ধুঁকতে ধুঁকতেই আজো স্বাদ ছড়াচ্ছে বাবরের স্মৃতিধন্য ‘বাবরসা’

অনেকে বলেন, এই মিষ্টির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন স্বয়ং মুঘল সম্রাট বাবর। উপহার হিসেবে এই মিষ্টি পাওয়ার পর খেয়ে খুব তারিফ করেছিলেন মুঘল বাদশা। সেই থেকেই নাকি মিষ্টির নাম হয়ে গেল ‘বাবরসা’। অন্য তথ্যও অবশ্য আছে। আঠেরো শতকের মাঝামাঝি অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাই জনপদ লুটপাট করে নিয়ে যায় বর্গিরা। আতঙ্কে যখন স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষীরপাই ছাড়তে আরম্ভ করেছে, তখনই তাদের পাশে এসে দাঁড়ান ইংরেজ অফিসার এডওয়ার্ড বাবরস। বর্গিদের ঠেকিয়ে দেন তিনি। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরান আটা নামের এক স্থানীয় মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী নতুন মিষ্টি বানিয়ে উপহার দেন বাবরসকে। সেই থেকে মিষ্টির নাম হয় বাবরসা।
নামের ইতিহাস যাই হোক, পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাইয়ের অন্যতম ঐতিহ্য যে ‘বাবরসা’, তা নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। ময়দা, ঘি আর মধুর জোটে এই মিষ্টি যাকে বলে অমৃত। দেখতেও খানিকটা অমৃতির মতো। গরম ঘি-এর ওপর ফোঁটা ফোঁটা ময়দা ঢেলে তৈরি হয় বাবরসা-র নকশা-আদল। তারপর মধু বা চিনির সিরায় ঢেলে পরিবেশন। কিন্তু বাংলার এহেন ঐতিহ্যশালী মিষ্টিই ক্রমে বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ-সহ বাংলার অন্যান্য ঐতিহ্যশালী মিষ্টির মতো প্রচার কখনোই সেভাবে পায়নি ক্ষীরপাইয়ের বাবরসা। হয়তো অন্য নানা জায়গাতেও এই মিষ্টি মিললে প্রচার মিলত। কিন্তু ক্ষীরপাইয়ের নিজস্ব ঐতিহ্য হয়ে থেকে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া, এই মিষ্টি তৈরিতে খরচও বেশি। ফলে, বাবরসার দামও বেশি। মফস্সলে এত দামি মিষ্টি সহজে কেউ কিনতে চান না। ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাদ সবকিছুর পরেও তাই বাবরসা ক্রমে তার জায়গা হারাচ্ছে। খরচ কমাতে মধুর জায়গা নিচ্ছে চিনির সিরা, ঘিয়ের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে ডালডা। এতে নিজের স্বাদও হারাতে বসেছে এই ঐতিহ্যশালী মিষ্টি।
ক্ষীরপাইয়ের মিষ্টান্ন বিক্রেতারা আজ চাইছেন, বাবরসা প্রচারের আলোয় ফিরুক। তার ইতিহাস সামনে আসুক। দরকারে উদ্যোগী হোক সরকার। তাহলেই বিক্রি বাড়বে, মানও ঠিক রাখা যাবে। ঐতিহ্য বজায় রেখেই বেঁচে থাকবে ক্ষীরপাইয়ের গৌরব।