No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    সারা গায়ে রং ঢেলে শিক্ষককেই বহুরূপী সাজাল মাছরাঙা, রাজহাঁসেরা

    সারা গায়ে রং ঢেলে শিক্ষককেই বহুরূপী সাজাল মাছরাঙা, রাজহাঁসেরা

    Story image

    একসঙ্গে বসে পাতায় রং মাখাচ্ছে কতগুলো ছোট্ট-ছোট্ট ছেলেমেয়ে। তারা ‘মাছরাঙা’। আর, তাদের চাইতে বয়সে যারা একটু বড়ো, ক্লাস ফোর বা ফাইভ-সিক্সে পড়ে, তারা হল ‘রাজহাঁস’। এগুলো সব বিভাগের নাম। নাইন-টেন-ইলেভেন-টুয়েলভের ছাত্র-ছাত্রীরাই যেমন ‘চাঁদের পাহাড়’ বিভাগের অন্তর্গত। ভারি মজা তো। ‘রং মাটির কর্মশালা’-য় কিন্তু বিভাগের নামেরা নামমাত্র নয়। কচি ছানারা রং-পেন্সিল হাতে পেলেই আঁকে নদী, মাছ। তাই মাছরাঙার সঙ্গে তাদের বিশেষ পরিচয়-পর্ব চলছে এখন। একইভাবে একটু বড়োরা আলাপ জমাচ্ছে রাজহাঁসের সঙ্গে। এখানে এমনই নিয়ম। নিয়ম আছে, ডিসিপ্লিনও। তবে চোখ রাঙানি নেই, ভয় নেই, বকুনি নেই। আছে নতুন আবিষ্কারের লুটোপুটি নেশা।

    এ এক মজার কর্মশালা। এখানে জড়ো হওয়া ছেলে-মেয়েদের অধিকাংশই এই প্রথম দেখছে প্যাস্টেল রং, দেখছে তুলি। অবাক হয়ে খাতায় রং বোলাতেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে মুখে। সবাই অবশ্য ছোট্টটি নয়। রং-পেন্সিল নিয়ে ভোঁৎ হয়ে বসে থাকা ক্লাস ওয়ানে পড়া ছানাটির থেকে সামান্য দূরেই বসে তার দিদি। ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ে। সে একমনে বানাচ্ছে মাটির পুতুল। আগে কক্ষনো বানায়নি। এই খানিক আগে শিখেছে মাটিকে কীভাবে আদল দিতে হয়। কাঁচা হাতে সে শেখারই উদযাপন চলছে। উদযাপন চলছে যেন গোটা গ্রামেই। বীরভূমের এককোণে লুটিয়ে থাকা গৌড়নগরে।

    এমন পরিকল্পনা যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত তিনি হলেন উজ্জ্বল পাল। কদিন আগেই প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাইকেল নিয়ে ছুঁয়ে এসেছেন চাঁদের পাহাড় কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সাইকেল নিয়েই ঘুরে-বেড়ান দেশ-বিদেশ। সঙ্গে ‘গ্রিন অন হুইল’-এর বার্তা—‘জীবনে অন্তত একটি গাছ লাগান এবং তাকে বড়ো করে তুলুন।’ এই গৌড়নগরেই তাঁর মাটির বাসা ‘মন মঞ্জিল’। এহেন উজ্জ্বলবাবু বছর দুয়েক আগে ভাবলেন, গ্রামের ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে কিছু একটা করা যাক। কিছু বলতে এক্কেবারে নতুন কিছু। এইসব কচি-কাঁচাদের বেশিরভাগই গরিব। স্কুলে পড়লেও অনেককিছুর স্বাদ থেকেই তারা বঞ্চিত। তারা অনেকে রং-পেন্সিল দেখেনি, দেখেনি তুলি-জলরং। কাগজ পেঁচিয়ে কুইলিং কীভাবে বানায়, সেও জানে না অনেকেই। জীবনের এই প্রান্তটি অদেখাই থেকে যেতে পারে এদের আজীবন। অথচ, একটা-দুটো জানলা খুলে গেলেই হয়তো নতুন পৃথিবী চোখে পড়ত ওদের।

    উজ্জ্বলবাবু ভাবলেন এমন একটি কর্মশালা হোক, যেখানে দুদিন সবাই আঁকবে, মূর্তি গড়বে, কোলাজ বানাবে। শুধু তাই নয়, এরই ভিতর দিয়ে শিখবে জীবনের নানা মূল্যবান পাঠ। সেই থেকেই জন্ম ‘রং মাটির কর্মশালা’র। এসবই বছর দুয়েক আগের কথা। এক-দুই-তিনবারের পর গত শনি ও রবিবার, গৌড়নগরের প্রাইমারি স্কুলে বসেছিল চতুর্থ ‘রং মাটির কর্মশালা’র আসর। 

    কর্মশালা শব্দটা ভারী। ওসব হয়তো বোঝে না গ্রামের ছোট্টরা। তারা জানে, এই দুদিন তাদের নতুন আকাশ ছোঁয়ার সুযোগ। নানান কিছু শেখার সুযোগ। তাই এমন উদ্যোগের খবর গৌড়নগর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল আশপাশের গ্রামেও। লাগোয়া দুটি গ্রাম আসেঙ্গা এবং আমাইপুর থেকেও তাই উজিয়ে এল বেশ কয়েকজন খুদে। এই আয়োজনে তারাই বা বাদ থাকে কেন! সব মিলিয়ে মোট ৮৭ জন ছেলে-মেয়ে মিলে হইহই কাটানো দু-তিনটে দিন। 

    এ তো নেহাত ছোটো আয়োজন নয়। এত্তগুলো ছেলেমেয়ে। তাদের জন্য এলাহি রং-পেন্সিল-কাগজ জোগাড় করতে হবে। লাগবে অন্যান্য হাতের কাজের নানা সরঞ্জাম। তাছাড়া, এদের আঁকা, হাতের কাজ শেখানোর মানুষ চাই। সবাই খাবে একসঙ্গে। তার জন্যও ব্যবস্থা করা চাই। সব মিলিয়ে বেশ বড়ো কর্মকাণ্ড। উজ্জ্বল পালের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিবারই এগিয়ে এসেছেন দূর-দূরান্তের অনেকে। এঁরা প্রত্যেকেই উজ্জ্বলবাবুর বন্ধু বা পরিচিত। কেউ শান্তিনিকেতন থেকে, কেউ বা কলকাতার আর্ট কলেজ থেকে পৌঁছে গেছেন গৌড়নগরে। উজ্জ্বলবাবুর বাসাতেই থেকেছেন, খেয়েছেন দু’দিন। তারপর, মিশে গেছেন কচি-কাঁচাদের সঙ্গে। কেউ শিখিয়েছেন রং করতে, কেউ শিখিয়েছেন মূর্তি গড়া, কেউ বা কাগজ কেটে কোলাজের কাজ, কেউ দেখিয়ে দিয়েছেন, কেমন করে কাগজ ভাঁজ করে তৈরি করা যায় পাখি-ফুলের বাহার। 

    ছোটোদের রং-পেন্সিলের জোগানও দিয়েছেন অনেকে। বালিচকের সুব্রত জানাই যেমন। প্রথমবারের খাতা-রং-পেন্সিলের সবটাই দিয়েছিলেন তিনি। নিজে এবারেও এসেছেন। শিখিয়েছেন রং, হাতের কাজ। গ্রামের মানুষজনও সামিল হন এই নতুন পরবে। কলেজ পড়ুয়ারা সাহায্য করে বাজার করায়, হাত লাগায় জোগাড়ের কাজে। উজ্জ্বলবাবুর নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না। তাতে কী! কচিদের মতো বড়োদের আনন্দটিও মাপা যাবে না।

    এখানে শেখাগুলোও ভাগ ভাগ করে হয়। খানিক আগে যারা আঁকছিল, কিছুক্ষণ পরে তারাই মাটি মাখবে। তারপর শিখবে মূর্তি গড়া। এরপরে কুইলিং-এর কাজও শিখবে। আর, সব কাজ হবে দল বেঁধে। সমস্ত জিনিস ভাগ করে নেবে সবাই। পর্যাপ্ত রঙের বাক্স থাকলেও উজ্জ্বলবাবু ঠিক করেছিলেন, এক-একটা বাক্স থেকেই রং নিয়ে আঁকবে তিন-চারজন। ভাগ করে আনন্দ মেখে নেওয়ার শিক্ষাটা বোনা হবে এখান থেকেই। সহজ পাঠ।

    তাই এই কর্মশালায় কোনো ভেদাভেদ নেই। বাগদী, চাষি, বায়েন পরিবারের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে কাটায়, আনন্দ করে, শেখে, নতুন বন্ধু পাতায়, অবসরে এক্কা-দোক্কা খেলে। একাকার হয়ে যায় ব্রাহ্মণ আর সাঁওতাল পরিবারের সন্তান-সন্ততিরা। অনেক পরিবারেই দারিদ্র জমাট বাঁধা। পরিবেশও সুস্থ নয়। এই দুটো দিন ফিরে এলে কচিগুলো যেন নতুন প্রাণ পায়। বাড়ি থেকে, চারপাশ থেকে শেখা খারাপ শব্দগুলো ভুলেও ব্যবহার করে না কেউ। ঝগড়া, কাড়াকাড়ি খুব চেষ্টা করেও নজরে পড়বে না। বরং দেখা যাবে আদুরে খুনসুটি, আলোর মতো সব্বার মুখ, একসঙ্গে খাওয়া, অঢেল বাঁচা...

    কাল ছিল বসুন্ধরা দিবস। দেখা গেল, কয়েকজন মিলে রঙে রাঙিয়েছে আঁকা শেখাতে আসা দুই শিক্ষককে। সারা গায়ে রং করার পর অনেকটা আফ্রিকান বহুরূপীর মতো লাগছে তাঁদের। তারপর, সবাই মিলে চটের বস্তায় নানাকিছু লিখে ঘুরেছে গোটা গ্রাম। বৃক্ষরোপণ করেছে গ্রামে। এবারের মতো ‘রং মাটির কর্মশালা’-র এখানেই ইতি। আবার অপেক্ষা। ডাক এলেই হইহই করে ছুটে আসবে সব্বাই।

    উজ্জ্বল পাল বলছিলেন, এই কর্মশালার পর গ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। এখন এই ছোট্টদের অনেকেই নিয়মিত আঁকে, হাতের কাজ করে। জীবনকে নতুনভাবে চিনছে ওরা। বলতে বলতে উজ্জ্বলবাবুর চোখটাও চকচক করে। আর ঐসব খুদেরা? তারা যে আকাশের স্বাদ পেয়েছে। এবার ডানা মেলার পালা।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @