সুনীলের বন্ধুত্ব নিয়েও তো কতই না লেখা হয়েছে। শব্দের পর শব্দ। স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে নাকি শক্তি একবার বলেছিলেন, “জানো, তোমার বর আমায় মেরেওছে! ওর মার খেয়েই আমি এখনও কানে একটু কম শুনি!” এহেন অবাক করে দেওয়া তথ্যের পরে আমাদের আরো অবাক করে দিয়ে স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় নিরাসক্তভাবে লেখেন, “সুনীলের হাতের পাঞ্জাটা খুব বড় ছিল তো! সুনীলও পরে বলেছিল, শক্তিকে সামলাতে কখনওসখনও একটু-আধটু অমন করতে হতো। এ সবই ওরা যখন দল বেঁধে রাতের কলকাতা শাসন করত, তখনকার ঘটনা।” এবং উপসংহারে সেই অমোঘ সত্যিটা, “কিন্তু তখনকার এ সব ঘটনা ওঁদের বন্ধুত্বে কোনও দিন ছায়া ফেলেনি।”
দূরত্ব কি কখনোই ছায়া বাড়ায়নি সুনীল-শক্তির যুগলবন্দীর মাঝে? বাড়িয়েছিল হয়তো। যে সুনীলের বাড়ি এসে মাতাল হয়ে রাতে প্রলাপ বকতেন শক্তি, যে বাড়িতে নিজের মেয়েকে ফেলে রেখে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছিলেন, সেই বাড়িতেও আসা-যাওয়া ক্ষীণ হয়েছিল তাঁর। কিন্তু তাতে কী বন্ধুত্বের শিকড় ছেঁড়ে? সেই কবে অ্যালেন গিন্সবার্গ ওঁদের দু’জনকে, বেশি নয়, দু’টো করে বড়ি দিয়েছিলেন। শক্তি-সুনীল অবশ্য একটার বেশি খাওয়ার সাহস পাননি। তারপর সুনীল ফিরে গিয়েছিলেন ছোটোবেলায়, নিজেকেই দেখেছিলেন নিজের সামনে। অনেকগুলো লাল রঙের ফুটকি, আলপথের ওপর একটা ছোটো ছেলে। সেই কি শিকড়? আর, শক্তিও হয়তো ফিরে গিয়েছিলেন ঢেকে রাখা অবচেতনের স্মৃতিতে। খুব কষ্ট হয়েছিল তাঁর। বড়ি খেয়ে কোথায় সুখে ভুরভুর করবে চারপাশ, তা নয়... সুনীল-শক্তির যন্ত্রণার যুগলবন্দী এখানেও ক্লিক করে গেছিল।
আর গেছিল ১৯৯৫ সালের ১৯ মার্চ। সুনীল ও শক্তি দুজনেই তখন শান্তিনিকেতনে। দোল কেটে যাওয়ার পর অপ্রত্যাশিত নির্জনতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে পেয়েছিলেন শক্তি। মদ্যপানের আগেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন নতুন করে ‘কৃত্তিবাস’ বের করার। সুনীলকে বলেছিলেন, “বেশ বড় করে, দামামা-জয়ঢাক বাজিয়ে যদি কৃত্তিবাস আবার বেরোয়? শুধু কবিতার কাগজ। তুমি মাঝখানে যে পাঁচমিশেলি মাসিক কৃত্তিবাস করেছিলে, সে রকম না, আগেকার মতন। তুমি আর আমি দু’জনে সম্পাদক, আমি সব ব্যবস্থা করব।” সুনীল রাজি হওয়াতে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়েই শক্তি বলেছিলেন বিজ্ঞাপন জোগাড় করে আনার কথা। পত্রিকার সমস্ত খরচ চালিয়ে নিজের জন্যেও কিছু থাকবে নিশ্চয়ই।
দুই বন্ধু সেদিন বারবার ফিরে গেছিলেন অতীতে। উদ্দামতায় নয়, মৃদুমন্দ হেঁটেছিলেন লালমাটির পথে। হঠাৎ মহুয়া ফুলের গন্ধ পেয়েছিলেন শক্তি। সুনীল সেই গন্ধ চিনতে পারেননি। এরপর হাঁটতে হাঁটতে বুকে চাপ চাপ ব্যথা করেছিল শক্তির। বাকিদের দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “হার্ট-ফার্ট সব ভালো আছে। এখন ঠিক হয়ে গেছি।” ফেরার পথে সুনীলকে ফের বলেছিলেন, “...দিন সাতেক বাদে আমিও একবার কলকাতায় যাচ্ছি। তখন কৃত্তিবাসের ব্যাপারটা একেবারে পাকাপাকি করে ফেলতে হবে। সময় নষ্ট করে লাভ নেই, এই পঁচিশে বৈশাখ থেকেই। সুনীল, দেখো, আমি এমন কাগজ করব যে, আবার একটা তুলকালাম শুরু হয়ে যাবে। ”
এরপরে আর শক্তির সঙ্গে দেখা হয়নি সুনীলের। চারদিন পরে তুলকালাম করা একটা দুঃসংবাদ অবশ্য এসেছিল সুনীলের কাছে। মহুয়া ফুলের গন্ধের মতোই নাকি উড়ে গেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। শান্তিনিকেতনে তখন নাকি হুহু করা একটা বাতাস বইছিল বসন্তের। সে বাতাসে প্ররোচনা ছিল কি কোনো? কিংবা গিন্সবার্গের দেওয়া সেই বড়ির থেকেও বড়ো কোনো নেশার টান? এই গল্পের ভাগশেষে অতএব পরে রইল কী? একটা অসমাপ্ত যুগলবন্দীর খসড়া আর বন্ধুত্ব।
সুনীলের পাঞ্জার জোরের থেকেও তাঁদের বন্ধুত্বের জোরটা কিঞ্চিৎ বেশিই ছিল হয়তো।