বয়রা কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দির গড়লেন দারোগা নাজিমুল

‘আরে মনমাঝি তোর বৈঠা নে-রে
আমি আর বইতে পারলাম না...’
কান্নার মতো গানেরা ভেসে বেড়ায় শ্রীমতী নদীতে। নদী আর কই? একসময় নাকি বড়ো বড়ো নৌকো যেত তার ভরাট বুকের ওপর দিয়ে। আজ সেই বুকেই জমাট শ্যাওলা, পলি, ধানক্ষেত। দেখলে মনে হয়, যেন ছোটো ছোটো জলাধার সাজানো অনেকটা জায়গা জুড়ে। তবু, শ্রীমতী বইছে। বইছে বাধা পড়া মাটি, শ্যাওলার তলা দিয়ে। বইছে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের ওপর দিয়ে। যেভাবে বইছে তাকে ঘিরে থাকা গল্পরাও। নদীর এমন নামও হয়! শ্রীমতী তো নদী নয় নিছক, সে তো কন্যে। বাংলাদেশ থেকে এঁকেবেঁকে সে উজিয়ে এনেছে কতকালের জমাট বাঁধা বিরহের সুর। এক নর্তকী আর রাজকুমারের প্রেমের আখ্যান বোনা সেইখানে।
আরও পড়ুন
যে নদীকে জয় করা যেত না একদিন
সে কবেকার কথা। দুই বাংলার মাঝে তখন কাঁটাতারের কথা ভাবতেও পারে না কেউ। অধুনা বাংলাদেশের কোনো একটি গ্রামে তখন বাস করত শ্রীমতী নামের নর্তকী। তার মতো অসামান্য সুন্দরী নাকি আর একটিও নেই দেশে। শ্রীমতীকে দেখে প্রেমে পড়লেন রাজকুমার। নিয়মিত দেখা করায় বাধা হয়ে উঠল দুর্গম পথ। রাজবাড়ি থেকে সেই গ্রামে আসার কোনো পাকা রাস্তা নেই তখন। তখন শ্রীমতীর গ্রামের পাশে বিরাট এক বিল থেকে মহানন্দা পর্যন্ত একটি নদীপথ কাটালেন রাজকুমার। চারপাশের মানুষজন ধন্য ধন্য করে উঠল। আর রাজকুমার একদিন নৌকা নিয়ে গেলেন সেই বিলের কাছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সন্ধেবেলা অভিসারে এল শ্রীমতী। রাজকুমার তাকে নৌকায় তুলে হাজির হলেন নদীর পাড়ে মহাকাল মন্দিরে। সেখানেই বিয়ে হল দুজনের।
এদিকে নিচুজাতের মেয়েকে রাজকুমার বিয়ে করেছে শুনে রেগে আগুন হয়ে গেলেন রাজা। রাজকুমারকে বন্দী করলেন তিনি। শ্রীমতীকে নৌকায় বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হল রাজকুমারের কাটা ঐ নদীতেই। এ কথা শোনার পর যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খায় রাজকুমারকে। নদীর সঙ্গে বয়ে যায় সময়। রাজকুমার একদিন রাজা হন। তার ক্ষত তখনো মোছেনি। ঐ নদীর নামকরণ তিনি করেন স্ত্রী শ্রীমতীর নামে। তিনি তখনো শ্রীমতীর প্রেমেই সমর্পিত। এমন রাজকুমারকে দেখে অবাক হয় মানুষজন। লোকমুখে ক্রমে ঐ জায়গাটির নাম হয়ে গেল পতিরাজপুর।
শ্রীমতীর প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে লেপ্টে এই প্রেমের কাহিনি, যন্ত্রণার শব্দেরা। শ্রীমতী নিজেই যেন সেই নর্তকী, না হওয়া রানি। একসময়ের ভরাট যৌবন আজ মরে এসেছে। তবু, লোককথার সূর্য আজো ঘুম চোখ মেলে শ্রীমতীর ওপর। আদর করে স্থানীয়রা তাকে ডাকে চিরামতী।
আরও পড়ুন
বাঁকা একটি নদীর নাম
কালিয়াগঞ্জ আদতে নদীর দেশ। এর বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে নয় নয় করেও ন’টি নদী। টাঙ্গন, কুমারী (কুমড়ি), বালিয়া, তুলসী, রোহিতা (রুহিতা), চাপাই, গামারি, বীণা এবং শ্রীমতী। নবম শতকে মহেন্দ্রপালের তাম্রশাসনে যে ‘টঙ্গিল নদী’-র উল্লেখ পাই, তাই আজকের টাঙ্গন। মানিক দত্তর ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এও উঁকি দিচ্ছে এই নদী। বালিয়া, তুলসী, গামারিদের ঘিরে গল্পরাও ছলাৎ-ছলাৎ উঁকি দেয় স্রোতে। এই দেশের গল্পে-ভাষায়-লোকবিশ্বাসের ভিতর দিয়েও নদী বইছে। খাল-বিল-নদীতে মাছ ধরার সময় প্রথম মাছটি ভাঁড়ে রাখতে গিয়ে ছড়া কাটেন স্থানীয় মানুষ— ‘ভোর গান্ডা ভোর/ সবারে ভাড়ালা-লোড়োর-রোবোড়/ মোর ভাড়াডা উথলে পোড়’। এই ছড়া কাটলে নাকি বেশি মাছ ধরা পড়বে জালে। দস্যি ছেলেকে ঘুম পাড়াতে গিয়েও ছড়া কাটেন মা—‘আদানি লো কাঁদানি বাঁশবনে বাসা/ নাক কাটব চুল কাটব, করব নদী পার/ আমার খোকন কাঁদে না যেন আর।’ মাছ ধরতে যাওয়ার আগে আজো মাছের লেজ খেতে চায় না স্থানীয় পুরুষরা। যদি কেউ খায়, তাহলে সে নাকি মাছ পাবে না সেইদিন।
এমনই নদীঘেরা দেশের অন্যতম প্রধান নদী শ্রীমতী। বাংলাদেশের এক বিল থেকে উৎপন্ন হয়ে কালিয়াগঞ্জের মিত্রবাটির ভিতর দিয়ে সে দক্ষিণে বয়ে গেছে। মিত্রবাটিতে শ্রীমতী নদীর ওপরে কাঁটাতার। দুই দেশ আলাদা হলেও ওপারের গল্প এইপারে ভেসে ভেসে আসে। শ্রীমতীর ভরা যৌবনে তার বুক বেয়েই ধনকৈল আর গুদরিবাজারের নদীবন্দরে বাণিজ্য করতে যেতেন বণিকরা। চলত পরিবহনও। স্বাধীনতার আগেও এমনটা দিব্বি দেখা যেত। অথচ আজ মরে আসা শ্রীমতীকে দেখলে সেইসব গল্পকে অলীক মনে হয়।
শ্রীমতী মরে আসছে। নদীর বুকেই চলছে ধানচাষ। ধুঁকতে ধুঁকতেই ভেলাই হাটের পাশ দিয়ে অনন্তপুর, মজলিশপুর হয়ে ধনকৈল মৌজায় চলেছে সে। পাশেই শ্মশান। নদীতীরে ঘাসের ঢিবিতে মাছের ঝাঁক। সেই লোভে বকেরা ভিড় করে। শ্রীমতীর চলা থামে না। এঁকেবেঁকে সিংতোর। এখানেও নিঝুম শ্মশানঘাট একলা পড়ে থাকে দুপুর-রাত্রে। সিংতোর পেরিয়ে হলদিবাড়ি, ধামজা ছুঁয়ে দিলালপুর বা দেলওয়ারপুর। শ্মশানঘাটের কাছে গাছপালায় ঢাকা মাটির তৈরি বিরাট অশ্বারোহী মূর্তি। সামান্য দূরেই একটা ঢিবি। স্থানীয় বিশ্বাসে এটি দেবতার থান।
আরও পড়ুন
মুখোশেই নিজের মুখ দেখে দিনাজপুর
সাম্প্রদায়িক বিষে রোজ কেমন বদলে বদলে যাচ্ছে আমাদের চারপাশটা। অথচ, সম্মিলনের গত গল্প জন্ম নেয় শ্রীমতীকে ঘিরে। এই দিলারপুরেই শ্রীমতীর তীরে অঘ্রানমাসে পিরপুজো হয়। দু’দিনের মেলা বসে। আশপাশের গ্রাম থেকে উজিয়ে আসেন মানুষ। ধর্মের পরিচয়কে তীর্যক দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়নি এই উৎসবের আবহ। এই মৌজাতেই বাসন্তী মন্দির। বাসন্তী পুজো উপলক্ষে চৈতাবাণী মেলাতেও ঢল নামে মানুষের। দিলারপুর পেরিয়ে এরপর খানিকটা এগিয়ে শ্রীমতী মিশে গেছে তুলসী নদীর সঙ্গে। রাজকুমারের গল্পের সেই মহানন্দা তাহলে কোথায় গেল? যাহোক, গল্পকে প্রশ্ন করতে নেই।
এই শ্রীমতীর পাড়েই বিখ্যাত বয়রা কালীর মন্দির। রায়গঞ্জ-বালুরঘাটগামী ১০ নং জাতীয় সড়কের পাশে এই জাগ্রত দেবীর প্রতিষ্ঠা ইতিহাস নানা ধোঁয়াশায় ঘেরা। কিন্তু, এই মন্দিরের অলীক গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এক দারোগা-- খন্দকার নাজমুল হক।
শ্রীমতী তখন খরস্রোতা। বণিকদের নৌকো তার স্রোতের সঙ্গে যুঝেই আসত গুদরিবাজার, ধনকৈল হাটে। ধনকৈল হাট তখন আরো বিরাট। লঙ্কা, পেঁয়াজ আর পাটের বিপুল বিকিকিনি চলত। কথিত, কয়েকশো বছর আগে এই বণিকরাই নদীতীরের জঙ্গলের ভিতরে একটি বয়রা গাছের নিচে প্রচলন করেন কালীপুজো। কেউ কেউ আবার বলেন, এই কালীপুজো আসলে শুরু করেছিল ডাকাতরা। যাই হোক, বয়রা গাছের নিচে পুজো শুরু বলে নাম হল বয়রা কালী। আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক বধির ভক্ত এই মন্দিরে মানত করার পর কানে শুনতে পেয়েছিল। সেই থেকেই নাকি নাম বয়রা কালী।
এই কালীর থান নাকি দীর্ঘদিন পড়েছিল অযত্নে। ইতিমধ্যে ১৯৩২ সালে কালিয়াগঞ্জের দারোগা হয়ে আসেন খন্দকার নাজমুল হক। নাট্যপ্রেমী মানুষ। স্থানীয়দের নিয়ে হইহই করে নাটক অভিনয় করাতেন। একদিন দারোগা স্বপ্নাদেশ পেলেন বয়রা কালীর। তাঁরই প্রচেষ্টায় এরপর তৈরি হল মন্দির। সেই মন্দিরের খ্যাতি আজ পৌঁছে গেছে দূর-দূরান্তরে। এখন প্রতিমা অষ্টধাতুতে গড়া। গা-ভরা গয়না। ভক্তদের কাছে তিনি পরম জাগ্রত। কালীপুজোর রাতে নাকি শহরে বেড়াতে বের হতেন তিনি। কতজন শুনেছে তাঁর নূপুরের শব্দ। সেইসব গল্পেরা এখানে বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ায়। কালীপুজোর রাতে উথলে পড়ে মানুষ। আর, এমন একটি জাগ্রত দেবীর থানের সঙ্গে বড়ো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকেন এক মুসলমান দারোগাও। নাট্যপ্রেমী নাজমুলের স্মৃতিতে এখানেই গড়ে উঠেছে ‘নজমু নাট্য নিকেতন’।
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে চেনা বাংলা বদলে বদলে যাচ্ছে রোজ। সেই আবহের মধ্যে দাঁড়িয়ে বয়রা কালী-নাজমুল দারোগার এইসব গল্পকে ভারি আপন লাগে যুক্তিবোধকে কিছুক্ষণের জন্য মুলতুবি রেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে সব। এভাবেই বেঁচে থাক না সম্মিলনের গল্পগুলো। পিরপুজো, নাজমুল দারোগা, চৈতাবাণীর মেলা—সব বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক শ্রীমতীও। কোনো এক অলীক ভোরে তার বুকে ফিরে আসুক হারানো স্রোত। নদীদের বেঁচে থাকতে হয়। নদীরাই যে বাঁচিয়ে রাখে কতকিছু...
তথ্যঋণ: কালিয়াগঞ্জের নদী ও সংস্কৃতি, দিবাকর প্রামানিক, উত্তর দিনাজপুর জেলার নদী, ডঃ বৃন্দাবন ঘোষ, বাংলার লোকসংস্কৃতি, আশুতোষ ভট্টাচার্য।