No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    টেবিলে মানুষের খুলি-হাড়গোড় ডাঁই করে ছবি আঁকতে বসতেন ময়ূখ চৌধুরী  

    টেবিলে মানুষের খুলি-হাড়গোড় ডাঁই করে ছবি আঁকতে বসতেন ময়ূখ চৌধুরী  

    Story image

    প্রসাদ রায় অথবা শক্তিপ্রসাদ রায়চৌধুরী। এককালে নাম উঠেছিল পুলিশের খাতায়। ব্রিটিশ পুলিশ চর লাগিয়েছিল স্ট্রিট ফাইটের জন্যে। ভবানীপুর থানার সামনে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে অশ্লীল কথা বলছিল ছেলেছোকরারা। সহ্য করতে পারেননি যুবক। বক্সিংয়ের সুশিক্ষিত মারে ধরাশায়ী দু’জন। আততায়ী ফেরার। এই ঘটনার কয়েকবছর পর সেই যুবকের নাম ছাপার অক্ষরে দেখা যাবে। না, খবরের কাগজে নয়, সন্দেশের পাতায়। সাদাকালো ধারাবাহিক কমিকস। ‘মরণ খেলার খেলোয়াড়’। চিত্রকর প্রসাদ ওরফে শক্তিপ্রসাদ ওরফে সূত্রধর গুপ্ত ওরফে রাজা রায় ওরফে ময়ূখ চৌধুরী।

    জন্মেছিলেন ঢাকায়, ১৯২৬ সালে। তবে জীবনের বেশিরভাগটাই কাটিয়েছেন ভবানীপুরে। ছোটো থেকেই ডানপিটে-একগুঁয়ে। চোখের কোণে ঠিকরে বেরোয় চাপা অহংকার। বাংলায় লেটার পাওয়া ময়ূখের প্রিয় লেখক ছিলেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। আমেরিকান সৈন্যদের ক্লাবে নিয়মিত বক্সিং করতেন, পকেটে থাকত একটা ছোট্ট হাতুড়ি। পেশি-পাকানো চেহারায় সাংঘাতিক জোর। ব্রুস লি-র পরম ভক্ত। একবার পালিয়েও গেছিলেন বাড়ি থেকে। এহেন ছেলে যে ছবি আঁকবে, কেউ কল্পনাই করতে পারেনি।

    ১৬ বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাশ করে, গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন। ফিফথ ইয়ারে ছেড়ে দিলেন কলেজ। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি তাঁর কদর পাচ্ছেন না শিক্ষকদের কাছে। ময়ূখ এখানে হাত পাকিয়েছিলেন জীবজন্তুর ফিগারে। তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন। তবে চিরকালীন আত্মাভিমানী খামখেয়ালি ময়ূখ অন্য শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে ছিলেন উদাসীন। যার ছাপ পড়েছিল কর্মজীবনেও।

    গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এজেন্সি ঘুরে পরিচয় হয় সত্যজিতের সঙ্গে। ১৯৬১তে ‘মরণ খেলার খেলোয়াড়’, আর তার পরের বছরই প্রকাশিত হল ‘ঋণশোধ’। ময়ূখের ধারণা ছিল, সেটিই প্রথম মৌলিক বাংলা কমিকস। তিনি নারায়ণ দেবনাথ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না তখন।

    তবে এটা বলা যেতেই পারে, বাংলায় প্রথম বাস্তবধর্মী ‘অ্যাকশন কমিকসের’ জনক ময়ূখ চৌধুরী। তাঁর ছবিতে বিদেশি ছাপ স্পষ্ট। প্যানেলে প্যানেলে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘রবিন হুড’-‘রুদ্রদমন’-‘পেক্কা’। এই এক্ষুনি কেশর নেড়ে লাফিয়ে পড়বে সিংহ ! কিংবা গুঁড়ি মেরে শিকারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে হিংস্র পুমা !

    নিজে ছিলেন বার্ন হোগার্থ, জন বুশকেমা ইত্যাদি আমেরিকান গ্রাফিক শিল্পীদের ভক্ত। ভারতীয় অলঙ্কার-শিল্পীদের মধ্যে একমাত্র সত্যজিতের প্রতিই তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অবিচল। নিয়মিত আড্ডা মারতে যেতেন বিশপ লেফরয় রোডের বাড়িতে।

    দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবনের নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া যাবে শুকতারা, পত্রভারতী, আনন্দ, নবকল্লোলের মতো প্রকাশনার পাতায়। অনুবাদ করেছেন শিকার কাহিনি, এডভেঞ্চারের গপ্প। পুরোনো শুকতারা ঘাঁটলে এখনো হয়তো বেরোবে ‘রুদ্রদমনের অভিযান’-এর মতো ‘রোমহর্ষক’ কমিকস। এছাড়া হেমেন রায়ের বিভিন্ন উপন্যাসের চিত্ররূপ তো আছেই। অনেকেই অবিশ্যি অভিযোগ তোলেন, ময়ূখের সংলাপ এবং কাহিনি বেশ দুর্বল। যে দুর্বলতা অবশ্য পুষিয়ে দেয় অসাধারণ সব ছবি।

    ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে তিনটে ঘর নিয়ে থাকতেন। বিয়ে করেননি। খানিকটা দাম্ভিক, আধপাগলা-বোহেমিয়ান  ময়ূখের বন্ধুভাগ্যও তেমন ছিল না । কথা বলতে শুরু করলে থামতেন না সহজে। আবার সময়ে সময়ে গুটিয়ে যেতেন নিজের মধ্যেই । কেউ কেউ মশকরা করে ডাকত, ‘বকতিয়ার খিলজি’ নামে। ময়ূখ ছবি আঁকতেন দরজা বন্ধ করে। রাত জেগে। আঁকার টেবিলে ডাঁই করা মানুষের খুলি-হাড়গোড়। শোনা যায় তিনি নাকি প্ল্যানচেটও করতেন ! তবে অন্তর্মুখী মানুষটি নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ছিলেন ভয়ঙ্কর সংবেদনশীল। এমনকি নিজের ছবি তোলাবার ব্যাপারেও প্রবল আপত্তি ছিল তাঁর।

    বাইরের ধূলি ধূসরিত ঘরে ছড়িয়ে থাকত এঁটো বাসনপত্র, খাবারের ঠোঙা। রেস্টুরেন্ট-হোটেলে খেতেন। মোটে মিতব্যয়ী ছিলেন না ময়ূখ চৌধুরী । আসক্তি ছিল সিগারেট-মদে। শেষ বয়স তাই কাটে হাজারো অসুখে। সঙ্গী হয়েছিল অভাবও। ১৯৯৬ সালে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের বেডে মারা যান বাংলা কমিকসের ‘রুদ্রদমন’। মৃত্যুশয্যায় পাশে ছিলেন কেবল এক প্রতিবেশী।

    ফ্ল্যাশ গর্ডন-ওয়েস্টার্ন-জি-আই-জোর সমতুল্য কমিকস যে বাংলা ভাষায় লেখা হতে পারে, তা দেখিয়েছিলেন ময়ূখ চৌধুরীই। নিজের বেপরোয়া যৌবনের ছাপও বোনা তাঁর অনেক কমিকসেই। তাঁর গদ্যটিও টান-টান, ঋজু। এরপর, যুগে যুগে বদলেছে, কমিকসের ধরন। আজকে ময়ূখ চৌধুরী বেঁচে থাকলে হয়তো শিল্পী ‘ফ্রাঙ্ক মিলার’ নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করতেন। এই ভাষাতেই।

    ঋণ : প্রিয়াঙ্কা দাস , কমিকস ও গ্রাফিকস প্রথম সংখ্যা

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @