No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    হেতমপুরের প্রেম, রাজনগরের যুদ্ধ এবং সিউড়ি নামের ধাঁধাঁ

    হেতমপুরের প্রেম, রাজনগরের যুদ্ধ এবং সিউড়ি নামের ধাঁধাঁ

    Story image

    ১৭৬১-৬২ সাল। বাংলার মসনদে তখন মিরকাশিম। তখনো অবধি ইংরেজদের পুতুল নবাবই বলা চলে তাঁকে। এমনই এক সময়, ছোটোনাগপুর মালভূমির ঢালে বনের ভিতর আলোচনায় মত্ত আসাদ খান আর শিবভট্ট। আসাদ খান বীরভূমের রাজনগরের অধিপতি আর শিবভট্ট মারাঠা বর্গিদলের এক সেনাপতি। দু’জনের সঙ্গেই অনুগত সেনাদল। অতর্কিত সাক্ষাৎ সম্মুখসমরের বদলে খুলে দিয়েছে আলোচনার পথ। দুজনে মিলে পরিকল্পনা করছেন আক্রমণের।

    সিরাজের পরাজয়ের পর দিকে দিকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন জায়গিরদার-ভূস্বামীরা। সেই দলে ছিলেন রাজনগরের অধিপতি আসাদ জামা খানও। তিনি মিরকাশিমকে খাজনা দিতে অস্বীকার করলে ব্রিটিশ ফৌজ আর নবাবি সৈন্যরা যৌথভাবে আক্রমণ করে রাজনগর। পরাজিত আসাদ পালিয়ে আশ্রয় নেন ছোটোনাগপুরের জঙ্গলে। এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় বর্গী সেনাপতি শিবভট্টর। দুজনে মিলে ঠিক করেন, রাজনগর পুনর্দখল করবেন। সেইমতো শুরু হয় অভিযান।

    তখনো সিউড়ির জন্ম হয়নি। বরং, কড়িধ্যা নামের এক জনপদ গমগম করছে সেখানে। ১৭৬৩ সালে এই কড়িধ্যার কাছেই যুদ্ধ হল ব্রিটিশ আর নবাব বাহিনীর সঙ্গে আসাদ-শিবভট্টর। ফের পরাজিত হলেন আসাদ খান। আর এই যুদ্ধের পরেই গোটা বীরভূম ব্রিটিশদের হাতের মুঠোয় চলে এল। শাসনের স্বার্থেই একটা শহরের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ইংরেজদের। কিছুদিনের ভিতরেই নতুন জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বীরভূম। আর বীরভূমের সদর হিসেবে ক্রমে জঙ্গল কেটে গড়ে তোলা হল ‘সিউড়ি’ শহর। 

    ‘সিউড়ি’ গড়ে ওঠার আড়ালে এভাবেই মিশে আছে যুদ্ধ-বিদ্রোহের নানা গপ্প। গল্প অবশ্য একটা নয়। নবাব-ইংরেজদের পাশাপাশি সেই ফ্রেমে হাজির হেতমপুরের রাজারাও। সিউড়ি শহর গড়ে ওঠার পিছনে তাঁদেরও অবদান কম ছিল না। বর্তমান সিউড়ি-র স্কুল-কলেজ, পৌরভবন-সহ নানা সরকারি অট্টালিকা হেতমপুরের রাজাদেরই দান। 

    ছোটোনাগপুর মালভূমির সম্প্রসারিত অংশে অবস্থিত কলকাতা থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরের ছোটো শহর সিউড়ি। রাজবাড়ি, প্রাচীন টেরাকোটার মন্দির আর একসারি ইতিহাস নিয়ে দিব্বি বয়ে চলেছে ময়ূরাক্ষী নদীর তীরবর্তী এই শহর। যুদ্ধ-বিগ্রহ-বিদ্রোহের পাশাপাশি সেখানে হাজির প্রেমের গল্পও। সেইসব গল্পে উঁকি মারা যাবে পরে, আপাতত একটা অন্য ধাঁধাঁয় নজর দেওয়া যাক। ধাঁধাঁটা ‘সিউড়ি’ নাম নিয়ে।

    ‘সিউড়ি’ নামটি কীভাবে এল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। ধাঁধাঁ জমকালো হয় নামের বানান নিয়েও। শহরের নামের বানান দুটি—‘সিউড়ি’ আর ‘সিউড়ী’। আবার ইংরেজিতে লেখা হয় SURI বা ‘শূরি’। গৌরীহর মিত্র ‘বীরভূমের ইতিহাস’ বইতে লিখছেন, ‘‘বীরভূমের রাজধানী সিউড়ী, শূরী (বা শৌর্য্যশালী) শব্দের অপভ্রংশ। তাই ইংরেজিতে সিউড়ি-র বানান শূরী (suri) লেখা হয়।”

    এ তো গেল একটি মত। ভিন্নমতে, বীরভূম একসময় ছিল তন্ত্রযানী বৌদ্ধ-সাধকদের অঞ্চল। সেখান থেকে ‘শিবাড়ী’ শব্দটি ক্রমে পরিণত হয়েছে ‘সিউড়ি’-তে। 

    বীরভূমের ইতিহাসবিদ অর্ণব মজুমদারের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। সিউড়ির নামকরণের উৎস খুঁজতে প্রসঙ্গে তিনি টেনে আনেন ইতিহাসের সেই জমজমাট জনপদ কড়িধ্যার প্রসঙ্গ। এই জনপদে জমিদার ছাড়াও থাকতেন প্রচুরসংখ্যক তন্তুবায় ও শাঁখারি পরিবার। এই ‘কড়িধ্যা’র শিয়রের জঙ্গলাকীর্ণ গ্রামটিকেই নাকি বলা হত ‘সিউড়ি’। অর্থাৎ, ‘সিউড়ি’ নামের আড়ালে রয়েছে ‘শিয়র’ শব্দটি। আবার নানা সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, এই ‘সিউড়ি’ শহরকে ব্রিটিশরা উল্লেখ করেছে ‘লাট হায়দরাবাদ’ নামেও। ধাঁধাঁই বটে।

    তিলপাড়া জলাধার

    সিউড়ি শহর থেকে খানিক দূরেই হেতমপুর। পথেই চোখে পড়বে বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিলপারা বাঁধও সিউড়ির বেশ কাছে। এখানে সোনাতোড় পাড়ার বলরাম মন্দির বিখ্যাত। মন্দিরে কোনো বিগ্রহ নেই। ১৭০০-১৮০০ সালের মধ্যে কোনো একসময়ে নির্মিত এই মন্দিরের গা জুড়ে অসামান্য টেরাকোটার কাজ। পুরাতত্ব বিভাগের মতে, সৌন্দর্যের বিচারে এই মন্দির বীরভূমের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। 

    সিউড়ির মোরব্বা বিখ্যাত। সবচাইতে বিখ্যাত শতমূলী মোরব্বা। ‘বড়ো লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল’ কিংবা ‘বলি, ও ননদি’-র মতো জনপ্রিয় গানের গায়িকা স্বপ্না চক্রবর্তী সিউড়িরই বাসিন্দা। এই দুটি গানের রচয়িতা কবি রতন কাহার এবং কবি আশানন্দন চট্টোরাজের বাসাও সিউড়িতেই। কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজের শাখা হিসেবে তৈরি হওয়া সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র ছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. তুলসি গিরি।

    এছাড়াও রয়েছে হেতমপুরের বিখ্যাত রাজবাড়ি। যে রাজবাড়ি ও রাজপরিবারের ইতিহাস নিয়ে লেখা উচিত আলাদা করে, বিস্তারে। এই লেখায় সে চেষ্টা করছি না। তবু, যৎসামান্য ছুঁয়ে না গেলেই নয়। সাড়ে তিনশো বছর আগে জীবিকার খোঁজে বাঁকুড়া থেকে রাজনগরের অধিপতি রণমন্ত খাঁ-র দরবারে এসেছিলেন দরিদ্র ব্রাহ্মণ মুরলীধর চক্রবর্তী। তাঁর বড়ো ছেলে চৈতন্যচরণ চলে এসেছিলেন হেতমপুরে। চৈতন্যচরণের বড়ো ছেলে রাধানাথ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন হেতমপুরের অবস্থাপন্ন রায় পরিবারের, যুক্ত হয়েছিলেন জমিদারির সেরেস্তার কাজেও। পরে তিনি জমিজমা কিনে হেতমপুরেই জমিদারি স্থাপন করেন। হেতমপুর চক্রবর্তী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সেই অর্থে রাধানাথই। রাজপ্রাসাদটি দেখার মতো। রাজবাড়ির একাংশে অবশ্য এখন কলেজ ও ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল। 

    হেতমপুরের রাজবাড়ি

    আর এই হেতমপুর নামকরণ যাঁকে ঘিরে সেই হেতম খাঁ-র পরিবারকে নিয়ে রয়েছে একটি প্রেমের গল্প। হেতম খাঁ ভূস্বামী। দিল্লির বাদশাহর মেয়ে আমিনা প্রেমে পড়লেন সেনাপতি ওসমানের। এদিকে বাদশাহ তাঁর বিয়ে ঠিক করেছেন ভ্রাতুষ্পুত্র হোসেন খাঁর সঙ্গে। ছদ্মবেশে হেতমপুরে পালিয়ে আসেন আমিনা-ওসমান। তাঁদের নাম তখন হাফেজ খান আর শেরিনা বিবি। নিঃসন্তান হেতম খাঁ আশ্রয় দেন দুজনকে। পুত্র ও পুত্রবধূর মর্যাদা দিয়ে মৃত্যুর পূর্বে নিজের রাজত্বও দিয়ে যান দুজনকে। ততদিনে অবশ্য নিজেদের আসল পরিচয় হেতম খাঁকে জানিয়েছেন ওসমান-আমিনা। 

    ওসমান-আমিনার এই সুখের দাম্পত্য বেশিদিন স্থায়ী হল না। তাঁদের খুঁজতে ফকিরের বেশে হেতমপুরে হাজির হলেন হোসেন খাঁ। দুজনকে চিনতে পেরে প্রতিশোধস্পৃহা মাথা চাড়া দিল তাঁর। বর্গিদস্যুদের সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত তখন তছনছ করছে বীরভূমের নানা অঞ্চল। তাঁর সঙ্গে জোট বেঁধে হেতমপুর আক্রমণ করলেন হোসেন। যুদ্ধে নিহত হলেন ওসমান। সদ্যপ্রসূতি আমিনা স্বয়ং এলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। মুখোমুখি যুদ্ধে তাঁর হাতের তরবারি পড়ে গেলে আমিনাকে আলিঙ্গন করতে উদ্যত হন কামোন্মত্ত হোসেন। ঘোড়া ছুটিয়ে আমিনা বিবি ঝাঁপ দেন নিকটবর্তী জলাশয়ে। আর ওঠেননি।

    ওসমান-আমিনার করুণ প্রেমের ইতিহাস বুনে হেতমপুরে এখনো রয়েছে আমিনা বিবির মাজার এবং ওই পুকুর। রয়েছে আরো অনেক গল্প-কিংবদন্তী-ইতিহাস। সিউড়ির আশেপাশে, সিউড়িকে ঘিরেই। সিউড়ি নামের রহস্যের মতোই যারা নিবিড়। 

    তথ্যঋণ: মৃদুল দাশগুপ্ত, ফুল ফল মফস্‌সল, রোববার, প্রতিদিন, ১৪ মে, ২০১৭; সুকুমার সিংহ, সিউড়ি শহরের ইতিহাস।     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @